Home » বিশেষ নিবন্ধ » চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৩৭ : দেং জিয়াও পিং এর আবির্ভাব

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৩৭ : দেং জিয়াও পিং এর আবির্ভাব

আনু মুহাম্মদ ::

দেং জিয়াও পেং ( ২২ আগস্ট ১৯০৪- ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭) দীর্ঘসময় পার্টি বা সরকারের শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত না থাকলেও মাও সেতুং এর মৃত্যুর পর থেকে চীনের যাত্রাপথ নির্ধারণে তিনিই ছিলেন মুখ্য ব্যক্তি। কৃষক পরিবারের সন্তান দেং ১৯২০-এর দশকে ফ্রান্সে কাজ করবার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ পার করেন। এখানেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সাথে তাঁর পরিচয়। ১৯২৩ সালে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। লংমার্চসহ পার্টির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেং নেতৃত্ব পর্যায়ে উঠে আসেন। ১৯৫০ এর দশকে পার্টির মধ্যে মাওসেতুং এর অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন তিনি। ৬০ দশকের শুরুতে লিউশাও চী ও দেংজিয়াও পিং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচি নেন যা উচ্চলম্ফকালীন নীতি থেকে ভিন্ন। এর বেশকিছু জনপ্রিয়তাও পেতে থাকে। তবে তাঁদের অর্থনৈতিক নীতিতে ক্রমেই মাও-এর রাজনৈতিক মতাদর্শিক অবস্থানের সাথে পার্থক্য ধরা পড়তে থাকে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে সেই কারণেই তাঁরা সমালোচনার মুখে পতিত হন এবং বিভিন্ন পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। দেংকে সেইসময় কয়েকবছর এক খামারে কাজ করতে হয়।

চৌ এন লাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে যখন সক্রিয়ভূমিকা থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকেন, তখন বেশ কয়বছর কোণঠাসা অবস্থায় থাকা দেং জিয়াও পিং আবারও সামনে আসেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলাকালীন সময়ে সংশোধনবাদী হিসেবেই অভিহিত হলেও ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে দেং উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি ক্রমে মাও সে তুং এর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হচ্ছেন এরকম ধারণা তৈরি হয় একের পর এক বিভিন্ন দায়িত্ব প্রাপ্তি এবং কার্যত অবস্থানের পদোন্নতিতে। ১৯৭৫ এর জানুয়ারিতে চৌ এন লাই যখন সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিতে বাধ্য হন, তখন অবস্থানগত কারণেই দেং সরকার পরিচালনার কেন্দ্রীয় অবস্থান লাভ করেন। তিনি কার্যত সরকার ও পার্টি পরিচালনা করতে থাকেন, তাছাড়াও খুবই কম সময়ের ব্যবধানে একাধারে সামরিক বাহিনীর চীফ অব স্টাফ, কমিউনিস্ট পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় মিলিটারী কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান পদগুলো লাভ করেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে  দেং-এর এই দ্রুত আরোহণ,  কার্যত পুনর্বাসন, পার্টির অনেকের জন্যই বিশেষত যারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন তাঁদেরকে  বিস্মিত ও হতভম্ব করে। অনেক চীন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চৌ-এর পরামর্শেই মাও সে তুং দেংকে এসব পদে অধিষ্ঠিত করতে সম্মত হন, কেউ কেউ মনে করেন মাও দেংকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসেন লিন পিয়াও-এর অনুসারীদের ক্ষমতা চূর্ণ করবার উদ্দেশ্যে। কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে, ‘চার কুচক্রী’ নামে অভিহিত নেতৃবৃন্দের কার্যক্রম নিয়ে মাও অসন্তুষ্ট  ছিলেন, এবং  তাঁর কাছে মনে হয়েছিলো দেং অর্থনীতির বিকাশধারার জন্য যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। তবে দেংকে আত্মসমালোচনা করবার আহবান জানানো হয়।

১৯৭৬ সালের ৮ জানুয়ারি চৌ এন  লাই  ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। ১৫ জানুয়ারি দেং চৌ এর বিদায়ী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। পার্টির প্রবীণ নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত থাকলেও মাওসেতুং উপস্থিত ছিলেন না। চৌ এন লাই এর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী  পদ শূন্য হয়। এই পদের জন্য বিবদমান দুই পক্ষ তখন প্রার্থী, একদিকে ‘চার কুচক্রী’ বলে কথিত বাম লাইনের ব্যক্তিবর্গ, অন্যদিকে ডান লাইনের অনুসারী বলে কথিত দেংজিয়াও পিং। মাও এদের কাউকে মনোনয়ন না দিয়ে এই পদে নিযুক্ত করেন অপেক্ষাকৃত অপরিচিত হুয়া গুয়ো ফেংকে। পার্টির মধ্যে দেংজিয়াও পিং বিরোধী প্রচার সেসময় আবারও জোরদার হয়। ধারণা করা হয়, এর পেছনেও মাও এর সমর্থন ছিলো। ১৯৭৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পার্টির ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দেংকে অপসারণ করে পররাষ্ট্র দফতরে নিয়োগ দেয়া হয়। ৩ মার্চ মাও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে বক্তব্য রাখেন এবং দেং-এর ভূমিকার সমালোচনা করেন।

প্রকৃতপক্ষে মাও এর মৃত্যুর পরই শুরু হয় দেং আমল। যার ধারাবাহিকতাতেই বর্তমান চীন।