Home » আন্তর্জাতিক » ধর্মীয় উগ্রতা প্রশ্নে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা

ধর্মীয় উগ্রতা প্রশ্নে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ইকোনমিস্ট থেকে–
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ফুলে ফেঁপে ওঠেছে। বিকাশমান বাণিজ্যিক যোগাযোগ, অভিন্ন কৌশলগত উদ্বেগ এবং সমৃদ্ধিশীল ভারতীয় বসতি বন্ধুত্বকে মজবুত করে তুলছে। তবে নিরেট বাস্তবতা হলো উভয় দেশে থাকা বিপুল, বৈচিত্র্য ও বিরোধের জায়গায় ভর্তি- যেগুলো পরিস্থিতি কঠিন করে তুলতে পারে। এসবে এমন একটি আছে যা উভয় দেশ, উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। সেটা হলো ধর্মীয় স্বাধীনতার সংজ্ঞা।
আমেরিকার ধর্মীয়-স্বাধীনতার দূতদের সৌদি আরব, পাকিস্তান ও চীনের মতো অ-মুক্ত স্থানগুলো সফর করতে পারলেও তৃতীয়বারের মতো ভারতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গত ৪ মার্চ ‘ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের (ইউএসসিআইআরএফ) একটি প্রতিনিধি দলের ভারত যাত্রা শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তারা ভিসা পায়নি। সংস্থাটির কমিশনার ও সাবেক চেয়ারম্যান ক্যাটরিনা ল্যান্টস সুইট বলেছেন, ‘আমরা খুবই হতাশ, এটা সত্যিই সুযোগ হারানো।’
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটাকে দুঃখজনক হিসেবে অভিহিত করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটন ডিসিতে ভারতীয় দূতাবাস বলেছে, ভারতে সাংবিধানিকভাবে নিশ্চয়তা দেওয়া অধিকার-পরিস্থিতি নিয়ে রায় প্রদান করতে ইচ্ছুক কোনো বিদেশী সংস্থাকে অনুমতির কোনো অবকাশ তারা দেখছে না। এর জবাবে ক্যাটরিনা ল্যান্টস বলেছেন, তাদের সফরের রায় প্রদানের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, বরং মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরকে দেওয়া কমিশনের পরামর্শগুলো ঠিকমতো পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি নিম্নপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিদর্শকদের আমেরিকান মূল্যবোধ ভারতের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। তারা বরং সব দেশের পালনীয় আন্তর্জাতিক যে মানদন্ডে ভারত স্বাক্ষর করেছে, সেটা কতটা পালিত হচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখত। কমিশনের অন্যতম উদ্বেগ হলো ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ‘ধর্মান্তরবিরোধী’ আইন প্রয়োগ। হিন্দুদের খ্রিস্টান বা ইসলামে ধর্মান্তর ঠেকাতেই মূলত আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
নরম করে বলা যায়, ইউএসসিআইআরএফ ও ভারতীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে কিছুটা জটিল ইতিহাস রয়েছে। ২০০৫ সালে এই যুক্তিতে মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় ২০০২ সালে সেখানে সংগঠিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য তিনিও দায়ী। তাকে ১৯৯৮ সালের আমেরিকার ধর্মীয়-স্বাধীনতা আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ওই আইনের আওতাতেই ফেডারেল সরকারের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত, তবে স্বাধীন তদারকি সংস্থা হিসেবে ইউএসসিআইআরএফ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি কয়েক বছর পর্যন্ত কিছুটা সফলতার সাথে মোদির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে সক্ষম হয়েছিল। গুজরাট দাঙ্গা এবং এর তদন্ত নিয়ে মোদির অবস্থানকে মেনে না নেওয়ার বিষয় ছিল এটা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১২ সালের নভেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সংস্থাটি জানায়, গুজরাট প্রশ্নে ‘পুরোপুরি স্বচ্ছ’ না হওয়া পর্যন্ত মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত হবে না।
এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচ- বিতর্ক হয়। আমেরিকান কট্টর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অহিন্দু বংশোদ্ভূতরা দাবি করে, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতি অন্যান্য ধর্মের জন্য বিপর্যয়কর। তবে আমেরিকায় হিন্দু জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের মধ্যে বিজেপির বিপুল ও সোচ্চার অনুসারী রয়েছে। এমনকি মোদিকে সশরীরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে ভিডিও ক্লিপিংসের মাধ্যমে হলেও বক্তা হিসেবে তার উপস্থিতির দাবি তোলা হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রেও পাড়ি দিয়েছে।
মোদি ২০১৪ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ থেকে বাদ দেওয়া অব্যাহত রাখার কোনো প্রশ্নটি টিকে থাকেনি। তিনি ও বারাক ওবামা কয়েক দফা উচ্চ পর্যায়ের সভা করেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রশ্নে আমেরিকার নির্বাচকম-লীর অনুভূতি এত প্রবল ছিল যে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি ভারত সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামাকে সব ধর্ম যাতে বিকশিত হতে পারে, তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অন্তত কিছু সুপরামর্শ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মেহমানের বক্তব্য তার মেজবান পছন্দ না করলেও আমেরিকার কিছু ভোটারকে তা সন্তুষ্ট করেছে।
গত মাসে আট আমেরিকান সিনেটর এবং ২৬ প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য ভারতের খ্রিস্টান, মুসলমান ও শিখদের প্রতি আচরণ নিয়ে ‘বিশেষ উদ্বেগ’ প্রকাশ করে মোদিকে একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তারা বলেন, ৫০টি গ্রাম পরিষদ অ-হিন্দু রীতিনীতিকে অপরাধমূলক কার্যক্রম ঘোষণা করায় ছত্তিশগড়ের খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরা দুর্ভোগে রয়েছে; হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ গরু খাওয়া নিয়ে মুসলমানরা আইন হাতে তুলে নেওয়া লোকজনের সহিংসতার মুখে রয়েছে; আলাদা ধর্মের স্বীকৃতি না দেওয়ায় শিখরা হতাশ হয়ে পড়েছে। তবে একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখছেন, এই বোধ থাকায় আমেরিকান আইন প্রণয়নকারীরা তাদের বক্তব্যকে বেশ সতর্কভাবে সংযত রেখেছেন। তারা ‘ধর্মের পূর্ণ স্বাধীনতা’ দেওয়া হবে বলে মোদির দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ‘তা বাস্তবায়ন করার জন্য’ তার প্রতি অনুরোধ জানান।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমেরিকার এসব আইন প্রণয়নকারীর মতে, মোদিকে চিঠি লিখে আসলে তারা তাদের ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করছেন। তবে ওই বক্তৃতায় কর্ণপাত করার কোনো ইচ্ছা সম্ভবত ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের নেই। চাপ প্রয়োগ করা হলে সম্ভবত তারা বলে দেবেন, দুনিয়া এখন বদলে গেছে, বৈশ্বিক বিষয়াদিতে আমেরিকার তুলনামূলক প্রাধান্য ১৯৯৮ সাল থেকে আর আগের মতো নেই।