Home » বিশেষ নিবন্ধ » সুন্দরবন : কেন আত্মবিনাশী সব আয়োজন

সুন্দরবন : কেন আত্মবিনাশী সব আয়োজন

এম. জাকির হোসেন খান ::

একটাই সুন্দরবন, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। আয়তন ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বেশী। এ-বনভূমির দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশে, বাকীটুকু ভারতে। বাংলাদেশ অংশে মানুষের আগ্রাসনে সুন্দরবন ক্রমাগত সংকুচিত হলেও শত শত বছর ধরে বাংলাদেশ সহ এ অঞ্চলের মানুষ, প্রাণী এবং প্রকৃতিকে ঘূর্ণিঝড় সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মায়ের মতো রক্ষা করছে। জীববৈচিত্রের এক বিপুল সম্ভার সুন্দরবন ৪৫৩টি প্রজাতির প্রাণীসহ নানা বিপন্ন প্রাণীর আবাসস্থল এবং একইসাথে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবনকে সুরক্ষা প্রদানকারী রয়েল বেঙ্গল টাইগার’র সংখ্যা একসময় ৪০০-৪৫০টি হলেও চোরাকারবারিদের মাধ্যমে বর্তমানে তা ১০০-এর কাছাকাছি সংখ্যায় দাড়িয়েছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনায় সুন্দরবনের অংশ বিশেষকে ১৯৯২ সালের ২১ মে ‘রামসার এলাকা’ ঘোষণা করা হয়। তাছাড়া ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ এলাকা হিসেবে সুন্দরবনের বেশ কিছুটা অংশ ইউনেস্কো’র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

সুন্দরবন রক্ষায় ভারত ও বাংলাদেশ সরকারও যৌথ উদ্যোগে ২০১২-এর ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও ভারত এক সমঝেতা স্মারক স্বাক্ষর করে। অথচ চুক্তির বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়ে বিতর্কিত, একপেশে, অস্বচ্ছ এবং ত্রুটিপূর্ণ পরিবেশগত সমীক্ষার ভিত্তিতে সুন্দরবনের কাছে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার সব উদ্যোগ সম্পন্ন। সুন্দরবন-সংলগ্ন ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ১৬০ কোটি ডলারের কাজ পায়। অথচ ২০১৫ এর ১৩ মার্চ ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল তথ্য বিকৃতি ও জালিয়াতি এবং প্রতারণার দায়ে কর্ণাটক রাজ্যে এনটিপিসি’র প্রস্তাবিত একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ ছাড়পত্র স্থগিত করে দেয়।

২০১৬’র ফেব্রুয়ারিতেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও সুন্দরবনের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিবেচনা করে ইতিমধ্যে রামসার কর্তৃপক্ষ, ইউনেস্কো এবং আই.ইউ.সি.এন ২০১২ সাল থেকে সরকারের কাছে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। উদ্বেগ আমলে তো নেয়া হয়ই-নি, এমনকি রামসার কনভেনশন সচিবালয় এবং ইউনেস্কো একাধিকবার সরকারের কাছে ইআইএ প্রতিবেদন চাইলেও সরকার তা দিতে অপারগতা জানায়। এ প্রেক্ষিতে গত ২২ মার্চ ২০১৬ ইউনেস্কো কার্যালয় থেকে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ২০১৫ এর ১২ ডিসেম্বর যে প্যারিস চুক্তিতে বিশ্ববাসী ঐকমত্য হয়, ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্যাপক ভিত্তিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বিশ্বের প্রধান চারটি কার্বন নিঃসরনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, জাপান এবং ভারত সহ শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করে। অথচ সুন্দরবনের কাছে ভারত-বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এবং ওরিয়ন গ্রুপ বেসরকারিভাবে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে শুধুমাত্র সুন্দরবনকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না, আখেরে কোটি কোটি মানুষের জীবন এবং জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকির অন্যতম শিকার বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা প্রদানকারী সুন্দরবনের অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত অবদানের মূল্য লাভ-ক্ষতির হিসেবে ধরা হয়নি। ১৭৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৯ সালের আইলা পর্যন্ত সময়ে ৪৭৮টি মাঝারি ও বড় জলোচ্ছাস এবং ঘূর্ণিঝড় তোমেন, গোর্কি, সিডর, নার্গিস বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৭৯৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে ৩২৯টি প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে এবং স্বাধীনতার পর ১৪৯টি ঝড় বা জলোচ্ছাস হয়েছে। সুন্দরবন না থাকলে জাতীয় অর্থনীতির জন্য কত ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতো এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার হিসাব নীতি নির্ধারকরা করেনি অর্থাৎ তাগিদ অনুভব করতেও দেয়া হয়নি।

