Home » রাজনীতি » বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু
২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ‘‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায়” নির্বাচিত হওযার গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকার বিষয়টি অনেক আগে থেকেই রয়েছে। ২০১৪ সালে এসে সেটি রেকর্ড ছুঁয়েছিল। ৩’শ আসনে ১৫৪ টি, অর্ধেকেরও বেশি। এটি এখন সংক্রামিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন, একই বছর শেষে পৌরসভা নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এবং এখন সেটি পরিপূর্ণতা পেতে যাচ্ছে আগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে।
যে সকল ভিত্তির ওপর ভর করে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে তার একটি বড় পরিমাপক হচ্ছে অবাধ ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন। গণতান্ত্রিক বা যে কোন ব্যবস্থায় জনগনের মতামত প্রদানের সবচেয়ে স্বীকৃত মাধ্যম নির্বাচন। এটিকে গণরায় বলা যেতে পারে। উপমহাদেশের ইতিহাসে যে নির্বাচনটিকে সবচেয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহনমূলক বলে অভিহিত করা হয়, সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি সামরিক সরকারের অধীনে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেয়া গণরায়ের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সূচনা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন এরকম কোন পরিবর্তন না ঘটালেও জনগনের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান হিসেবে উৎসবে মেতে ওঠার নির্বাচন। কিন্তু দলীয় মার্কার এই নির্বাচনে উৎসব-উৎসাহ সাধারন ভোটারের অন্তত: নেই। নির্বাচনে প্রথম ধাপে ৭৬০টি ইউনিয়ন পরিষদের ৬২টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৬৪৭টির ১৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এটি সত্যিই অভূতপূর্ব, অশ্রুতপূর্ব। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দু’একটি সাধারন ব্যতিক্রম ছাড়া এরকম ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি।
একতরফা, একদলীয় কিংবা একক-কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে কোন কোন রাজনৈতিক দলের বয়কটের কারণে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, এ অভিজ্ঞতা নতুন নয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে এটি শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের ঘোষিত ১২ ও ১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচনে, জাতীয় পরিষদের ৭৮টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ৭৫টি আসনের ১০০টি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন। অবশ্য ঐ নির্বাচনে নির্বাচিতরা কোনদিন পার্লামেন্টে বসার সুযোগ পায়নি। কারণ ঐ বছরের ১৬ ডিসেম্বর অভ্যূদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।
স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত ঘটনাবহুল নির্বাচনে ১১ জন, ১৯৭৯ সালে ১১ জন, ১৯৮৮ সালে ১৮ জন ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একক নির্বাচনে ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে বিএনপি বর্জন করলেও এবং ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের নির্বাচনে কোন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন ছিলেন না। এক্ষেত্রে রেকর্ড করেছে ২০১৪ সালের নির্বাচন, এটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত ১২২ জনকে পাওয়া যেত।
সুতরাং বাংলাদেশ এ যাবতকাল মেনে নিয়েছিল যে, জাতীয় নির্বাচন যদি একতরফা, একদলীয় হয় তাহলে ক্ষমতাসীনদের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন থাকতে পারেন। সেখানে মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি অংশগ্রহন নাও থাকতে পারে। এমনকি ঐ নির্বাচনে গঠিত পার্লামেন্টে সরকার ও বিরোধী দল মিলে একাকার হয়ে যেতে পারে। কিন্তু গত পৌরসভা নির্বাচন থেকে জনগন এটিও দেখতে শুরু করেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও একতরফা, একক ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন হতে চলেছে।
এই প্রথম রাজনৈতিক মনোনয়নের নির্বাচনে ১৭৪টি ইউনিয়নে দেশের একটি প্রধান দল বিএনপির কোন প্রার্থী নেই। এদিক থেকে টেক্কা দিয়েছে বাগেরহাটের মোল্লারহাট ও চিতলমারী উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়ন। এখানে সব ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে কাউকে প্রার্থী হতে দেয়া হয়নি। এমনকি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও মনোনয়ন পত্র দাখিলের সুযোগ পায়নি। কিভাবে বিপক্ষ প্রার্থীদের বিরত রাখা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রসঙ্গত: এই আসনের সংসদ সদস্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিন।
নির্বাচন কমিশনের নিস্ক্রিয়তা ও নির্বিকারত্ব দেখার মত। হালে দু’একটি ক্ষেত্রে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করলেও হাজার হাজার ঘটনার মধ্যে তা কোন প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। মাত্র কিছুকাল আগে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনেও একই দশা হয়েছিল। মনোনয়ন পত্র জমা দিতে না পারার অজস্র ঘটনা, একের পর এক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ক্ষমতাসীন প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়াÑ কোন কিছুই আমলে নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। এখনই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই নির্বাচন কি আরো একটি প্রহসনে পরিনত হতে চলেছে?
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে একটি বড় খুঁটি হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। অবাধ নিরপেক্ষ, অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সেরকম অবকাঠামো হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। যে সব দেশে নির্বাচন কমিশন দুর্বল নেতৃত্ব, অযোগ্য ব্যবস্থাপনা ও দলীয় মনোভঙ্গির বাসনা পূরণের ক্ষেত্র হয়ে যায়, সেখানে জনআকাঙ্খা প্রতিফলনের উপায়গুলিও নি:শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় নির্বাচন যতটা না গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য, তার চেয়ে বেশি কর্তৃত্ববাদী শাসনকে মহিমান্বিত করার জন্য। এজন্যই ২০১৪ থেকে গড়ে ওঠা নির্বাচনের সংস্কৃতি দেশকে ক্রমাগত পেছনের দিকে ঠেলছে।
আগেই বলেছি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এই দেশে বরাবরই উৎসাহ, উদ্দীপনা ও উৎসবের। এই নির্বাচনে ভোট দেয়া ও নিজের পছন্দমত প্রার্থী নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ থাকে মাত্রা ছাড়ানো। আশির দশকে সামরিক শাসনামলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চর দখলের আকার ধারণ করলেও প্রতিদ্বন্দ্বীতা অন্তত: ছিল। ১৯৯১ সালের পরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পরোক্ষ মনোনয়ন ও সমর্থনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনগুলিতে উৎসবের মেজাজ আবার ফিরে আসে। ভোটারদের উচ্ছাসিত অংশগ্রহনে নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছিল তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতার।
এবারেই প্রথম সরাসরি রাজনৈতিক মনোনয়নে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের দাপট এবং প্রশাসন-পুলিশের পক্ষপাত দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিরোধী দলীয় প্রার্থী, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের কথিত বিদ্রোহী প্রার্থীরাও এলাকাছাড়া। ভোটাররা আতঙ্কিত, ভোট দেবার আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং এটিও অনেকটা একক নির্বাচনের রূপ লাভ করতে যাচ্ছে।
এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, ক্ষমতাসীনরা ও নির্বাচন কমিশন মিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় যে নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাচ্ছেন, সেটি কি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হতে চলেছে? ২০১৪ সালের নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি ভোটারের অংশগ্রহন ছিল না। গত পৌরসভা নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের মাঠে নামতে দেয়া হয়নি। আগত ইউপি নির্বাচনে ইতিমধ্যে ৭৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত। দুই উপজেলার একটি ইউনিয়নও বিরোধী দলীয় প্রার্থী নেই।
জনগনের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের দাবি করে, তাঁর আমলে সেই ভোটের অধিকার নির্বাচন কমিশন যাদুঘরে পাঠাতে চলেছে – সেটিই কি তাঁর এবং জনগনের অনিবার্য নিয়তি!