Home » বিশেষ নিবন্ধ » সেই মার্চ আর এই মার্চ

সেই মার্চ আর এই মার্চ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু
মার্চ ১৯৭১। উদ্বেল বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতায়, স্বাধীনতার অপার আকাঙ্খায়। জাতির জীবনে সোনালী প্রত্যয়, শৃঙ্খল, প্রতিরোধ আর আত্মোৎসর্গে ভাস্বর। সেই বসন্তের আগুনঝরা সময় জুড়ে ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের পথে হেঁটেছিল বাংলাদেশ। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, যা ছিল স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত ধাপে পদার্পন। সাংবিধানিক ধারায় ক্ষমতায় যাওয়া যখন বাধাগ্রস্ত তখনই ১ থেকে ২৫ মার্চ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল জাতির আকাঙ্খার স্ফুরণ।
ব্যক্তি সেখানে হয়ে উঠেছিল গৌণ, মূখ্য হয়ে উঠেছিল আপামর জনসাধারণের স্বাধিকার অর্জনের প্রাণান্তকর আকাঙ্খা। তাকে শক্তি দিয়ে দমিত করছে চেয়েছে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠি। হত্যা, গুম, ধর্ষণ আর অজস্র লাশ দিয়ে ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই আকাঙ্খাকে। কিন্তু সাগরের ঢেউয়ের মত উপচে পড়া জনস্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সবকিছু। সেই এক সময়। ঘনঘোর অন্ধকার সময়। কিন্তু মানুষ থামেনি। মানুষ জেগেছে ভেতরের শক্তিতে। কারণ জনগনের ইতিহাস তো বিজয়গাঁথার। কে রোখে তাকে!
সাহস, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ আর পরার্থপরতার অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল সেই বসন্তে। এজন্যই সামষ্টিক কল্যাণে ব্যক্তি উৎসর্গ করেছিলেন নিজেকে, ভবিষ্যত কল্যাণের জন্য। সেই মার্চে সকল রাজনৈতিক দল এবং জনগন ছিল ঐক্যবদ্ধ। বিপরীতে জামায়াত, মুসলিম লীগসহ ধর্মের কথিত ধ্বজাধারীরা দাঁড়িয়েছে জনআকাঙ্খার বিপরীতে। পাকিস্তানী হানাদারদের নৃশংসতায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কোরামিন দিয়ে বাঁচাতে চেয়েছে মৃতপ্রায় পাকিস্তানকে।
এর বিরুদ্ধে মানুষ একাট্টা হয়েছিল। আলবদর, আলসামস, রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন অকুতোভয়। মৃত্যুপুরীর মধ্যে থেমে থাকেনি জীবনের জয়গান। নিজের জীবনের বিনিময়ে আগত নাগরিকদের জন্য চেয়েছে স্বাধীন দেশ। শেখ মুজিবের ডাকে শুরু হয়েছিল প্রতিরোধ। শেষতক তা ব্যক্তি, দলের সীমানা অতিক্রম করেছে। পরিনত হয়েছে জনযুদ্ধে। সেই বসন্তে মানুষের এই অসামান্য জাগরন এই জাতির এখনও সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রকৃত অর্থে সেই বসন্ত ছিল রাষ্ট্রের অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক সাহসী পদক্ষেপ। ছিল সকল প্রকার রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বৈষম্য বিলোপের অপারাজেয় সাধনা। ছিল রাষ্ট্রকে অধিকতর গণতান্ত্রিক করে গড়ে তোলার প্রাণপণ লড়াই। স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন সমাজ তৈরীর। জাতি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র অর্জনে। প্রণোদনা ছিল আগামী উজ্জল ভবিষ্যত। ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছিল। মুক্তি অর্জনে আর কোথাও এত মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে? ইতিহাসের এরকম উদাহরণ একটিই।
সাড়ে চার দশক পেরিয়ে সেই বসন্তের গৌরবময়, আত্মসম্মানের বলীয়ান, মহিমান্বিত মূল্যবোধ এই বসন্তে কি চেহারা পেয়েছে? অত্যুদ্ভুত দশম সংসদ নির্বাচনের পরে দুই বছরের বাংলাদেশ, পঞ্চদশ সংশোধনীর পরে নতুন আদলের সংবিধান এই দেশকে কোন জাগ্রত চেতনার দিকে ঠেলছে। জাতীয় সংসদে সরকার-বিরোধী দল একাকার, কে সরকার, কে বিরোধী চেনার উপায় নেই।
