Home » মতামত » শিক্ষার মান :: পড়ছে দশমে জ্ঞান পঞ্চমের

শিক্ষার মান :: পড়ছে দশমে জ্ঞান পঞ্চমের

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

শিক্ষা একটি অন্যতম মৌলিক অধিকার; যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃতি। একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকসহ সার্বিক অবস্থার প্রকৃত সূচক প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার উপরই নির্ভরশীল। তাই শিক্ষার কোন বিকল্প কোনদিন কোন কিছুতেই হতে পারে না।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অর্জিত মান ১০ বছর পিছিয়েছে। এর কারণ হিসেবে কোন সুযোগসুবিধা না দিয়ে শুধুমাত্র প্রাথমিক স্কুলগুলোকে সদ্য জাতীয়করণ করাকে দায়ী করা হয়েছে। কারন সেখানে শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। পাঠদানসহ স্কুলের নানা কর্মকাণ্ডে সেসব স্কুল পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ভাষার ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা খারাপ ফল করছে। কোচিং বেআইনি হলেও ২০০৯ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে সমাপনী পরীক্ষা চালুর পর তা বেড়েছে। গাইড বইনির্ভর হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা।

আগে দেশে ৩৭ হাজার ৬৭২টি সরকারি প্রাথমিক স্কুল ছিল। ২০১৩ সালে বাচবিচারবিহীনভাবে একসঙ্গে ২৬ হাজার ১৯৩টি নিবন্ধিত প্রাথমিক স্কুলকে জাতীয়করণ করে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এসব স্কুলে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। দুই ধরনের বিদ্যালয়েই এসএসসি পাস করা শিক্ষক আছেন ৫৪ হাজার ৮৪১ জন। তাদের মধ্যে পুরনো স্কুলে ২৬ হাজার ২৩০ জন; আর নতুন স্কুলে আছেন ২৮ হাজার ৬১১ জন। এইচএসসি পাস করা ৯৬ হাজার ৪৬ জন শিক্ষকের মধ্যে পুরনো স্কুলে ৫৬ হাজার ১২৫ জন এবং নতুন স্কুলে ৩৯ হাজার ৯২১ জন। স্নাতক বা সমমান পাস করা শিক্ষক আছেন ৯৯ হাজার ৯৪৬ জন। এর মধ্যে সিংহভাগ ৭৯ হাজার ৭৬১ জন শিক্ষক আছেন পুরনো স্কুলগুলোতে। আর নতুন স্কুলে আছেন ২০ হাজার ১৮৫ জন। মাস্টার্স ও সমমান পাস করা শিক্ষক আছেন ৬০ হাজার ৭৫৭ জন। এর মধ্যে পুরনো স্কুলে ৫৬ হাজার ৫৫ জন এবং নতুন স্কুলে আছেন মাত্র চার হাজার ৭০২জন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের করা মূল্যায়নে দেখা গেছে, জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ নেই। স্কুলগুলোর অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয়। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীর হার অনেক কম। নানা কারণে দুই ধরনের প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বিদ্যমান রয়েছে। ফলে গত এক বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান অনেকাংশে ব্যাহত হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান কমেছে। নিবন্ধিত স্কুলের শিক্ষকদের দ্রুতই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা না হলে স্কুলে পাঠদানের মান আরো কমে যাবে। শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঘাটতি পূরণে দ্রুত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে।

গত দুই বছরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে সরকারি স্কুলে পাসের হার ছিল ৯৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর জাতীয়করণকৃত স্কুলে ৯৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে পাসের হার পুরনো স্কুলে ৯৮ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং নতুন স্কুলে ৯৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মানদণ্ড বিচারে পুরনো সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা সামগ্রিকভাবে ভালো ফল করে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের এক গবেষণা প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোচিং বেআইনি হলেও ২০০৯ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে সমাপনী পরীক্ষা চালুর পর তা বেড়েছে। শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য গত বছর দেশের ৮৬ দশমিক ৩ শতাংশ স্কুলে শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে হয়েছে। আর ৭৮ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়ে কোচিং ছিল বাধ্যতামূলক। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যয়ও বেড়েছে। এই পরীক্ষার জন্য প্রাইভেট পড়ার নির্ভরশীলতা বাড়ছে, পাঠ্যবইকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে গাইড বই। শিশুরা শেখার আনন্দ থেকে এবং সৃজনশীল হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পরীক্ষায় পাসের হার বাড়াতে খাতায় নম্বর বাড়িয়ে দেয়া, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা অনিয়ম হচ্ছে। পরীক্ষার হলে দেখাদেখি করে লেখা এবং উত্তরপত্র মেলানোর জন্য শেষের ৪০ থেকে ৬০ মিনিট অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভাষার ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা খারাপ ফল করছে। ইংরেজিতে ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী লেটার গ্রেড ‘সি’ বা ‘ডি’ পেয়েছে। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে শ্রেণীকক্ষের শিখনের মান বাড়ানো, বিদ্যালয় ও পরীক্ষার হলে অসদুপায় অবলম্বন বন্ধ করা, সমাপনী পরীক্ষা স্থানীয়ভাবে নেয়া, শিক্ষকদের সম্মান ও ক্ষমতায়নে জোর দেয়াসহ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়।।