Home » আন্তর্জাতিক » বিলিয়ন ডলারের আইএস-এর খিলাফত (শেষ পর্ব)

বিলিয়ন ডলারের আইএস-এর খিলাফত (শেষ পর্ব)

কলাম লিনচ, ডেভিড ফ্রান্সিস, ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন

ইসলামিক স্টেট (আইএস), ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস) কিংবা (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভ্যান্ট (আইএসআইএল) – যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই গ্রুপটি এখন প্রতিনিয়ত আলোচনায় থাকছে। তারা প্রায় পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও প্রায় পুরো বিশ্বই যুদ্ধ নেমেছে। এমনকি আমেরিকা, রাশিয়া পর্যন্ত তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু তারা দমছে না। পাশ্চাত্য শক্তিগুলো এখন মনে করছে, আর্থিক ভিত্তি ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত এই গ্রুপটিকে দমানো সম্ভব নয়। আর গ্রুপটির আর্থিক ভিত্তি অনেক মজবুত, কয়েক বিলিয়ন ডলারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি সফল হবে পাশ্চাত্য শক্তি? ফরেন পলিসির সেই বিশ্লেষণের বাকি অংশ এখানে তুলে ধরা হচ্ছে। অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

আইএস তার তহবিল সংগ্রহের প্রধান উৎস তেল বিক্রির বিকল্প কোনো টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে এখনো মনে করে না যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন এমন আশাও করছে, বিমান হামলা এবং ভূখণ্ড পুনর্দখলের মাধ্যমে আইএসের তেল বিক্রির অর্থপ্রাপ্তির প্রয়াসও শেষ হয়ে যাবে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, তহবিল সংগ্রহের সামর্থ্য ব্যাপকভাবে কমাতে না পারলে চরমপন্থী গ্রুপটিকে কখনো পুরোপুরি দমন করা যাবে না।

সম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দুটি উচ্চপর্যায়ের সভা করেছেন। তাতে আইএসের তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রম ভুল করার অভিযানে অগ্রাধিকার প্রদানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ৭ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউজে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকে বসেন। এতে প্রধান এজেন্ডা ছিল আইএসের তহবিল সংগ্রহ সংযত করার বর্তমান কৌশলকে জোরদার করে জাতিসংঘ প্রস্তাব পাশের আমেরিকান উদ্যোগটি গ্রহণ করা।

দ্বিতীয় বৈঠকটি হয় পেন্টাগনে। জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠক করার সময় ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের জীবনীপ্রবাহ তাদের তেল অবকাঠামোর ওপর নতুন করে আক্রমণ হানছে। তাদের শত শত ট্যাঙ্কার ট্রাক, কূপ ও শোধনাগার ধ্বংস করেছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আইএস যাতে তেল বিক্রি থেকে অর্থ আয় করতে না পারে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। রাশিয়া অভিযোগ করছে, তুরস্কের মাধ্যমেই আইএস তেল বিক্রি করছে। আর এটা জাতিসংঘ প্রস্তাবের লংঘন। জাতিসংঘে নিযুক্ত রুশ দূত ভিতালি চুরকিন এই অভিযোগের সাথে আরো যোগ করেন, তেলের ব্যাপারে মিত্র তুরস্ককে চাপ দিতে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি সক্রিয় নয়। তিনি বলেন, এ ধরনের লংঘনের ব্যাপারে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে রিপোর্ট করার কথা। কিন্তু তা করা হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে আবার রাশিয়া সিরীয় বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা শুরু করেছে। তবে আঙ্কারা এবং অন্য সুন্নিপ্রাধান্যবিশিষ্ট দেশগুলো অভিযোগ করছে, মস্কো আসলে সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আলআসাদবিরোধী গ্রুপগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।

