Home » প্রচ্ছদ কথা » ড. আতিউরের পদত্যাগেই যেন সব শেষ হয়ে না যায়!

ড. আতিউরের পদত্যাগেই যেন সব শেষ হয়ে না যায়!

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়া, ঘটনা সংঘটিত হওয়ার এক মাসেও অর্থমন্ত্রীসহ সরকারকে বিষয়টি না জানানো প্রভৃতি বিষয় সামনে রেখেই এবং অনেক জল্পনা-কল্পনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করলেন। নৈতিক অবস্থান থেকেই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে গণমাধ্যমকে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমকে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীও তার এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ঘটনা তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করেছে। অতীত অভিজ্ঞতায় বলা যায়, এখানেই যেন সবকিছুর সমাপ্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দেখার বিষয়, তদন্তে কী বেরিয়ে আসে। সবাই চাইবে, সঠিক তদন্ত এবং তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে উন্মোচন করা হবে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের লুকোচুরি জনমনে সন্দেহই তৈরি করবে। ঘটনাটি গভর্নরের পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সঠিক তদন্তে নজর দিতে হবে এখন, এটি সবাই চায়। এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে এর বিকল্প নেই। অর্থ চুরির সঙ্গে কারা জড়িত, সেটি চিহ্নিত করার পাশাপাশি অর্থ উদ্ধারেও চালাতে হবে জোর তৎপরতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে রিজার্ভের মোট ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় গেছে ২ কোটি ডলার। তার মধ্য থেকে ১ কোটি ৯৯ লাখ ডলার যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাবে (অ্যাকাউন্টে) ফেরত এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকিং সচিব আসলাম আলম। তবে ফিলিপাইনে যাওয়া মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে হদিস মিলেছে মাত্র ৬৮ হাজার ডলারের। অর্থ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনে জব্দ হওয়া ছয়টি ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছে। সেই হিসাবে ফিলিপাইনে চলে যাওয়া মোট অর্থের মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ৩২ হাজার ডলারের এখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হলো, কিভাবে এই অর্থ ফেরত আসবে, কতো তাড়াতাড়ি আনা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা চুরির বিষয়ে এখনো কুলকিনারা না হতেই অর্থ স্থানান্তর দিনক্ষণ নিয়ে দু’রকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে এ চুরি হয়েছে ৪ ফেব্রুয়ারি বা ৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ দেশি বিদেশি তদন্ত সংস্থা প্রাথমিক তদন্তে ২৪ জানুয়ারি এ লেনদেন হয়েছে বলে তথ্য দিচ্ছে। তথ্যের এ গরমিলে প্রশ্ন উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
চুরির দিনক্ষণের গরমিলের তথ্যে দু’দিনের ছুটির ফাঁদের যে কথা বলা হচ্ছে -তা সঠিক নয় বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ছুটি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের নিউইয়র্ক শাখার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। কিন্তু কাজটি যদি ২৪ জানুয়ারি (রোববার) হয়ে থাকে তাহলে ছুটির ফাঁদে পড়ার কোনো অবকাশ নেই।
ফিলিপাইনের পত্রিকা এনকোয়ারার ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করেই এই অর্থ চুরি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম এবং সুইফট কোড কন্ট্রোলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৩০টি পেমেন্ট অ্যাডভাইজ পাঠায় ফিলিপাইনের স্থানীয় ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের জন্য। আর এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এর মধ্যে ৫টি অ্যাডভাইজ অনার করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আর এই পাঁচটি অ্যাডভাইজে মোট ১০১ মিলিয়ন ডলার হ্যাকারদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন উদ্ধারের দাবি করলেও এখনো ৮১ মিলিয়ন রয়েছে হ্যাকারদের হাতে।
এছাড়া গত ৯ মার্চ ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারার জানায়, আরও ৮৭০ মিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ। এই অর্থ দেশটির ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে পাচারের চেষ্টা চলছিল। অবশ্য ঘটনাটি গত মাসের। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক ব্যাংকাররা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ব্যাখ্যা করে তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাকাউটেন্স অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ দু’টি বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত। ওই দুই বিভাগ দেখাশোনায় মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য একজন নির্বাহী পরিচালকও রয়েছেন। সার্বক্ষণিক এ কাজ করার জন্য তাদের বাড়তি সুবিধাও দেয়া হয়। তাহলে ছুটির দিনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার যে যুক্তি দেয়া হচ্ছে তা অবান্তর।
ঘটনা তদন্তে সরকার অবশেষে একটি কমিটি গঠন করেছে। দেখার বিষয়, সরকার বিষয়টি নিয়ে আন্তরিকতার সাথে সত্য উদ্ঘাটনে সচেষ্ট হয়। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ খোয়া যাওয়ার বিষয়টিরও সুরাহা নিয়ে সংশয় তৈরি হয় বৈকি। এবারের ঘটনার উপরই নির্ভর করছে সংশয় কাটানোর, তাতে সন্দেহ নেই। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়ে বিষয়টি দেশের আর্থিক খাতে কি ধরনের পরিবর্তন আনেন, সেদিকে নজর থাকবে সবার। এ কথা সত্য, সরকার যথেষ্ট ব্যবস্থা না নিলে কোনো গভর্নরের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে কাজ করা সম্ভব হবে না।