Home » রাজনীতি » তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব-৬)

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব-৬)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সংবেদনশীলতা, কর্তব্যজ্ঞান ও দায়িত্ববোধের কারণে তাজউদ্দীন আহমদের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার অনিবার্যতাটা বোঝা গেল, কিন্তু কোন ধরনের রাজনীতি তিনি করবেন তার মীমাংসাটি কীভাবে ঘটলো, সে জিজ্ঞাসাটা তো রয়েই যায়।

শুরুতে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে ছিলেন, কিন্তু সেখানে যে থাকতে পারবেন না সেটা সাতচল্লিশের পরেই বুঝে ফেলেছেন। মুক্তি পরের কথা, পাকিস্তান স্বাধীনতাও আনেনি। কিন্তু যাবেন কোথায়? বিকল্প কোনো রাজনৈতিক সংগঠন তো গড়ে ওঠেনি। তাজউদ্দীন বড় বড় নেতাদের সবাইকেই চেনেন ও জানেন, তাঁদের জনসভায় তিনি যাচ্ছেন, এবং বক্তৃতা শুনছেন, তাঁর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরী হচ্ছে। সেগুলো লক্ষ্য করবার মতো। আটচল্লিশের একুশে মার্চ তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তৃতা শুনেছেন এবং আশাহত হয়েছেন। সাতচল্লিশের পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কয়েকবার ঢাকায় এসেছেন। অবশ্যই তিনি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ নাজিমুদ্দীনের বিরুদ্ধে, কিন্তু তাই বলে নিজে যে প্রগতিশীল তা বলা যাচ্ছে না। ওদিকে মওলানা ভাসানী ঢাকায় চলে এসেছেন, এবং রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এই দুই নেতা সম্পর্কে তাজউদ্দীনের ধারণাটা দেখা যাক।

একান্ন সালের ৫ জানুয়ারী আরমানিটোলার ময়দানের এক জনসভায় সোহরাওয়ার্দী বক্তৃতা করবেন। অনেক লোক হয়েছে। তাজউদ্দীনের মনে হচ্ছে এটি ঢাকার সবচেয়ে জনাকীর্ণ সভার একটি। ময়দান পরিপূর্ণ। উপস্থিতি ৫০ হাজারের মতো। কিন্তু বক্তৃতা শুনে তাজউদ্দীন যে সন্তুষ্ট হয়েছেন তা নয়। তিনি লক্ষ্য করছেন,

[…]তাঁর দল [অর্থাৎ আওয়ামী মুসলিম লীগ] কি নীতি অনুসরণ করবেন সেটা জনাব সোহরাওয়ার্দী উল্লেখ না করে এড়িয়ে গেলেন। তাঁর সম্পূর্ণ বক্তৃতাটিই আবেগপূর্ণ ও নির্বাচনী চমকে ভরা।

বক্তৃতা শুনে তাজউদ্দীনের মনে হচ্ছে যে, সোহরাওয়ার্দীর একমাত্র লক্ষ্য নির্বাচনের মধ্যদিয়ে নাজিমুদ্দীনদেরকে হটিয়ে দিয়ে শাসন ক্ষমতা দখল করা। তাজউদ্দীনের পক্ষে এই নেতৃত্বের প্রতি আকৃষ্ট হবার কথা নয়। তিনি তা হনও নি। ওই সভাতে মওলানা ভাসানীও ছিলেন, তিনিই সভাপতিত্ব করছিলেন। তাজউদ্দীন তাঁর ডায়েরীতে লিখেছেন, মওলানা ভাসানীর বক্তৃতাটির বিশেষত্ব ছিল এই রকমের :

মওলানা ভাসানী তাঁর স্বভাবসুলভ নির্মম অকপটতায় প্রায় ২০ মিনিটের মত বললেন। যা তাঁর প্রেসিডেন্টকেও (অর্থাৎ সোহরাওয়ার্দীকে) আঘাত করেছে। […] জনাব সোহরাওয়ার্দী তাঁর নিজের নীতির গুণকীর্তনে মুখর ছিলেন।