তবে রুশ দূত এই যুক্তি মানতে নারাজ। তার মতে, তুর্কি সীমান্তের মাধ্যমেই যে আইএস তেল পাচার করছে, তার অনেক প্রমাণ তারা তুলে ধরেছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জাতিসংঘ নতুন প্রস্তাবে সীমান্ত এলাকায় ইসলামিক স্টেট যাতে কোনো ধরনের লেনদেন করতে না পারে, সে ব্যাপারে জোর দেওয়া হবে।

জাতিসংঘ কর্মকর্তারা ইসলামিক স্টেটের তেল রাজস্ব নস্যাৎ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, তেল বিক্রি করে তারা যে বিপুল আয় করে, তার বিকল্প কখনোই প্রত্মতাত্ত্বিক সামগ্রী চুরি করে পাওয়া অর্থ হতে পারবে না।

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে যা পাওয়া যাচ্ছে সে অনুযায়ী, সিরিয়া ও ইরাকের কালোবাজারে তেল বিক্রি করে ইসলামিক স্টেট ৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। আর তার নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক লুট করে পেয়েছে ৫০ কোটি ডলার থেকে একশ কোটি ডলার। তাদের অধিকৃত এলাকায় বাস করা লোকজনের কাছ থেকে তারা চাঁদা বা কর হিসেবে আদায় করেছে আরো কয়েক কোটি ডলার। ফলে গ্রুপটি নিঃসন্দেহে ধনবান ও বিত্তশালী।

তবে তাদের সমস্যাও আছে। তাদেরকে নানামুখী যুদ্ধে অংশ নিতে হচ্ছে। তাদেরকে তাদের হাজার হাজার যোদ্ধাকে বেতন দিতে হচ্ছে, অস্ত্র কিনতে হচ্ছে, তাদের অধিকৃত এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। ইরাক ও সিরিয়ায় প্রায় ৮০ লাখ লোক এই গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় বাস করছে। তাদের কর্তৃত্ব যত বাড়বে, তত বেশি লোক তাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে, তাদের রাজস্ব হিসেবে তাদের প্রাপ্তিও বাড়বে।

এই গ্রুপটিকে ধ্বংস করতে প্রেসিডেন্ট ওবামা সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব এখনো রুখে দিচ্ছেন। তিনি বরং কুর্দি যোদ্ধ, ইরাকি সেনাবাহিনীর ওপরই নির্ভর করে আছেন। এতে কিছু কিছু সাফল্যও পাওয়া যাচ্ছে। ওবামার হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যেই আইএসের কাছ থেকে ৪০ ভাগ এলাকা পুনর্দখল করা হয়েছে।

তবে আইএসও থেমে নেই। তারা এখন ইরাক ও সিরিয়ায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। তারা তাদের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে লিবিয়াকে বেছে নিয়েছে। উত্তর আফ্রিকার মধ্যে এই দেশটির হাতেই সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে। আইএসের নেতা আবু বকর আলবাগদাদি গত দুই বছর লিবিয়ায় বেশ কয়েকটি মিশন পাঠিয়ে সেখানকার গ্রুপগুলোকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করেছেন।

বর্তমানে লিবিয়ায় এই গ্রুপটির দুই হাজারের বেশি যোদ্ধা রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে তারা সার্তে দখল করেছে। এটাই এখন তাদের প্রধান ঘাঁটি।

গ্রুপটির ম্যাগাজিন ‘দাবিক’ জানিয়েছে, সেখানে আইএসের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন আবুল মুগিরাহ আলকাহতানি। ইসলামিক স্টেটের কেন্দ্রীয় কমান্ড মনে করে, তাদের তথাকথিত খিলাফত সম্প্রসারণের ‘সর্বোত্তম’ সুযোগের ব্যবস্থা করে দিতে পারে লিবিয়া। দাবিকের সাম্প্রতিক ইস্যুতে কাহতানি বলেছেন, তিনি লিবিয়ার তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে আইএসের তহবিল ঘাটতি পুষিয়ে দিতে পারবেন।।