Home » বিশেষ নিবন্ধ » পাঁচ জানুয়ারি থেকে পাঁচ জানুয়ারি

পাঁচ জানুয়ারি থেকে পাঁচ জানুয়ারি

হায়দার আকবর খান রনো

২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি। গত বছর বিএনপিকে কোন রকম সভা করতে দেয়া হয়নি। এমনকি খালেদা জিয়াও অবরুদ্ধ ছিলেন নিজ কার্যালয়ে। তার অফিসের সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে রাস্তায় অবরোধ তৈরি করেছিল। কিন্তু জনৈক মন্ত্রী বলেছিলেন, ওটা নাকি বাড়ি মেরামতের জন্য আনা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন মিথ্যাচারে আমরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলা। অবরুদ্ধ খালেদা জিয়ার অফিসে এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেয়া হয়েছিল। পানি সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং এটা করা হয়েছিল এক মন্ত্রীর জনসভায় প্রকাশ্য বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে, সরকারি সিদ্ধান্তেই। খালেদা জিয়ার ঘরে বিষাক্ত স্প্রে দেয়া হয়েছিল। এটাকে আর যাই হোক, সভ্য আচরণ বলা যায় না।

খালেদা জিয়াকে কেন সভা করতে দেয়া হয়নি। পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলেছিল, সভা করতে দিলে নাকি সহিংসতার আশংকা ছিল। কিন্তু সভা না করতে দেয়াতে সহিংসতা আরও বেশি হয়েছিল। খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ অবস্থায় দেশব্যাপী অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিন মাস ধরে চলে এই অবরোধ। বিএনপি ও জামায়াত ব্যাপক সহিংসতা করেছিল। প্রধানত জামায়াতই সন্ত্রাসী কারবার বেশি করে করেছিল। এই সময় পেট্রোল বোমার ব্যাপক ব্যবহার হয়েছিল।

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সাল, প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে একটা সংখ্যা তত্ত্ব দেয়া হয়েছিল। তাতে দেখি ৪৪ দিনের অবরোধে নিহত ৯৪ জন। তবে একই সময় ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছিলেন ২১ জন। বিএনপিজামায়াতের সন্ত্রাসী কার্যক্রম সফলতার মুখ দেখাতে পারেনি। বরং বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়েছে। অন্যদিকে সরকারকে এই সুযোগে অনেক বেশি কর্তৃত্ববাদী করে তুলেছে। প্রায় মাস তিনেক পর বিএনপি তার অবরোধ তুলে নেয়। অবশ্য এর আগেই তা শিথিল হয়ে পড়েছিল। জামায়াতের অবশ্য ভিন্ন এজেন্ডা ছিল। দেশে একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করে তাদের নেতাদের মুক্ত করার মরিয়া প্রচেষ্টা তারা নিয়েছিল। কিন্তু সেটাও ব্যর্থ হয়েছে। মাঝখান থেকে লাভবান হয়েছে সরকার। বিরোধী দলের সন্ত্রাসের অজুহাত তুলে তারা গণতন্ত্রকে একেবারে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। ২০১৫ সালে বিএনপিকে কোন সভাসমাবেশ, এমনকি মানববন্ধন পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। বিএনপি নেতৃত্ব ভুল কৌশলের কারণে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিকে হারিয়েছে, যদিও তার নিরব সমর্থক ও ভোটারের সংখ্যা খুব একটা কমেনি বলেই মনে হয়। কিন্তু পরবর্তী ঢাকাচট্টগ্রাম মেয়র নির্বাচনে অথবা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী পৌরসভা নির্বাচনে তার প্রতিফলন ঘটেনি।

বস্তুত এই নির্বাচনকে নির্বাচন না বলাই ভালো। এখন নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়েছে। উপজেলা নির্বাচন, তারপর ঢাকাচট্টগ্রাম মেয়র নির্বাচন এবং সবশেষে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী পৌরসভা নির্বাচনে যে বেপরোয়া ভোট কেন্দ্র দখল, পুলিশপ্রিজাইডিং অফিসারের সামনে ব্যালট পেপারে খুশি মতো সিল মারা, এমনকি আগের রাতেও সিল মারার যে সব ঘটনা ঘটেছে ব্যাপকভাবে, প্রায় সর্বত্রই। এবং তাতে আর যাই হোক, নির্বাচন বলে কিছু ছিল না। উপজেলা নির্বাচন হয়েছিল পাঁচ দফায়। প্রথম দুই দফায় দেখা গেল বিএনপির বিশাল জয় হয়েছে। এতে ঘাবড়ে গিয়েছিল শাসক দল। তাই পরবর্তী তিন দফায় তারা আর নিরপেক্ষতার ভানটুকুও রাখেননি। বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। আগের রাতের সিল মারা, ভোট কেন্দ্র দখল ইত্যাদি প্রকাশ্যে কারচুপির যে জঘন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলসহ অন্যান্য কারচুপির সেই ধারাবাহিকতায় চলে এসেছে পরবর্তী সব কয়টি নির্বাচনে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন পৌর নির্বাচন সম্পর্কে বলেছেন যে, ৭৪ শতাংশ ভোট স্বাভাবিক ছিল না।

