Home » প্রচ্ছদ কথা » বিএনপি’র কাউন্সিল : এসব কী শুধুই কথার কথা

বিএনপি’র কাউন্সিল : এসব কী শুধুই কথার কথা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু :

ক্ষমতা হারানোর সাত বছর পরে এবারের কাউন্সিলে বিএনপি প্রধানের বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে তাঁর দিব্যদর্শন ঘটেছে। নাকি তিনি আর দশ কথার মত অনেকগুলি নীতি নির্ধারনী বিষয়ে বক্তব্য দিলেন, যার মর্মার্থ সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ শোনার অপেক্ষায় রইলাম। তাঁর ভাষণ লিখিয়েদের ধন্যবাদ, অনেকগুলি মৌলিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের অবতারনা করা হয়েছে, নব্বইয়ের শীত মৌসুমে এরশাদ পতনের পর জোটগত ও দলগতভাবে যেগুলি বাস্তবায়নে তাঁরা অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু একক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে গিয়ে খালেদা বা হাসিনা সরকার বিকাশমান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে দেশকে নিয়ে গেছেন উল্টো যাত্রায়।

কাউন্সিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরনে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে”।

এই বক্তব্য খালেদা জিয়ার! এটি অবিশ্বাস্য! এটি শুনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই বক্তব্য তিনি মনেপ্রানে বিশ্বাস বা ধারন করেন? যার দলে গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে এক হাজার একটা প্রশ্ন আছে তিনি বলছেন, ক্ষমতায় গেলে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। বিএনপির গঠনতন্ত্র যদ্দুর জেনেছি দলে চেয়ারপার্সন নিরঙ্কুশ, এবারের কাউন্সিলেও সেটি প্রমানিত। কাউন্সিল তাঁকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়েছে, তিনি যেভাবে চান সেভাবেই কমিটি গঠিত হবে।

দলে এরকম অবিসংবাদিত ক্ষমতার অধিকারী কোন ব্যক্তি সরকারের প্রধান নির্বাহী ক্ষমতায় আসীন হলে তিনি হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। আজকের সামগ্রিক সংকটের মূলে রয়েছে ব্যক্তির হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পূঞ্জিভূত হওয়া। গত সাত বছরে প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিষয়ে প্রতিদ্বদ্বীকে ইঙ্গিত করে যদি খালেদা জিয়ার এই দিব্যদর্শন ঘটে থাকে, তাহলে প্রথমেই দলের অভ্যন্তরে তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য এনে সততার পরীক্ষা দিতে হবে। প্রমান করতে হবে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তিনি আসলেই বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য চান এবং ক্ষমতায় গেলে তিনি এভাবেই সেটি করতে চান।

কাউন্সিলের আগেই দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের পুণঃনির্বাচন প্রমান করেছে তাদের প্রতিপাদ্য “মুক্ত করবই গণতন্ত্র” কতটা অসাড়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জয়-জয়কারের এই দেশে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দলে প্রতিদ্ব›দ্বীতাহীন, ক্ষমতায় থাকলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এ আর নতুন কিছু নয়। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন নিয়ে তাদের হা-হুতাশ এবং সমালোচনার নৈতিক অধিকার এর মধ্য দিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়বে। অপর  অপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা এতে খুশি, তিনি বলেছেন, “নাটকটা ভালই করেছে”।

গোটা কাউন্সিলের দৃশ্যমান একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল। ছয় বছর পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হবেন। দলের পূর্ণ মহাসচিব হবেন। প্রয়াত: মান্নান ভূঁইয়ার পরে সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ হিসেবে ফখরুল এই পদে বসবেন। সেটি ঝুলে থাকল চেয়ারপার্সনের ইচ্ছায়-অনিচ্ছার ওপর। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত এক বা দ্বিতীয় নেতৃত্বের দলে সাধারন সম্পাদক কিংবা মহাসচিবের পদ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে এটি কমবেশি সকলের জানা। তারপরেও ষাট দশকে তাজউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারনে যধেষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন। মান্নান ভূঁইয়াও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিলেন।