এই প্রশ্নগুলি উঠলে একাত্তরের মার্চের দিকে তাকাতে কুন্ঠা জাগে। বিদ্বেষ-হিংসা প্রসূত ক্ষমতার কামড়া-কামড়ি জাতির সামগ্রিক বিবেক-বিবেচনাকে অতলে নিয়ে গেছে। গণতন্ত্রের প্রথম সূচক নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। শাসক ও শাসিতদের মধ্যে টেনে দেয়া হয়েছে ভেদরেখা। ধর্মকেও নিরাপদ রাখা যাচ্ছে না। ধর্ম হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকা বা না থাকার অন্যতম হাতিয়ার। মানুষে মানুষে বাড়ছে বৈষম্য। আর এই বৈষম্য যত বাড়ছে, অস্থির সমাজ ততটাই হিংস্র হয়ে উঠছে। এর অনিবার্যতায় এই দেশ এখন শিশু ও নারীর বধ্যভূমিতে পরিনত।
একাত্তরের মার্চে জাতির মধ্যে ছিল এক রাষ্ট্রের চিন্তা। যে ন্যায্য রাষ্ট্র হয়ে উঠবে সকলের। কিন্তু সাড়ে চার দশক পরে বিভাজনের খেলায় এখন জন্ম নিচ্ছে এক রাষ্ট্রের মধ্যে বহু রাষ্ট্রচিন্তার। মূল কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্রের প্রধান স্থপতি জনআকাঙ্খার বিপরীতে এক দলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে ন্যায্য রাষ্ট্রচিন্তা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। এর ফল এত বছর পরেও রাষ্ট্রের সারা অঙ্গে সুস্পষ্ট।
স্বাধীনতা লাভের প্রথম দশকে এজন্যই রাষ্ট্রের স্থপতিরা প্রাণ দিয়েছেন স্বাধীনতা বিরোধী এবং দলের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত ক্ষমতালোভী চক্রের ষড়যন্ত্রে, আন্তর্জাতিক শক্তি যার সাফল্য নিশ্চিত করেছিল। স্থপতিরা জানতেন না, জনআকাঙ্খার বিপরীতে যেমন নিজেকে রক্ষা করা যায় না, তেমনি গোটা দেশ-জাতি নিমজ্জিত হয় ঘোর অমানিশার মাঝে।
এই আত্মপর রাষ্ট্রচিন্তা ২০১৬ সালের মার্চে এসে যে বাংাদেশ তৈরী করে দিয়েছে, তা একাত্তরের মার্চের আকাঙ্খার সাথে সাংঘর্ষিক। নয়া রাষ্ট্রের এই দুর্বলতা অসামান্য দূরদর্শিতায় স্থপতিদের দু’একজন ভাবেননি তা নয়। এটি আঁচ করতে পেরেছিলেন মাওলানা ভাসানী ও তাজউদ্দিন আহমদ। রাষ্ট্র হবে, সাথে রাষ্টানুগ শাসক হতে হবে। যদি তা না হয় তাহলে সেই রাষ্ট্র কতটা বাসযোগ্য হবে, সন্দেহ জেগেছিল উভয় নেতার মনে। সঠিক সময়ে তার গুরুত্ব বিবেচিত না হওয়ায় অচিরেই উল্টো যাত্রায় সামিল হতে হয়েছিল দেশ ও জাতিকে।
সমষ্টির উন্নতিই রাষ্ট্রের উন্নতি। রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কতটা বৈষম্যহীন, তার রাজনৈতিক সুস্থিতি কতটা শুভভারাপন্ন তার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র কতটা কল্যাণকামী। স্বার্থক রাষ্ট্র মাত্রই অধিকসংখ্যক জনগনের কল্যাণ নিশ্চিত করে। যে রাষ্ট্র কতিপয় উন্নতিকে গুরুত্ব দেয়, যে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উ্ন্নয়ন কতিপয়কে পরিপুষ্ট করে, সে উন্নয়ন যতই চোখধাঁধানো হোক অন্তিমে তা হয়ে ওঠে জনবিনাশী। কারণ এই উন্নয়ন শুধু বৈষম্যই বাড়ায়। একাত্তরের মার্চে সংগঠিত হওয়া এবং আন্দোলন ও যুদ্ধের অন্যতম স্বপ্ন ছিল রাষ্ট্র আর কখনই বৈষম্য উস্কে দেবে না।
এক সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এই রাষ্ট্রকে গ্রাস করতে চলেছে। অধিকসংখ্যক জনগোষ্ঠিকে রাষ্ট্র অসুখী করে রেখেছে। এই কারণে রাজনৈতিক সুস্থিরতা নেই। বর্তমানে যে নিস্তরঙ্গ ও উত্তাপহীন পরিস্থিতি দেখে ক্ষমতাসীনরা সুখী বোধ করে, শান্ত ও সুস্থিত বলে তৃপ্ত হয়, ২০১৬ সালের এই মার্চে সেটি হয়তো তাদের মনোজগতের ভাবনায় আছে। কিন্তু সামগ্রিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্য এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও শিশু বা নারীরা নির্মমতার শিকার হয়ে জীবন দিচ্ছেন। পরিবারও এখন আর শিশুদের জন্য নিরাপদ নেই।
সুস্থিত রাজনীতি, গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সুশাসনহীনতায় রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী শাসনের কবলে পড়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন কিছু কিছু অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটায় বটে। কারণ শাসকশ্রেনী যাদের ওপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকে, তাদের সুযোগ-সুবিধে নিশ্চিত করতে উন্নয়ন ঘটাতে হয়। এই কথিত উন্নয়ন টেকসই নয় এবং তা সর্বজনকে সুবিধা দেয় না। কর্তৃতববাদী শাসনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে দমন-পীড়ন এবং যে কোন উপায়ে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে রাখা হয়ে ওঠে মূলনীতি। ফলে প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির বদলে জায়গা করে নেয় হিংসাশ্রয়ী রাজনীতি।