বেছে নিতে হলে দু’জনের ভেতর মওলানার প্রতিই যে তিনি ঝুঁকবেন সেটা ধারণা করা যায়। এক বছর আগে ওই আরমানিটোলা ময়দানেই মওলানা ভাসানীর আরেকটি বক্তৃতা তিনি শুনেছেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ তখন সবেমাত্র গঠিত হয়েছে, ভাসানী যার সভাপতি। সমাবেশ হিসাবে এটিও ছিল বিশাল। তাজউদ্দীনের দিনপঞ্জিতে আছে : সাড়ে তিনটায় সভা শুরু হয়েছে, শেষ হলো সাড়ে পাঁচটায়, পুরোটা সময় জুড়ে ভাসানী বক্তৃতা দিলেন। তাজউদ্দীনের অনুভূতি এ রকমের :

মওলানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব বিষয়ে কথা বললেন : চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করলেন। কোরীয়ার পরিস্থিতি, সেখানে আমেরিকার কৌশল, পাকিস্তানের জন্য কোন কিছু অর্জন না করেই এমন কি কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের জন্য কোন শর্ত আরোপ ছাড়াই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে লিয়াকত আলীর যোগসাজশের কথা বললেন। কনসেমরি এবং জনাব লিয়াকত আলী সাহেবের বিরুদ্ধে তিনি অনাস্থা জ্ঞাপন করলেন। পাকিস্তানে সম্ভবত এরকম ঘটনা এটাই প্রথম। প্রধানমন্ত্রী যখন সমর্থনের জন্য পূর্ববাংলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন তখন বাংলার মানুষ তাঁর মুখের উপর তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। সারা বছরের যে কোন জনসমাবেশে থেকে এই সমাবেশে উপস্থিতি ছিল অনেক বেশী, প্রায় ২০/২৫ হাজার।

দেখা যাচ্ছে ভাসানীকে তিনি পূর্ববঙ্গের মুখপাত্র হিসাবে বিবেচনা করছেন; সোহরাওয়ার্দীকে দেখেছেন ক্ষমতালাভে আগ্রহী একজন রাজনীতিক হিসেবে। তাঁর দৃষ্টিতে দুজনের ভেতর পার্থকটা একেবারেই মৌলিক।

ভাসানীর সভার ঠিক পরের দিনই পল্টন ময়দানে লিয়াকত আলী একটি সভা করেন। সরকারী আয়োজন, উপলক্ষ কায়েদে আজমের জন্মদিবস উদযাপন। কাজেই জনসমাগম হয়েছে বেশ ভালো, ভাসানীর জনসভার দ্বিগুণের চেয়েও বেশী, পঞ্চাশ হাজার। কিন্তু লিয়াকত আলীর বক্তৃতা তাজউদ্দীনের ওপর সামান্যতম প্রভাব ফেলতে পারেনি। ডায়েরীতে এইটুকু মাত্র বলা আছে : উপস্থিত ছিলাম। জনাব লিয়াকত আলী বক্তব্য রাখলেন।’ ব্যস ওইখানেই শেষ; এই বিশাল জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কী বললেন, কোন বাণী শোনালেন তার কিছুমাত্র উল্লেখ নেই। ইতিমধ্যে সোহরাওয়ার্দী তাজউদ্দীনের আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সোহরাওয়ার্দীর অপর একটি জনসভার মূল্যায়নে। ১৯৫২ সালের নভেম্বর মাসে সোহরাওয়ার্দী পুনরায় বক্তৃতা দেন আরমানিটোলার মাঠে। এই বক্তৃতা তাঁর কাছে এতই অকিঞ্চিৎকর ঠেকেছে যে, এর সম্পর্কে কোন মন্তব্য করার প্রয়োজন বোধ করেননি; কেবল লিখেছেন যে, সভায় বিপুল সংখ্যক লোক উপস্থিত ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তো প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেছেন আগেই, সোহরাওয়ার্দী যে শূন্যস্থান পূরণ করবেন তেমনটি ঘটছে না।