পরিবেশ আইন ১৯৯৫ এর ধারা ৫-এর অধীনে সরকারি প্রজ্ঞাপনমুলে ১৯৯৯ সালে সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্ট ও এর চতুর্দিকে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন বা ‘লাল চিহ্নিত এলাকা’ এলাকা ঘোষণা করায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৭ এর ৭(৪) ধারা মতে সুন্দরবন এলাকায় কোন শিল্প স্থাপনে পূর্ণ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) সাপেক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘লোকেশন ছাড়পত্র’ এবং ‘পরিবেশ ছাড়পত্র’ নেয়ার বাধ্যতা রয়েছে। কিন্তু পূর্ণ ইআইএ ছাড়াই পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১১ এর ২৩ মে এ প্রকল্পকে শর্তসাপেক্ষে প্রাথমিক ছাড়পত্র দেয়া হয়।  অথচ প্রস্তাবিত প্রকল্পের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১২-এ বলেছিল যে, ওই অধিদফতর সুন্দরবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ জীব বৈচিত্র্যের উপরে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ ক্ষতির ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীও সম্প্রতি স্বীকার করেন। অথচ ২০১৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর ৫৯টি শর্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে ফরমায়েসি পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা- ‘ইআইএ’ অনুমোদন করে প্রকল্প কাজ শুরু করতে চাচ্ছে। কি কারণে বা কার চাপে পরিবেশ অধিদপ্তর তার এ অবস্থান পরিবর্তন করলো তার জবাব এখন পর্যন্ত মেলেনি। এসব শর্ত প্রতিপালিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ এসব অনেক শর্তই পরে আর মানা হবেনা। উল্লেখ্য, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক এক পত্রে উল্লেখ করেন যে, ‘সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে’। উল্লেখিত পত্রে প্রধান বন সংরক্ষক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রামপালে স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুন:বিবেচনার আহবান জানান। অথচ সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসাবে সুন্দরবনের আইনগত অভিভাবক বন বিভাগের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে বিতর্কিত পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বা ইআইএ’র ভিত্তিতে এগিয়ে চলছে সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলা রামপালের সরকারি- বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যে শর্তে প্রাথমিক ছাড়পত্র দিয়েছিলো পরিবেশ অধিদপ্তর সে শর্ত ভঙ্গ করা হলেও, পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই থেকে সালফার-ডাই-অক্সাইড ছড়ানোর কারণে বন্য-গাছপালা ধীরে ধীরে মারা যাবে। ইআইএ অনুযায়ী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭.২০ লক্ষ টন কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পরিবহণের ফলে সুন্দরবন ও এই বনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর কী ক্ষতি হবে সমীক্ষায় বলা হয়নি। বায়ূ দূষনের ক্ষতিকারক উপাদানগুলি মেঘমালার মাধ্যমে ছাড়াবে। রাতে জাহাজ চলাচল এবং মালামালা খালাসের ফলে সৃষ্ট শব্দ ও আলোর দূষণে সুন্দরবনে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে তাও ইআইএ প্রতিবেদনে বিবেচনায় রাখা হয়নি। নাব্যতা হ্রাস পাওয়া পশুর নদীর সংকট বাড়বে। কয়লা পরিবহনের সময় জাহাজ ডুবি হয়ে প্রতিবেশ এবং পানি দূষণ যে নিয়মিত ঘটবে তা সর্বশেষ শ্যালা নদীতে লঞ্চ ডুবিতে আবারো স্পষ্ট হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য একেকটি কার্গোতে ৮-১০ হাজার টন কয়লা পরিবহণ করা হবে-যা ডুবলে দূষণের ঝুঁকি অনেক বেশি।

ইআইএ সম্পাদনের আগেই মাটি ভরাট করাসহ অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু; এমনকি ইআইএ সম্পাদনে কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ, শুনানি ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। আর প্রকল্পের ইআইএ চূড়ান্ত করার সময় নিয়ম রক্ষার জন্য যে গণশুনানি করা হয় যেখানে বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরলেও সেগুলো অগ্রাহ্য করে ইআইএ চূড়ান্ত করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে নির্মোহভাবে ইআইএ সম্পাদনের নিয়ম থাকলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান সিআইজিআইএস কর্তৃক সম্পাদনের ফলে স্বার্থের সংঘাত থাকায় এটি নিরপেক্ষতার মানদন্ড অর্জন করতে পারে নি।

