Home » অর্থনীতি » সৌদি-ইরান সম্পর্ক এবং কমছে তেলের দাম

সৌদি-ইরান সম্পর্ক এবং কমছে তেলের দাম

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ফরেন পলিসি অবলম্বনে

তেল উৎপাদনকারী সংস্থা ওপেকের বৃহত্তম দুই সদস্য সৌদি আরব ও ইরানের বাদানুবাদের তীব্রতা ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং মস্কো থেকে বেইজিং পর্যন্ত কূটনীতিবিদদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। সবার আশঙ্কা ছিল বিশ্ব অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ তেল নিয়ে। অথচ এর মধ্যে তেলের দাম কমে যাচ্ছে। সস্তা তেলে বিশ্ব ভেসে যাওয়ার উপক্রম ঘটেছে। 

এক শিয়া ধর্মনেতার ফাঁসি কার্যকর নিয়ে রিয়াদতেহরান উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ইরানের সাথে সৌদি আরবের কূটনীতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। এই ঘটনায় তেল ব্যবসায়ীরা প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল, এই সংঘাতের জের ধরে তেলের সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়তে পারে। কিন্তু সেই আশঙ্কা অল্প সময়ের মধ্যেই অমূলক প্রমাণিত হয়।

অবশ্য উপসাগরীয় এলাকায় রাজনৈতিক সঙ্কট আরো বেড়েছে। উপসাগরীয় আরো কয়েকটি দেশ সৌদি আরবের সাথে যোগ দিয়ে তেহরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে কিংবা ব্যাপ্তি কমিয়ে এনেছে। কিন্তু তাতেও তেলের দাম বাড়েনি। বরং সরবরাহ বাড়তে থাকায় দাম কমছেই।

ফরেন রিপোর্টসএর ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথু রিডের মতে, সরবরাহ যতক্ষণ বাড়তে থাকবে, ততক্ষণ দামও বাড়বে না। আর পারস্পরিক বিরোধ যতই থাক না কেন, তেহরান ও রিয়াদ কেউই দাম কমানোর কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

লন্ডনভিত্তিক পরামর্শক এনার্জি এসপেক্টসএর ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক রিচার্ড ম্যালিনসন বলেন, সৌদিইরানি সংঘাত আঞ্চলিক রাজনীতির জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, কিন্তু তারা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তেল সরবরাহ কমানোর ক্ষেত্রে এর তেমন কোনো প্রভাব নেই।

পরমাণু প্রশ্নে পাশ্চাত্যের সাথে ইরানের সমঝোতা হওয়ায় তেহরানের ওপর আরোপিত অবরোধ ওঠে গেছে। ফলে তারা এখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রফতানি করতে পারবে, প্রয়োজনীয় সামগ্রী আমদানি করতে পারবে। কিন্তু সৌদি আরব মনে করছে, ইরান তেলের ভালো দাম পেলে তেহরানের অর্থনীতি দ্রুতবেগে বিকশিত হবে। আর তা ইরান আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করবে। আর ইরানের প্রভাব যত বাড়বে, সৌদি আরব তত কোণঠাসা হবে। অথচ তেহরানের ওপর অবরোধ থাকায় রিয়াদ সেই সুযোগটি নিয়েছিল পুরোমাত্রায়।

আসলে তেল হলো এই দুই দেশের মধ্যকার বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অংশ মাত্র। উভয় দেশই তেল থেকে পাওয়া আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেলের দাম দেড় বছর ধরে কমতে থাকায় উভয় দেশই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে। ২০১৪ সালের গ্রীস্মে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম যেখানে ছিল ১১০ ডলার, এখন তা মাত্র ৩০ ডলারের মতো। তেলের দাম কমায় বছরে ইরানের লোকসান হচ্ছে ২৫ বিলিয়ন ডলার, সৌদি আরবের ২০০ বিলিয়ন ডলার।

তবে ইরানের চেয়ে মজুত অনেক বেশি থাকায় দাম কমলেও উৎপাদন বাড়িয়ে ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতে পারবে বলে মনে করছে সৌদি আরব। এ কারণে ইরান এবং ওপেকের অন্য দেশগুলোর উৎপাদন কমানোর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না সৌদি আরব।

এদিকে দাম কমলেও ইরান উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অবরোধ থাকায় এতদিন তারা চাইলেও বেশি গোপনে কিছু তেল রফতানি করতে পারেনি। ২০১২ সাল থেকে তাদের তেল উৎপাদন ছিল দিনে এক মিলিয়ন ব্যারেল। পাশ্চাত্যের অবরোধ প্রত্যাহার হওয়ার আগে তা ছিল দিনে ২.৫ মিলিয়ন ব্যারেল। এখন ইরান আরো এক মিলিয়ন ব্যারেল বাজারে ছাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত যেসব ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে করে বলা যায়, তেলের দাম বাড়ছে না। তবে কোনো কিছুই নিশ্চিত বিষয় নয়। সৌদি আরবইরান হয়তো সরাসরি যুদ্ধ শুরু করবে না। কিন্তু ইয়েমেনে তাদের প্রক্সি যুদ্ধ চলছে এবং তা আরো তীব্র হতে পারে। সেটা মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনায় পরিণত হতে পারে।

আবার সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রগুলোর বেশির ভাগই পূর্বাঞ্চলের শিয়া এলাকায় অবস্থিত। ওই এলাকায় অন্তর্ঘাতমূলক হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ২০১২ সালে হ্যাকাররা, সন্দেহ করা হয় ইরানি, সৌদি আরামকো’র কম্পিউটারগুলো হ্যাক করে। এতে কয়েক সপ্তাহের জন্য কম্পিউটারগুলো অচল হয়ে পড়ে। এই ঘটনায় তেল উৎপাদন না কমলেও সৌদি আরবের জন্য একটা সতর্ক সঙ্কেত। নতুন কিছুও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।।