Home » মতামত » ক্রিকেট আধিপত্যবাদ : প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশকেই

ক্রিকেট আধিপত্যবাদ : প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশকেই

মোহাম্মদ হাসান শরীফ :

এশিয়া কাপ হলো, টি-২০ বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব হলো। এর আগে আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক আসর হলো। তাসকিন আহমেদ এগুলোতে দোর্দন্ড প্রতাপে খেললেন। তার বোলিং ভঙ্গি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেন না। এমনকি যে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাচের সুবাদে তার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো, সেখানেও কিন্তু তার একটি বলও ‘নো’ ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু ম্যাচ শেষে তাসকিন আর আরাফাত সানির বিরুদ্ধে রিপোর্ট দেওয়া হলো। তাদের বোলিং ভঙ্গি সন্দেহজনক। তারপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা। আর সেখানে যথারীতি ব্যর্থ। তাদের ওপর নেমে এলো নিষেধাজ্ঞার খড়গ।

এই নিষেধাজ্ঞা কেবল তাদের ওপরই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উদীয়মান শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকেই চেপে ধরা। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটাকে সূচনাতেই শেষ করে দেওয়া।

বাংলাদেশকে হতদমিত করলে ভারতের কী লাভ? সবচেয়ে বড় লাভ তাদের ক্রিকেটীয় বর্ণবাদ সমুন্নত থাকবে। ক্রিকেটের শুরুতে কিন্তু এমন মানসিকতা ছিল। ব্রিটিশ প্রভূরা ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দিতে রাজি ছিল না। লর্ডদের এই বিনোদনকে তারা ‘ভদ্রলোকের খেলা’ হিসেবে অভিহিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে উপনিবেশভুক্ত কয়েকটি দেশে মাত্র এই খেলাটি প্রচলিত হয়। অলিম্পিকের মতো আসরে ক্রিকেট নেই। ফুটবল যেখানে সবাই খেলতে পারে, ক্রিকেটে নানা প্রতিবন্ধকতা। নানা তথাকথিত নিয়মের বেড়াজাল দিয়ে অন্যদের ক্রিকেট থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। চাইলেও তারা ক্রিকেট খেলতে পারবে না। শুরুতে এই কাজটি করেছে ইংল্যান্ড। তারপর অস্ট্রেলিয়া। এখন করছে ভারত।

জগমোহন ডালমিয়া যখন আইসিসির সভাপতি ছিলেন, তখন কিন্তু অন্য রকম পরিস্থিতি ছিল। তিনি চাইছিলেন জোটবদ্ধ এশিয়াকে নিয়ে অ-এশিয়ানদের প্রতিরোধ করতে। তিনি তার এই কাজে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে পেয়েছিলেন। ওই প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাওয়ার পর জোটবদ্ধ থাকার প্রয়োজন আর অনুভব করেনি ভারত। এর মধ্য অবশ্য আরো দুটি ঘটনা ঘটে গেছে। ডালমিয়ার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং ভারতে কয়েকজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়ের আবির্ভাব। এসব খেলোয়াড় ভারতকে ভালো দলে পরিণত করেছে। একইসাথে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে এন শ্রীনিবাসনের মতো একনায়কদের। এই বর্ণবাদী চরিত্রগুলো ন্যূনতম প্রতিরোধের সব সম্ভাবনা শুরুতেই শেষ করে দিতে বদ্ধপরিকর। আইসিসি এখন এদের দখলেই। শ্রীনিবাসন সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তার তুলনায় বেশ নমনীয়, ডালমিয়ার কাছাকাছি। কিন্তু অন্যরা তো রয়ে গেছে। তার ফল হলো তাসকিনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ।

নিজেদের মাতব্বরি অব্যাহত রাখার জন্য ভারত-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ঐক্যবদ্ধ হয়ে আইসিসিকে কুক্ষিগত করেছে। তাদের কেউ বলে তিন মাতবর, কেউ তিন জমিদার, কেউ তিন মোড়ল। তারাই এখন অঘোষিত। ভারত থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড এখন ভারতের সব আবদার মেনে নিচ্ছে। এর জের ধরে কেবল বাংলাদেশেরই নয়, এই তিন দেশের বাইরের ক্রিকেটারদের ওপর নেমে আসছে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা।

ধারাভাষ্যকার শামীম আশরাফ চৌধুরী একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। ওই তিন দেশের কোনো ক্রিকেটার এখন পর্যন্ত অবৈধ ঘোষিত হননি। গত আইসিসি বিশ্বকাপের আগে সুনীল নারায়ন, সাইদ আজমল, মোহাম্মদ হাফিজের মতো বেশ কয়েকজন বোলারদের হঠাৎ করে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এটা কি বিশ্বকাপে মাতব্বরদের পথ পরিষ্কার করার আগাম কার্যক্রম ছিল? তখনই অনেকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন।

ভারত এখন যে কাজটি করছে, এই কিছু দিন আগে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড তা-ই করত। মুত্তিয়া মুরালিধরনের ব্যাপারটাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। এখন উভয় দেশই মুরালিধরনের ব্যাপারে উচ্ছ¡সিত, প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু এই লঙ্কান বোলার যখন দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন, তখন শেন ওয়ার্নের চেয়েও সফল ছিলেন, তখন তার বোলিং ভঙ্গি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলে তাকে নাজেহাল করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তবে শ্রীলঙ্কা হাল ছাড়েনি। তারা দৃঢ়ভাবে মুরালির পাশে ছিল। মুরালির সৌভাগ্য তিনি বোর্ডের পাশাপাশি অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো একজন অধিনায়ক পেয়েছিলেন। হাফিজ, আজমলরা পাননি। তাসকিনরা কি পারবেন?

কাজটা খুবই কঠিন। গত আইসিসি বিশ্বকাপের সময় ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে বাংলাদেশকে অন্যায়ভাবে হারিয়ে দেওয়ার পর ওই সময়ে সংগঠনটির সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল (পরিকল্পনামন্ত্রী) অভিযোগ করে মন্তব্য করেছিলেন- ‘আইসিসি এখন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলেরই নামান্তর’। তিনি সংগঠনটিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন বলেই এমন মন্তব্য করতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পেছনে ডালমিয়ার অবদান ছিল। তবে সাধারণভাবে ভারতের বড় অংশই চাচ্ছিল না, বাংলাদেশ তাদের সমান মর্যাদার হোক। বর্তমানে তাদের ওই মানসিকতা আরো জোরদার হয়েছে। এর একটি প্রমাণ হলো, এত বছর পরও বাংলাদেশকে টেস্ট খেলার জন্য ভারতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ কি হাল ছেড়ে দেবে? না। হাল যে ছেড়ে দেবে না, সেটা বাংলাদেশ এর মধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে। তাসকিন নেই, সানি নেই, অসুস্থতার কারণে তামিম ইকবাল নেই, কিন্তু তবুও তারা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই করেছে। অল্পের জন্য ম্যাচটি হাতছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ লড়াই করার যে মানসিকতা দেখিয়েছে, সেটাই তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সেই বাঘ কারো কাছে আত্মসমর্পণ করে না। বাংলাদেশও করবে না। নিজেরা তো এগিয়ে যাবে, সেইসাথে বঞ্চিত অন্য দেশগুলোকে নিয়ে আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।