এটি মধ্যপন্থী দল থেকে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া বিএনপির চলমান বিপর্যয় কাটাতে পুরানো নেতৃত্বকেই বহাল রাখা হয়েছে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতামত্ত বিএনপি কখনই ভাবেনি ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সে সময়ে রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র হাওয়া ভবন এবং এর আর্শীবাদপুষ্টরা কাউকেই মানুষ মনে করতে রাজী ছিলেন না। ক্ষমতা হারিয়ে তারেক রহমানের লন্ডন চলে যাবার পরে বিএনপির দোর্দন্ড প্রতাপশালী নেতারা মামলা, জেল ও সরকারের রোষানল থেকে রক্ষা পাবার ক্রমশ: নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাসে উটপাখির মত বালুতে মুখ গুঁজে লুকিয়ে পড়েন।

বহু ধারা এবং মত-পথের সমন্বয়ে গঠিত দলটিতে এখন দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব সুস্পষ্ট। সাবেক বামরা অনেকটা কোনঠাসা ছিলেন। তবে মির্জা ফখরুল মহাসচিব  হলে এই ধারাটি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ডানদের দৌরাত্মে এই দল সামগ্রিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে, প্রতিরোধ বা ক্ষমতাসীনদের পুন:নির্বাচনে বাধ্য না করতে পারায়। এটি আরো ত্বরান্বিত হয়, ২০১৫ সালের শুরুতে হরতাল-অবরোধের নামে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করায়। সরকার দেশে-বিদেশে এই সুযোগে বিএনপিকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় এবং যৎকিঞ্চিৎ সাফল্য লাভ করে।

দল হিসেবে বিএনপির এই বিপর্যয়, দুর্গতির কারণ তাদের শীর্ষ পর্যায়ে এখনও অনুদঘাটিত। এটি অনুদঘাটিতই থেকে যাবে কারণ, একটি একক নেতৃত্বের পরিচালিত দলে কখনই প্রশংসা ছাড়া ব্যর্থতার মূল্যায়ন হয় না। ফলে জনসমর্থনপুষ্ট এই দল কেন ব্যর্থ হল, কঠিন দুঃসময়ে পতিত হল-এসব বিশ্লে¬ষণ কখনই হবে না। আগেই বলেছি, বহু ধারা ও মত-পথের এই দলকে সমন্বিত রাখতে পারে একমাত্র ক্ষমতা। দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে এই কাঠামোর একটি দলে যে যে দুর্গতি এবং দৈন্য হওয়ার কথা তার সবকিছুই এখন বিএনপির গোটা অবয়বে স্পষ্ট।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার সময় জামায়াতের মত একটি অপরাধ প্রবণ দলের খপ্পরে পড়ার মত বৃহৎ ভুল, অক্ষমতা, অন্যায্যতা, অন্যায় সর্বোপরি রাজনৈতিক অপরিপক্কতার কারণে আজকের যে পরিস্থিতি-এর কোন ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন নেতা-কর্মীদের সামনে বিএনপি উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলে এর সকল দায় তারা চাপাতে চেয়েছে এক/এগারো সেনা সমর্থিত সরকার ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর। দল হিসেবে ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ সময়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সামগ্রিক ব্যর্থতা উঠে আসেনি।

অনুদঘাটিত, অনির্ণেয় এসব ভুল ও অক্ষমতার পূনরাবৃত্তি অব্যাহত রেখেছে দলটি। দেশের রাজনীতিতে, দলের অভ্যন্তরে-কোন ক্ষেত্রেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়নি গত সাত বছরে কেন তারা একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারলো না। এর অনিবার্যতায় সংঘবদ্ধ, সৃজনশীল রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় যেতে পারছে না দলটি। এই অচলাবস্থার মধ্যে বাধ্য-বাধকতার একটি কাউন্সিল করছে বিএনপি। যেন এই কাউন্সিল ছিল খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানের বিনা প্রতিদ্ব›দ্বীতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য! দলের এমন পরিস্থিতিতে তারা কিভাবে আগামী গণতন্ত্রের সারথী হবে?

