Home » আন্তর্জাতিক » ভারতের আপত্তিতে অনিশ্চয়তায় গঙ্গা ব্যারেজ

ভারতের আপত্তিতে অনিশ্চয়তায় গঙ্গা ব্যারেজ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ফার্স্টপোস্ট থেকে
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় পানিস্বল্পতা নিরসনে পদ্মায় একটি (গঙ্গা) ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত এখন পর্যন্ত পরিকল্পনাটি গ্রহণ না করায় সেটা ঝুলে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আগের আমলে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু করেছিল।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সম্ভাবতা যাচাই করে ফেলেছে। রাজবাড়ী জেলার পাংশায় নির্মিতব্য ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রস্তাবিত ড্যামটি হবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভাটিতে।
বাংলাদেশ পদ্মা নামে পরিচিত গঙ্গা। আর এটি হলো বাংলাদেশের ভূপৃষ্ঠের পানির অন্যতম উৎস। পানি স্বল্পতা ও লবণাত্মকতা এই অঞ্চলের অভিন্ন সমস্যা। এ থেকে মুক্তি পেতেই ব্যারেজটি নির্মাণে বাংলাদেশ সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্র-স্তর বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাত্মক্ততার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রস্তাবিত ড্যামটি নদীগুলোর মাধ্যমে পানি ছেড়ে দিয়ে লবণের মাত্রা কমিয়ে আনবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সমর্থন না থাকলে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হবে কঠিন কাজ।
ভারতের আপত্তি : নয়া দিল্লি ২০১৫ সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে জানায়, ভারতের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা ঢাকার পাঠানো প্রকল্প নথিপত্র যাচাই করে এই ড্যাম ভারতে বন্যা সৃষ্টি করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের সমতল ভূমি দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভারতীয় চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, নদীটির পানির স্তর সামান্য বাড়লেও বাংলাদেশ সীমান্ত-সংলগ্ন ভারতের বিপুল এলাকা ডুবে যাবে। ঢাকাকে বৈজ্ঞানিক মডেলসহ পুুরো সমীক্ষা প্রতিবেদন পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে নয়া দিল্লি বলেছে, তারা নিশ্চিত হতে চায়, ড্যামের ফলে ভারতীয় ভূখ-ে পানির উচ্চতা বাড়বে না।
বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ভারত যেসব নথিপত্রের জন্য অনুরোধ করেছিল, সেগুলোর সবই পাঠানো হয়েছে, কিন্তু নয়া দিল্লি এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি। নভেম্বরে ভারত সফরকারলে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ তার ভারতীয় সমকক্ষ উমা ভারতীর সাথে সাক্ষাত করেছিরেন। তখন তিনি খুব শিগগিরই ভারতের অবস্থান জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ ধরনের বিশাল কোনো ড্যাম নির্মাণ করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই ভারতের সহযোগিতা কামনা করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারত আরেকটি আন্তর্জাতিক নদী তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক মতানৈক্যে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক অধ্যাপক প্রকল্পটির ব্যাপারে বলেন, ‘ভারতীয় ভূখ-ে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হবে- এ ধরনের কারিগরি ইস্যু তুলে ভারত (গঙ্গা) প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে পারে এমন আশঙ্কায় ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।’ তিনি বলেন, তবে বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের কোনো প্রকল্প উজানের দেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। তিনি বলেন, ভারত যেসব কারিগরি প্রশ্ন তুলেছে, বাংলাদেশের উচিত সেগুলোর দ্রুত জবাব দেওয়া। গত অক্টোবরে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদায়ী ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথে বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড্যাম প্রকল্পটিতে ভারতের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
চীনা সমর্থন?
সমীক্ষা অনুযায়ী, সাত বছরে প্রকল্পটি শেষ করতে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার দরকার হবে। কিন্তু এই তহবিলের সংস্থান করতে পারেনি। পানিমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, গঙ্গা-নির্ভরশীল এলাকায় বর্ধিত কৃষি ও মৎস চাষ এবং সেইসাথে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। ফলে পাঁচ বছরের মধ্যেই ব্যারেজ প্রকল্পের ব্যয় ওঠে আসবে।
চীনা প্রতিষ্ঠান হাইড্রোচায়না করপোরেশন ড্যামটি নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রকল্পটির অর্থায়ন নিয়ে তারা বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে কয়েকবার বৈঠকও করেছে হাইড্রোচায়না করপোরেশন কর্মকর্তাদেরসাথে। তাদের মতে, চীন সরকার পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশকে সহজ শর্তে ২০ বিলিয়ন ঋণ দিতে আগ্রহী। হাইড্রোচায়না করপোরেশনের ব্যবসায়িক উন্নয়ন ম্যানেজার ঝাও ইয়াং বলেন, আমরা প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খুবই আগ্রহী। দুই সরকারের আলোচনার মাধ্যমে তহবিলের ব্যবস্থাও হতে পারে।
গঙ্গা ব্যারেজ ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রিজার্ভার সৃষ্টি করবে। ৬২,৫০০ হেক্টর জমিতে ২.৯ বিলিয়ন কিউবিক লিটার পানি মজুতের সক্ষমতা থাকবে এর। মন্ত্রীর ভাষ্যানুযায়ী, ১২৩টি আঞ্চলিক নদীর মাধ্যমে ২৬ জেলায় পানি সরিয়ে নেওয়া যাবে।
ড্যামটি নির্মাণ করা গেলে পানির স্বল্পতা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে পানির দূষণ প্রতিরোধ করা যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন। নদীতে পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে রিজার্ভারের পানি সারা বছর ব্যবহার করা যাবে। এই পানি সেচ, নৌচলাচল ও লবণাত্মক্ততা দূর করার কাজে লাগবে।
ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক রওশন আলী খান বলেন, রিজার্ভারের মাধ্যমে গঙ্গা বেসিন থেকে পানি নির্গমনের ফলে নদীগুলোতে পলিভরাট সমস্যার সমাধান হবে, পানি নিষ্কাষণ সহজ করে দেবে।
এটা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ রক্ষাও করবে বলে তিনি জানান।