উন্নয়ন তাত্ত্বিকরা বলে থাকেন, Political development along democratic line is as important as economic development- এই তত্ত্বে বিশ্বাস করলে মানতেই হবে, বিদ্বেষপ্রসূত হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলে সুফলগুলি কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। পরিনামে বৃহত্তর জনগোষ্ঠি উন্নয়নের মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ে। হয়ে পড়ে ভাগ্য ও নিয়তি নির্ভর। এই নির্ভরতা তাদের বিপথে চালিত করে এবং হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে জঙ্গীবাদী গোষ্ঠিগুলোতে তরুনদের যুক্ত হওয়ার অন্যতম কারণই হচ্ছে এটি।
স্বৈরাচারী শাসকের পতনের পর দেশের জনগন এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভিকটিম হিসেবে পরিগনিত। তারপরেও পাঁচ বছর পরে তাদের সামনে একটি সুযোগ অন্তত ছিল, ভোটাধিকার প্রয়োগ করে শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে উন্নত কিছুর প্রত্যাশা করা। যদিও সে আশা ভোটাধিকারের মাধ্যমে তারা কখনই প্রতিফলিত করতে পারেননি। এর মূল কারণ হচ্ছে, সামরিক শাসনের আদলে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন অব্যাহত থাকা। এই দুর্বৃত্তায়নে রাজনীতিকদের জায়গা দখল করে নিয়েছে উঠতি ব্যবসায়ী শ্রেনী, যাদের অর্থের মূল উৎস মূৎসুদ্দী পূঁজি ও ঋণের নামে ব্যাংক লুটের অর্থ। ফলে রাজনীতিতেও গুনগত পরিবর্তন ঘটেছে গত আড়াই দশকে এব্ং কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এই লুটেরা ব্যবসায়ী শ্রেনীর স্বার্থ।
রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হওয়া উচিত ছিল নাগরিকদের জন্য সবক্ষেত্রে ন্যায্যতার সূচনা করা। যা একটা সময়েই ন্যায্য রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। ব্যক্তি বিশেষকে অন্যায় সুবিধে দিয়ে সুরক্ষা প্রদান রাষ্ট্রের কোন নৈতিকতার সাথে যায় না। রাষ্ট্রের কাজ সামষ্টিক লক্ষ্যকে সমুন্নত রাখা। রাষ্ট্র যে পদ্ধতিতে কাজ করে সেখানে পক্ষপাতিত্ব, বিশেষ সুবিধে প্রদান যে অন্যায্যতা সৃষ্টি করে, তা এক সময়ে পুরো ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত করে দেয়। ২০১৬ সালের মার্চে এসে এই অবস্থাটি সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে চার দশক পরে যে চোখধাঁধানো উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে তা কতটা টেকসই? গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং সুশাসন ছাড়া এটি কতটা অর্থহীন তা প্রমান করতে বেশিদুর যাওয়া লাগবে না। সারাদেশের আশি ভাগ সম্পদ ও অর্থ কাদের হাতে কুক্ষিগত এই প্রশ্নটির উত্তরে নিহিত রয়েছে উন্নয়ন স্থায়ীত্বশীলতা। ক্ষমতায় থাকতে চোখে ঠুলি পড়ে উন্নয়নের ঢাক বাজানো এবং সবকিছুকে জায়েজ মনে করেন ক্ষমতাসীনরা। ক্ষমতা হারালে চোখ খুলে যায় এবং তখন প্রতিপক্ষের সবকিছুকে মনে হয় অবৈধ।
এজন্য মার্চ এলেই সামনে আসে স্বাধীনতার কথা, মুক্তির কথা। একাত্তরের পয়তাল্লি¬শ বছর পরে ২০১৬ সালের এই মার্চ সামনে নিয়ে আসছে ব্যর্থতা, বিতর্ক, বিভেদ, বিদ্বেষ, সন্দেহ। আবার জিজ্ঞাসা, যুদ্ধাপরাধীদের রায় বাস্তবায়িত হবে? রাজনীতির কূটিল খেলায়, অর্থের ছড়াছড়িতে জনদাবি কি মিলিয়ে যাবে? এ কূটতর্কে জড়িয়ে পড়েছে সরকার, সর্বোচ্চ বিচারালয় পর্যন্ত। ছড়ানো হচ্ছে বিভেদ-বিদ্বেষ। রাষ্ট্র কি এখান থেকে বেরুতে পারবে? পারবে কি সবক্ষেত্রে ন্যায্যতার সূচনা করে জন-মানুষের রাষ্ট্র হয়ে উঠতে?