রাজনীতির একটি সন্ধিক্ষণে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসন-পুলিশ সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশে মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন এবং নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলের নামটি যারা টিকিয়ে রাখছেন, খালেদা জিয়া কাউন্সিলের আগে তাদের নিয়ে একদিনের জন্যও বসেননি। ভবিষ্যত ভাবনা নিয়ে তাদের বক্তব্য শোনেননি। মাঠ পর্যায়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রণোদনা যোগাতে পারেননি। বিএনপির জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জ হবে, মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে শীর্ষ নেতৃত্বের দুরত্ব লাঘব।

ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির একটি চটকদার শ্লোগান রয়েছে। চটকদার বলা হচ্ছে, কারণ দলটির অবয়বে কোথাও এই শ্লোগানের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অতীত-বর্তমানে যেসব দলগুলো ছিল তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য। কাউন্সিলে বিএনপির শ্লোগান ছিল, “দুর্নীতি দু:শাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রে বাংলাদেশ”। সন্দেহ নেই, শ্লোগান হিসেবে এটি অসামান্য ও তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু যে দলটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দুঃশাসন নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই, তার কোন ব্যাখ্যা-মীমাংসা ছাড়া এরকম শ্লোগান চটক-চমক সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র চায় বিএনপি। এজন্য প্রথম প্রশ্নের জবাব দিতে হবে বিএনপিকে, দলে কি গণতন্ত্র চায় তারা? যে দলটির নেতৃত্বই উত্তরাধিকার সূত্রে নির্ধারিত, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, কন্যা-জায়া-জননী সেখানে এই শ্লোগানের অসাড়ত্ব বুঝতে পন্ডিত হওয়া লাগে না। এবারের কাউন্সিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল রাখতে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার পথে যায়নি।  শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, মাইকে ঘোষণা হবে, হাত উঁচিয়ে সমর্থন ব্যক্ত হবে। অথচ দলটির গঠনতন্ত্রের বিধানঃ জাতীয় কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হবেন।

ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানেই। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে যে বাক্যটি যুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা একচ্ছত্র করা হয়েছিল, বাহাত্তরের সংবিধানে সেই বাক্যের প্রেসিডেন্ট শব্দটি মুছে প্রধানমন্ত্রী বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগ কখনও স্বীকার করেনি। অপরপক্ষে বিএনপি পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা পর্যন্ত একনায়কতান্ত্রিকতা দুর করেনি। বরং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিভাবে আরো নিরঙ্কুশ করা যায়, সেই পথেই হেঁটেছে।

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সামনে এই সুযোগটি এসেছিল যখন দেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরছে। কিন্তু বিএনপি বাহাত্তরের সংবিধানের ৫৫ অনু্েচ্ছদ, যেখানে মন্ত্রীসভাকে নিঃস্ব করে  প্রধানমন্ত্রীকে সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল, সেটি পুণরুজ্জীবিত করে ক্ষান্ত দেয়নি, দলত্যাগ সংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদও তারা আরো কঠোর করে (পঞ্চদশ সংশোধনীতে যেটি বাদ পড়েছে), যাতে প্রধানমন্ত্রীর আসন টলে না যায়। সে সময়ে জরুরী অবস্থা জারীতে এবং সংসদ ডাকা ও বাতিল করায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের বিধান ছিল না, সেটিও যুক্ত করা হয়।

আওয়ামী লীগও এসব ক্ষেত্রে বিএনপিকে অনুসরণ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে সকল কর্তৃত্ব ও দলে তাঁর নিরঙ্কুশ প্রধান্য বজায় রেখেছে। সুতরাং বিএনপি নেতার বক্তব্য যে কথার কথা নয় সেটি প্রমান করতে অতি দ্রুত সংস্কার কমিটি করে সহসাই তার খসড়া জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে। খালেদা জিয়া কাউন্সিলে শুধু হাসিনামুক্ত নির্বাচনের বিষয়টি স্পষ্ট করলেন, কিন্তু তিনি বা তাঁর দল নির্বাচনকালীন সরকার চায় (তারা অবশ্য এখন আর তত্তাবধায়ক সরকার বলছেন না, বলছেন নিরপেক্ষ সরকার), এর কোন পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা অজতক জাতির সামনে হাজির করতে পারলেন না।