মওলানার প্রতি তাজউদ্দীন আকৃষ্ট হচ্ছেন, কিন্তু মওলানা তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি এবং তাজউদ্দীনের আগ্রহ নেই সেসংগঠনে যোগদানের। তাঁর সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ কমরুদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল জলিল ও অলি আহাদের। তাজউদ্দীনের মতো এঁরাও এক সময়ে মুসলিম লীগে ছিলেন, এখন আর নেই। এঁদের সবার চিন্তা অসাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতির জন্য পথ খোঁজার। পিপলস ফ্রিডম লীগ গঠনের কথা ভাবা হচ্ছে, বাংলায় যার নাম হবে গণআজাদী লীগ; কিন্তু উদ্যোগ হিসাবে সেটা তেমন জমে উঠছে না, মূল কারণ কমরুদ্দীন আহমদ সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে নেই, তিনি আইনজীবী, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর যোগ আছে, নতুন দল গড়ার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ যে অত্যন্ত প্রবল এমনটা মনে হচ্ছে না। কিন্তু তাজউদ্দীনের আগ্রহ রয়েছে। তিনি ব্রিটিশ লেবার পার্টির গঠনতন্ত্র সংগ্রহ করে সেটা পাঠ করছেন। ইসলাম, ইসলামে ধনবন্টনের সমস্যা, গণতন্ত্র, আল্লাহর অস্তিত্ব, ধর্মতত্ত্ব, লোকে কেন কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকছে, এসব তখনকার সময়ের প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় ও সুযোগ পেলেই আলোচনা করছেন। গণআজাদী লীগের জন্য ম্যানিফেস্টো লিখছেন; প্রস্তাবিত দলের জন্য একটি পাঠচক্র প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন, যেখানে মৌলিক চিন্তায় অভ্যস্ত রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও অর্থনীতির অধ্যাপকরা এসে সমাজতন্ত্র এবং উপমহাদেশের অর্থনীতির বিষয়ে ক্লাস নেবেন বলে আশা রাখছেন।

রাজনৈতিক জীবনের জন্য কিছুটা অজ্ঞাতে এবং অনেকটাই সজ্ঞানে প্রস্তুতি নিচ্ছেন যেতাজউদ্দীন আহমদ তাঁর ডায়েরীতে দুটি বস্তুর বিশেষ রকমের উল্লেখ দেখি একটি ঘড়ি, অন্যটি সাইকেল। এ দুটি তাঁর নিত্যসহচর। ঘড়ি দেখে ও মিলিয়ে কাজ করেন, সময়ের অপচয় করেন না, সকালে উঠে ঘড়ি দেখে জানেন পাঁচটা বাজে নাকি সাড়ে পাঁচটা, ডায়েরী লিখে ঘুমাতে যাবার আগে দেখে নেন ক’টা বাজলো, সাড়ে দশটা নাকি এগারোটা। ঘড়ি বিকল হলে অস্থির হয়ে পড়েন। আপনজনদের ঘড়ি উপহার দিতে পছন্দ করেন, গ্রামের স্কুলের জন্য ঢাকা থেকে ঘড়ি কিনে নিয়ে যান প্রথম সুযোগেই। ঘড়ির কাঁটা তাঁর নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাবোধের ওপর সর্বক্ষণ নজরদারি করে। আর সাইকেল তাঁকে দেয় চলমানতা। এটি না থাকলে তিনি অচল হয়ে পড়েন। কিন্তু সাইকেলে করে যাবেনটা কোথায়, যাবেন কতোদূর? দিনলিপিগুলো পড়লে বুঝতে পারি তিনি একটি বৃত্তের ভেতর আটকা পড়ে গেছেন, যেটিকে তিনি অতিক্রম করতে চান। সাইকেলে চেপে ঘোরাফেরা তাঁকে সন্তুষ্টি দিচ্ছে না তার সেটি ‘উদ্দেশ্যবিহীনই’ হোক, কিংবা হোক সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে। বৃত্তটিকে তিনি চান পারলে ভাঙতে, না পারলে অন্তত ডিঙ্গাতে। বৃত্তটা কেবল স্থানের নয়, স্থানেরটি দৃশ্যমান, এমন কি কম পীড়াদায়ক, সমাজ ও রাজনীতি তাঁর জন্য যে বৃত্তটা তৈরী করে রেখেছিল সেটির তুলনায়। ডায়েরীর পাতাগুলো পড়লে এটা অনুভব করা যায় যে ওই গন্ডিবদ্ধতা তাঁর কাছে ক্রমশ দুঃসহ হয়ে উঠছে। যদিও তিনি মোটেই অস্থির নন।।

(চলবে…)