শুধু তাই নয়, প্রকল্প প্রণয়ণ এবং অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের অস্বচ্ছতা স্পষ্ট, এমনকি যৌথ অংশিদারিত্ব বা ঋণ চুক্তি জনগণের জ্ঞাতার্থে প্রচার করা হয়নি। প্রকল্প বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টে করা একাধিক রিট আবেদনের নিষ্পত্তি না করেই ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়; আবার ভূমি অধিগ্রহণের আগেই স্থানীয় জনগণের সম্পত্তি এবং চিংড়ি ঘের ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা দখল করে নেয়। কারন, ইআইএ প্রতিবেদনে সুন্দরবনের সকল এলাকা বিবেচনায় নেয়া হয়নি, যেমন রামপাল প্রকল্প এলাকা থেকে সুন্দরবন (ডাংগামারী) এলাকার দূরত্ব ৯.৬ কিলোমিটার যা বাফার জোনের ভেতর।

উল্লেখ্য, ভারতেরই ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান এ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জীব বৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্য কোন ধরণের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না। এ প্রেক্ষিতে ভারতের মধ্যপ্রদেশে জনবসতি সম্পন্ন এলাকায় কৃষি জমির উপর এনটিপিসি’র কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে ভারতের কেন্দ্রিয় গ্রীণ প্যানেল এনটিপিসি’র ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি। সুতরাং, সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে তা যৌক্তিক হয় কিভাবে?

রামপালে প্রকল্প পরিচালনাসহ অন্যান্য কাজে পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৯,১৫০ ঘনমিটার পানি সংগ্রহ করা হবে, যেটিকে নদীর মোট পানি প্রবাহের ১% এরও কম দেখানো হলেও তথ্যদাতাদের মতে, পানি প্রবাহের যে তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে তা ২০০৫ সালের। তথ্যদাতাদের মতে পরিশোধন করা হলেও পানির তাপমাত্রা, পানি নির্গমনের গতি, দ্রবীভূত নানা উপাদান পশুর নদী, সমগ্র সুন্দরবন তথা বঙ্গোপসাগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ২০১০ সালে সরকার সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন পশুর নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে ৩৪০ হেক্টর, ৫৬০ হেক্টর ও ১৭০ হেক্টর নদী ও খালের জলাভূমি জলজ প্রাণী বিশেষত ‘বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিন’ সংরক্ষণের স্বার্থে ‘‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য” ঘোষণা করেছে।

ইআইএ প্রতিবেদনে প্রকল্প এলাকায় কোন কোন ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে তার কোনো তালিকা দেওয়া হয়নি। প্রকল্পের ফলে এসব উদ্ভিদ ও প্রাণী কোন ক্ষতির সম্মুখীন হবে কি না, তাও উল্লেখ করা হয়নি। ইআইএ প্রতিবেদনে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উঠে আসেনি। ইআইএ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-বছরের এই ৪ মাস বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাতাস সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হবে (ইআইএ, পৃষ্ঠা-২৭৫)। এখন বলা হচ্ছে, বছরে কখনো সুন্দরবনের দিকে বাতাস প্রবাহিত হবে না। তাছাড়া ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি নানা কারণেই এই চারমাস ছাড়াও বছরের অন্য সময়েও বাতাস সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানিদূষণ, শব্দদূষণ, ছাইয়ের দূষণ সারা বছর ধরেই ঘটবে যার সঙ্গে বাতাসের দিকের কোনো সম্পর্ক নেই।

ইআইএ প্রতিবেদনে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের নামে প্রতারণা করা হয়েছে। সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করলে দুষণের পরিমাণ সর্বমোট মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায়- যা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে টেকনোলজিই ব্যবহার করা হোক না কেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র চললে শব্দ দূষণ হবে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র শীতল রাখার জন্য পশুর নদী থেকে পানি গ্রহণ-বর্জন করতে হবে, ফলে সুন্দরনের পশুর নদী দূষণের ঝুকি থাকবেই, সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে দিনে-রাতে কয়লার জাহাজ চলাচলের ফলে শব্দ দূষণ, পানি দূষণ, আলো দূষণ ইত্যাদি ঘটবেই।

