Home » প্রচ্ছদ কথা » বন্ধ করুন সুন্দরবন বিনাশী কর্মকান্ড

বন্ধ করুন সুন্দরবন বিনাশী কর্মকান্ড

ম. ইনামুল হক :

সুন্দরবনের শেলা নদীতে আবার জাহাজডুবি। গত ১৯ মার্চ দিবাগত রাতে সি হোর্স-১ নামের এই জাহাজটি ১২৩৫ টন কয়লা নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নোয়াপাড়া যাবার পথে তলা ফেটে গেলে ডুবে যায়। এর ফলে নদীর পানি, এর মাছসহ জলজ প্রানী ও জীবসমূহের কি ক্ষতি হয়েছে এবং হবে তা’ হিসেব করা কঠিন। তবে সুন্দরবনের এই নৌ পথে এই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় রয়েছে। এর আগে ২০১৪ সুন্দরবনের চান্দপাই রেঞ্জের ভেতরে সাউদার্ণ স্টার-৭ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ তলা ফুটো হয়ে ডুবে গেলে ৩,৫৭,৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সুন্দরবনের নদী ও খালে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক দূষণ। সুন্দরবন ২৬৯ প্রজাতির বিচিত্র পাখি, ডাঙ্গার প্রাণী, মাছ ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল এবং ৩৩৪ প্রজাতির বিশেষ গাছপালার বন। ১৮৭৫ সালে একে ‘সংরক্ষিত বন’ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে এর স্থলভূমি মোট ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার এবং নদী, খাল ও খাড়ি নিয়ে জলভূমি মোট ১,৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৭৭ সালে সমুদ্র তীরবর্তী মোট ৩২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তিনটি ‘বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯২ সালে একে রামসার সাইটভুক্ত এবং ১৯৯৭ সালে একে ইউনেস্কোর World Heritage Sites এর তালিকাভুক্ত করা হয়। তাই কোনরকম দুর্ঘটনা যা’ এই এলাকার জীব পরিবেশকে বিপর্যস্ত করতে পারে তা’ যে কোন সচেতন ও সংবেদনশীল ব্যক্তির কাছে উদ্বেগের বিষয়।

সুন্দরবন বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হওয়া সত্বেও এর অতি নিকটে রামপালে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথভাবে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। এই প্রকল্প সুন্দরবনকে ধ্বংস করে, এলাকার জলপরিবেশ, জনগণের কৃষিজমি বিনাশ করে, এলাকার মানুষকে উদ্বাস্তু ও নিঃস্ব করে সম্পূর্ণ ভারতীয় স্বার্থে হচ্ছে। কেবল সরকারী উদ্যোগে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রই নয়, ওরিয়ন কোম্পানীর আরেকটি কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর নড়াইল ও সাতক্ষীরা এলাকায় যেসব শিল্প কল কারখানা আছে ও ক্রমশঃ গড়ে উঠছে, সেগুলির পরিচালন জনিত এবং নদীপথে জাহাজ চলাচল জনিত বর্জ্য সুন্দরবন ও তার আশেপাশের অনন্য জলপরিবেশকে নষ্ট করছে। অথচ বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ১৫ ফেব্রুয়ারী বলেছেন, ‘বাগেরহাটের রামপালে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সুন্দরবনের কিছু ক্ষতি হবে, কিন্তু পিছিয়ে আসা যাবে না।’ তা’হলে বাংলাদেশে সরকার রয়েছে কেন? জনগণের প্রতিনিধিত্বের দাবী করে যাঁরা ক্ষমতায় বসে রয়েছেন, তাঁরা কোন কথা বলছেন না কেন?

সুন্দরবনে গত ১৯ মার্চ জাহাজডুবির পর নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, এরপর থেকে শেলা নদীতে আর কোন কার্গো জাহাজ চলবে না। তাঁর এই কথাটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যাতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয় সে জন্যে এর উত্তর দিয়ে মংলা নদী থেকে ঘাসিয়াখালী পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার কাটা যে গুরুতত্বপূর্ণ নৌ রুটটি আছে এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। ১৯৭৩ সালের নভেম্বর থেকে চালু করা খালটি ব্যবহার করলে সুন্দরবনকে এড়িয়ে যাতায়াতের দৈর্ঘ কমে যায় এবং আর্থিক ও সময়ের দিক থেকে প্রভুত সাশ্রয় হয়। বরিশালের গাবখানের সাথে মিলে মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি ভারত বাংলাদেশের নৌ প্রটোকল অনুযায়ী একটি আন্তর্জাতিক রুটও বটে। এই পথ দিয়েই ভারত নদীপথে আসামে পণ্য আনা নেয়া করে। মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি ৪০ বছর ড্রেজিং ছাড়াই চলেছে। এই রুটটি ২০০১ সাল থেকেই নাব্যতা হারাতে থাকে। ২০০৯/১০ সালে বিআইডাব্লিউটিসির রকেট স্টীমার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পণ্যবাহী জাহাজগুলি জোয়ার ভাটা হিসাব করে চলাচল করলেও ২০১১ সালে রুটটিকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীপথটি চালু করা হয়। এরপর থেকে মংলা ও খুলনা এলাকায় যাতায়াতকারী জাহাজগুলিকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীপথে ১৫০ কিলোমিটার পথ বেশী পাড়ি দিয়ে যেতে হচ্ছে।

হিমালয় থেকে আসা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশে রয়েছে মৌসুমী বায়ু প্রভাবিত ছয়টি ঋতুর বিশেষ প্রকৃতি। কিন্তু উন্নয়নের নামে বাংলার এই প্রকৃতি আজ শেষ, খাল বিল নদী নালা, গরু ছাগল মাছ পাখী শেষ, এমনকি গাছপালা ফল শস্যও শেষ। সারা বিশ্বে এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এলাকাগুলিই সবচেয়ে মূল্যবান, যার মধ্যে সুন্দরবন একটি। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে এই সুন্দরবনের ক্ষতি করবে তা’ আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি। আমরা বলেছি, কেন্দ্রটি মারাত্মক বায়ুদূষণ করবে, মিঠা ও লোনা পানির ভারসাম্য নষ্ট হবে, জাহাজ চলাচলের কারণে বর্জ্য ও শব্দদূষণ হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি; ফলে সুন্দরীসহ সুন্দরবনের গাছপালা ধ্বংস হবে, বাঘ ও অন্যান্য স্থলজ প্রাণীরা বাসস্থান হারাবে, মাছেরা লোপাট হবে, পাখীরা থাকবে না। বাংলাদেশে সুন্দরবন প্রকৃতির শেষ নিদর্শন। সুন্দরবন শেষ হলে বাংলাদেশ শেষ হবে। আমরা তাই সুন্দরবনকে শেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চাই না।

মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি বন্ধ হবার পর সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীর নৌপথটি চালু করায় স্থানীয় জলজ ও বন পরিবেশের বিশাল ক্ষতি হচ্ছে বলে পরিবেশবাদীরা আপত্তি জানিয়ে আসছেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও এই পথটি বন্ধ করার কথা বারবার বলা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। গত ১৯ মার্চ জাহাজ ডুবির পর শেলা নদী দিয়ে কার্গো জাহাজ বন্ধ করার সরকারী সিদ্ধান্ত কতদিন বহাল থাকে সেটাই দেখবার বিষয়। (প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকচেয়ারম্যান, জল পরিবেশ ইন্সটিটিউট)