Home » অর্থনীতি » পদ্মা সেতু এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয় উল্লম্ফন

পদ্মা সেতু এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয় উল্লম্ফন

এম. জাকির হোসেন খান

দক্ষিণাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকার সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পদ্মা বহুমুখী সেতু বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের আহবানে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ বহুপাক্ষিক অর্থ লগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাড়া দিয়েছিল। প্রত্যাশা ছিলো ২০১১ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের মূল সেতুর কাজ ২০১৩ সালে কাজ শুরু হয়ে সার্বিকভাবে প্রকল্পের সকল কাজ ২০১৫ সালেই সমাপ্ত হবে। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে প্রাধমিকভাবে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিলো প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যার মধ্যে মূলদাতা বিশ্ব ব্যাংক সহজ শর্তে (মাত্র ০.৭৫ শতাংশ হারে ১০ বছরে পরিশোধের ব্যবস্থায়) .২ বিলিয়ন ডলার ঋণ মঞ্জুর করে। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রাকযোগ্যতা যাচাইয়ে জন্য টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে। কিন্তু ২০১২ সালের ২৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতু বহুমুখী সেতু বাস্তবায়নে কানাডাভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিন, তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী, সচিবসহ একাধিক ব্যাক্তি উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগের বিশ্বস্ত প্রমাণ থাকার যুক্তিতে অনুমোদিত ঋণ প্রদান স্থগিত করে। একই বিষয়ে ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর অভিযুক্ত সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী (এ দু’জনের বিরুদ্ধে মামলা না করলেও তাঁদের ‘তদন্তের আওতায়’ রাখা হয়) ও অভিযুক্ত সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক মামলা দায়ের করলেও তাদের সবাইকে দুদক গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এদিকে, কানাডার আদালতে একাধিকবার শুনানির পর তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর ২০১৩ সালের ২০ আগষ্টে বিচারক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসিলাভালিনের তিন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাইল, রমেশ শাহ ও কেভিন ওয়ালেসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার শুরু হলেও সর্বশেষ এ মামলার অবস্থা সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়নি। দুর্নীতির অভিযোগের চূড়ান্ত সুরাহা না হলেও ২০১৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের ঘোষনা দেন। ২০১৪ সালের ১৭ জুন চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় এবং প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিলো ৯,১৭২ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে প্রথম সংশোধনের সময় সর্বমোট ব্যয় ২০,৫০৭ কোটি টাকা ধরা হলেও ২০১৬ এর ৫ জানুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক)’র সভায় প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৪০% বাড়িয়ে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা (.৭ বিলিয়ন ডলার) করা হয় এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৫ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০২০ সাল করা হয়।

প্রকল্প সংশোধনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘প্রকল্প সংশোধনের অন্যতম কারণ অর্থায়নের উৎস পরিবর্তন। এছাড়া অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্মাণ তদারক পরামর্শককে দুই ভাগে ভাগ করা, নতুন অনুষঙ্গ হিসেবে ফেরিঘাট স্থানান্তর ও সড়ক প্রশস্তকরণ, অতিরিক্ত ৪০৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ, চুক্তিমূল্য অনুযায়ী মূল সেতুর নির্মাণ ব্যয় ৩ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা বৃদ্ধি, মাওয়া প্রান্তে অতিরিক্ত ১ হাজার ৩০০ মিটার নদী শাসনকাজ অন্তর্ভুক্ত করা, চুক্তিমূল্য অনুযায়ী অ্যাপ্রোচ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া২ খাতের ব্যয় ৬৩৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি এবং ভূমি উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি। উল্লেখ্য, ২০০৩ থেকে ২০০৫ সময়ে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) পরিচালিত পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই মূল প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হয়। এরপর ২০০৯ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ডিটেইলড ডিজাইন স্টাডি ফর দ্য কনস্ট্রাকশন অব পদ্মা মাল্টিপারপাস ব্রিজ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বিস্তারিত নকশা অনুযায়ী সেতুর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি, ডিজাইন পরিবর্তনে ভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি, পরামর্শক ব্যয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন পরিবর্তন করেই ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প সংশোধন করা হয়।

তবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, দুটি দাতা সংস্থার সমীক্ষা ব্যাপক আকারে করা হয়নি, মূলত নদী শাসন ও মূল সেতুর নির্মাণ নকশা পরিবর্তন হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে বেশি। একটা বিষয় স্পষ্ট করা হয়নি, আবারও কি এ ধরনের প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা পড়তে পারে? প্রশ্ন হলো, দেশের প্রায় সব বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি বা জাইকার মতো প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকে। যদি পদ্মা সেতু প্রকল্পের সমীক্ষায় এসব প্রতিষ্ঠান ভুল করে থাকে এ প্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ দেশীবিদেশী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করলেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব যে, পদ্মা সেতু প্রকল্প ব্যায়ের একাধিকবার বরাদ্দ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা কতখানি?

এছাড়াও গত ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে রূপপুরে দেশের প্রথম পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের চুক্তি সম্পাদনকে ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য নিরাপত্তার জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, অধিক ব্যয়বহুল বলে ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞবৃন্দসহ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এ প্রকল্প পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরী ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে। কিন্তু এ চুক্তি সংক্রান্ত কোন তথ্য ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সব ধরনের তথ্য যেমন, জনগণের জীবন ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার উপর সম্ভাব্য ঝুঁকিসহ পরিবেশগত কোন নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকি ও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সরবরাহকারীর দায় নিশ্চিত করতে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা; অর্থায়নের শর্তাবলীসহ ব্যয়বহুল এই প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যবস্থা; সরবরাহকারীর তুলনায় বাংলাদেশের জনগণের সম্ভাব্য লাভ এবং বোঝা/দায় ইত্যাদি প্রকাশ করা হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ওই দু’টি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের মোট ব্যয় প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করা হলেও মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বর মাসে প্রকল্প ব্যয় তিন গুণেরও বেশী বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারে কোন কারণে এবং কি যুক্তিতে উন্নীত করা হলো সে বিষয়ে জনগণ অবহিত নয়।

টিআইবি’র মতে, ‘রাশিয়ার পারমানবিক চুল্লিগুলি ব্যাপকভাবে, এমনকি খ্যাতিসম্পন্ন রাশিয়ান বিশেষজ্ঞের মতেও অনিরাপদ ও অনির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত। এছাড়া রাশিয়ার রাষ্ট্রায়াত্ত দুটি প্রতিষ্ঠান রোসাটম এর যৌথ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান কোন দুর্ঘটনায় সরবরাহকারীর দায় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত নয়।’ সবচেয়ে বড় কথা যেকোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন ভূমিকম্পের সময় এ ধরনের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঝুকি কতখানি তা সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের ফুকুশিমায় সংঘটিত দূর্ঘটনায় দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞগণ ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সহ এ অঞ্চলে বড় ধরনের ঝূকির কথা উল্লেখ্য করছেন। ভারতের ভূপালে সংঘটিত একটি দূর্ঘটনার ফলে প্রজন্মান্তরে আজো সেখানে মানুষ দূর্যোগ বয়ে বেড়াচ্ছে। এ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া এ ধরনের পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা কতখানি নিশ্চিত করতে সক্ষম তা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রধান শিল্পোন্নত দেশ বলেই জাপান ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সক্ষম হলেও অন্য দেশের ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশে সংঘটিত দূর্ঘটনা থেকে কতখানি রক্ষা পাওয়া সম্ভব তা সময়েই বলবে। তাছাড়াও, বিশ্বের বহু উন্নত দেশ যেমন জার্মানী, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য অধিক নিরাপদ এবং জ্বালানি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদে অধিক সাশ্রয়ী বলে পরিচিত দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে,

যেহেতু বাংলাদেশের জনগণকেই এই প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা বা দায় বহন করতে হবে, তাই এ চুক্তি সংক্রান্ত সকল তথ্য জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। এছাড়াও, ২০১৫ সালে জাতিসংঘের ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাগুলোর অন্যতম লক্ষ্য হলো টেকসই পরিবেশ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। বাস্তবে এ দুটো প্রকল্প কতখানি সুশাসন বা পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে তা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন ওঠতে শুরু করেছে।।