উভয় ইআইএ প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে। ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পর্যায়ে মাটি কাটা, মালামাল পরিবহণ, নির্মাণ কাজের শ্রমিক ইত্যাদি ৪ হাজার অস্থায়ী কর্মসংস্থান এবং পরিচালনা পর্যায়ে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে। বরং উল্টো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে মাটি পানি বাতাস দূষিত হয়ে সুন্দরবন ও তার চারপাশের নদী, খাল ও জলাভূমির উপর নির্ভরশীল জেলে, কৃষক, বাওয়ালী, মউয়ালসহ কয়েক লক্ষ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। প্রকল্পের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে মামলায় আসামী করাসহ বিভিন্ন প্রকার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি প্রদান ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে ইতোমধ্যেই এবং ভূমি অধিগ্রহণের ফলে অধিক সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতিও হয়েছে। এর পাশাপাশি সুন্দরবনের গাছ কাটা, বনের জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বন্যপ্রাণী শিকার কিংবা বিষ দিয়ে মাছ মারার মতো ক্ষতিকর কর্মকান্ড সাধারণ জনগণ নয় ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট জলদস্যু ও প্রভাবশালীরা জড়িত।

শুধু তাই নয়, তহবিল পাওয়ার আগেই প্রকল্প কার্যক্রম শুরু হলেও ইউনেস্কো’র উদ্বেগ প্রকাশ করায় ২০১৪’র ডিসেম্বরে নরওয়ের দুটি পেনশন ফান্ড রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্রে বিনিয়োগে সাড়ে ৫ কোটি ডলার প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। শুধু তাই নয়,  সুন্দরবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় ফ্রান্সের বৃহৎ তিন ব্যাংক বিএনপি পারিবাস, সোষিতে জেনারেলি ও ক্রেডিট এগ্রিকোলও অর্থায়নে অসম্মতি জানালেও সরকার ভারতীয় কোম্পানিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে কি কারণে নিযুক্ত করেছে তা বোধগম্য নয়। বিএনপি পারিবাস ২০১৫ এর ডিসেম্বরে মন্তব্য করে, ‘’The analysis shows that serious deficiencies in project design, planning, and implementation and due diligence obligations render the project non-compliant with the minimum social and environmental standards established by the Equator Principles, as well as the International Finance Corporation’s Performance Standards”.

ইআইএ প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকাকে গ্রাম হিসাবে দেখানো হয়েছে প্রকল্পের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরালের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ এশীয় মানবাধিকার (এসএএইচআর) প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ২০১৫ সালে বাংলাদেশে প্রকল্প স্থান পরিদর্শন এবং ইআইএ পর্যালোচনা করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘এ-প্রকল্পের ‘ইআইএ’ নানা দিক দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ। স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে এ-‘ইআইএ’ করা হয়নি।

ভারতের সাথে নৌসহ সব ধরনের ট্রানজিট চুক্তির পর পরই শুধু কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, সুন্দরবনকে ঘিরে বিভিন্ন কলকারখানা স্থাপনে দেশি বিদেশি কোম্পানি যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে’। অথচ সুন্দরবন সুরক্ষায় ভারত সরকার কি করছে তা জানতে সে দেশের জাতীয় পরিবেশ আদালত স্বঃপ্রণোদিত আদেশে বলেছে, “সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ নষ্ট হতে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে ম্যানগ্রোভের বর্তমান চেহারা কেমন, নদী বা খাঁড়িতে দুষিত ডিজেল ব্যবহার হয় কি-না, সেখানে বেআইনী ইট-ভাটা চলছে কি-না, বন এলাকায় অবৈধ হোটেল রেস্তোরা বন্ধ করা হয়েছে কি-না, ইত্যাদি বিষয়ে রাজ্যের অবস্থান জানানো হোক। একই সাথে আদালত সরকারের বক্তব্যের সমর্থনে অবশ্যই স্যাটেলাইট ছবি থাকতে হবে”। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের উচ্চ আদালতও এ ধরনের স্বঃপ্রণোদিত উদ্যোগ নিয়ে প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রদানকারী সুন্দরবনকে রক্ষায়ও উদ্যোগী হবেন।

জনপ্রতি মাত্র ৮ওয়াট বিদ্যুত যা একটি এনার্জি সেভিং বাল্ব জ্বালানোর জন্যও যথেষ্ট নয়,  সেজন্য দেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ সুন্দরবন ধ্বংস অর্থাৎ দেশের স্বার্থ বিসর্জন কখনোই মেনে নেওয়া যায়না, যাবে না।