প্রশাসনে দলীয়করণ হয়েছে চূড়ান্ত পর্যায়ে। আর নির্বাচন কমিশনও মেরুদন্ডহীন। সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় নির্বাচনের ফলাফল গণরায়কে প্রতিফলিত করে না। সরকার অবশ্য এসব নিয়ে মাথাও ঘামায় না। নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করাই কর্তৃত্ববাদী শাসনের লক্ষ্য।

এখানে লক্ষণীয় যে, বিএনপির ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তারা কারচুপি ঠেকাতে পারেনি। কারণ যে নিবর সমর্থক তাকে ভোট দেবে, তারা জানবাজী রেখে রাস্তায় নামবে না। বিএনপি এমন কোন জনকল্যাণকামী পার্টি নয় যে, মানুষকে তারা চরম সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। বরং সন্ত্রাসবাদের পথ নিয়ে তারা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়েছে।

অবশেষে সেই উপলব্ধি বোধহয় তাদের হয়েছে। তারা সুর নামিয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করলেও কোন বড় কর্মসূচি দেয়নি। বিএনপির যে সৌভাগ্যবান ২২ জন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তারাও শপথ নেবেন না, এমন কথা বলছেন না। ভুল কৌশলের জন্য অনেক খেসারত দিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে দ্বিগ্বীজয়ী আওয়ামী লীগ সরকার একটু উদারতা দেখিয়েছে। বিএনপিকে সভা করতে দিয়েছে। এক বছরের মধ্যে প্রথম তারা সভা করার অনুমতি পেল। খালেদা জিয়া সরকারের সমালোচনা করলেও নরম সুরে কথা বলেছেন। নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সন্ধানের জন্য সরকারের প্রতি আলোচনার আহবান জানিয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ হোসেন বলেন, আসুন আমরা শান্তিপূর্ণ পথে রাজনীতিকে অগ্রসর করি। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এই ধারার কথা নতুন মনে হচ্ছে।

২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারির সাথে ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারির মধ্যে কি বিরাট রকমের পার্থক্য। এটা কি রাজনীতিতে নতুন কোন দিকপরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে? এখনো বলা যাবে না।

তবে দুই দিকেই কিছুটা বাধ্যবাধকতা আছে। বিএনপি নেতৃত্ব যে সন্ত্রাসী কৌশল নিয়েছিল তা যে ভুল ছিল, বোধহয় তাদের নেতৃত্বের উপলব্ধিতে এসেছে। এখন অনেক কিছ হজম করে অনেকটা পিছু হটে এসে দল গোছাতে হবে। কতোটা পারবে তা বলা যায় না। কারণ তাদের এক ধরনের রিজার্ভ ভোট থাকলেও নেতৃত্ব বড় দুর্বল। বিশেষ করে লন্ডনভিত্তিক নেতৃত্বকে অর্বাচীনই বলতে হবে। উপরন্তু জনগণের দাবি ভিত্তিক কোন কর্মসূচি নেই বিএনপির। সর্বোপরি জামায়াত সংশ্লিষ্টতা তাদের জন্য বিরাট বড় মাইনাস পয়েন্ট।

অন্যদিকে সরকারি দল যেভাবে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে প্রশাসন, পুলিশ ও মাস্তান নির্ভর হয়েছে, তা তাদের জন্যও সুখবর নয়। উপরন্তু গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির জন্য বিদেশী চাপও আছে, যাকে একেবারে অগ্রাহ্য করা সহজ নয়। তাই তাদের জন্যও একটা বাধ্যবাধকতা আছে, কিছুটা হলেও গণতন্ত্রের ভড়ং দেখাতে হবে। নানাদিকের টানাপোড়নে শেষ পর্যন্ত কি দাড়ায় তা দেখার বিষয়।

তবে এ কথা বলা চলে যে, এই দুই দল দিয়ে জনগণের কিছু হবে না। সে জন্য বামউদার গণতান্ত্রিক শক্তির অভ্যুদ্বয় ঐতিহাসিকভাবে আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেটাও আপাততঃ দৃশ্যমাণ নয়।।

১টি মন্তব্য