Home » রাজনীতি » তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন – (পর্ব-৭)

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন – (পর্ব-৭)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী::

গণ্ডি পার হবার প্রস্তুতিটা চলছিল। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, রাজনীতির অনুশীলন, সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলা সব দিক দিয়েই নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এই যুবক। দেখা যাচ্ছে ভলিবল, বাডমিন্টন, টেনিস সব কিছুই খেলছেন তিনি। অংশ নিচ্ছেন বিতর্ক প্রতিযোগিতায়, বক্তৃতা দিচ্ছেন জনসভাতে; সভাপতিত্ব করছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, যাতায়াত করছেন পাঠাগারে; আর ম্যানিফেস্টো, বিবৃতি, প্রস্তাব, কার্যবিবরণী – এসব লেখা, টাইপ করা, ছাপিয়ে আনা, বিতরণ করার ব্যাপারে তিনি থাকছেন সবার আগে। তাঁর অতিশয় আপনজন ডা. করিমের সঙ্গে এক পর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটেছে, করিম চলে গেছেন কমিউনিস্টদের সঙ্গে, তাজউদ্দীন যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে, তবে ১৯৬২-তে আইউব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় দুজনেই কারাবন্দী হয়েছেন এবং সৌভাগ্যক্রমে দুজনের থাকার ব্যবস্থাও হয়েছে একই সেলে। করিম জেলে ছিলেন পাঁচ মাস, আরও অনেকেই তখন জেলে; তাঁদের সাহচর্যে করিমের বন্দী জীবন নিরানন্দে নয়, বেশ আনন্দেই কেটেছে। তাস খেলা ছিল নিত্যদিনের বিনোদন। করিম দেখতেন তাজউদ্দীন একা একা দাবা খেলছেন, কারণ সঙ্গীদের মাঝে কেউই দাবা খেলতে জানত না। করিমের ভাষায়, ‘‘সে নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে একা একা কেমন করে দাবা খেলত এটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না। প্রতিযোগিতা ছাড়া খেলা জমে? নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা এ কেমন? তাজউদ্দীনের মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার একটা প্রচেষ্টা হয়তো ছিল।’’

হয় তো নয়, অবশ্যই ছিল। রাজনীতির এই কর্মী সব সময়েই চেষ্টা করতেন কীভাবে নিজেই নিজেকে অতিক্রম করে যাবেন। কারাবন্দী অবস্থায় এই দুই বন্ধুর ভেতর রাজনীতির নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উভয়েরই আগ্রহ কৃষকের মুক্তির প্রশ্নে। করিম বলেছিলেন, ঋণসালিসী বোর্ডের মাধ্যমে ফজলুল হক কৃষককে ঋণের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। শুনে তাজউদ্দীন মন্তব্য করেছেন,

মুক্তি না ছাই করে গেছেন। কৃষকের মুখে দুধের বদলে চুষনি ঢুকিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছেন। যেখানে কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠত তাদের অধিকার আদায়ে, আপাতত সান্তনা দিয়ে কৃষকের বারটা বাজিয়েছেন।

এমন উক্তিতে করিম চমকে উঠেছেন, বুঝতে পেরেছেন যে তাজউদ্দীন অন্যদের তুলনায় গভীরভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত। তাঁর লক্ষ্য সংস্কার নয়, মৌলিক পরিবর্তন। ডা. করিমের সময় সময় মনে হতো যে তাজউদ্দীন তাঁদের সমবয়স্ক নন, অগ্রজ।

মওলানা ভাসানীর প্রতি আকর্ষণ সত্তেও তাজউদ্দীন প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেননি। স্মরণীয় যে তাজউদ্দীন ছাত্র রাজনীতিতে নয়, উৎসাহী ছিলেন জাতীয় রাজনীতিতে, যদিও ফজলুল হক মুসলিম হলে যে-নির্বাচন হতো তাতে প্রার্থী না হলেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন, এবং একবার আক্ষরিক অর্থেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে একটানা সাতদিন গোসল না-করে নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলেন, রাজনীতিসচেতনতার তাড়নাতে। ভাসানীর দলে যোগ না-দেয়ার একটি কারণ হতে পারে আওয়ামী লীগের ‘মুসলিম’ পরিচয়। তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্ধুরা সবাই তখন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা ভাবছেন। দ্বিতীয় কারণ, সে-সময়ে আওয়ামী মুসলিম লীগে নেতৃস্থানীয় যাঁরা ছিলেন তাঁদের কারো কারো আচরণে ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ প্রকাশ পাচ্ছিল বলে তাঁর অনুভব।

পিওপলস ফ্রিডম লীগ এগোয় নি, এরপরে ডেমোক্রেটিক ইউথ লীগ গঠনের একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু কমরুদ্দিন আহমদ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান নি, কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল যে উদ্যোক্তারা প্রো-কমিউনিস্ট। পরবর্তীতে, ১৯৫১ সালে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। সংগঠনটি গঠনের সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে একটি যুব সম্মেলনের ভেতর থেকে। সরকারী বাধার কারণে এই সম্মেলন ঢাকায় হতে পারেনি; উদ্যোক্তারা তখন নদীর অপর পাড়ে জিঞ্জিরায় চলে যান, কিন্তু সেখানেও পুলিশী হস্তক্ষেপ ঘটে। তখন তাঁরা বুড়িগঙ্গায় চারটি নৌকায় বসে সম্মেলন করেন। কাকতালীয় অবশ্যই, তবু মিলটা বোধ করি তাৎপর্যহীন নয় যে চীনে কমিউনিস্টদের কার্যক্রমের শুরুর দিকে সাংহাই নগরীতে গোপন বৈঠক করবার সময় পুলিশ তাঁদের আস্তানাটি ঘিরে ফেলতে যাচ্ছে টের পেয়ে মাও সে তুঙ-ও তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে বের হয়ে গিয়ে নৌকাতে বৈঠকের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁরা অবশ্য এর পরে আর শহরে ফেরেননি, যুবলীগের সদস্যদের পক্ষে না-ফিরে উপায় ছিল না।

যুবলীগে অলি আহাদ, তোয়াহা, তাজউদ্দীন-সবাই ছিলেন। বায়ান্নর আন্দোলনে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এটি রাজনৈতিক দল হিসাবে গড়ে ওঠে নি। না-ওঠার একাধিক কারণ ছিল। সংগঠন ও কর্মীদের সবাই ছিলেন তরুণ, সফল নেতৃত্ব দিতে পারেন এমন কেউ ছিলেন না, তদুপরি তাঁদের ভেতর মতাদর্শিক ঐক্যের বন্ধনটা যে দৃঢ় ছিল তাও নয়। অপরদিকে রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী মুসলিম লীগ দৃশ্যমাণ ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অলি আহাদ, তিনি লিখেছেন,

১৯৫১ সালে কারামুক্তির পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল হামিদ খান ভাসানী সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক দেশবাসীকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করিবার নিমিত্ত সমগ্র দেশব্যাপী অবিরাম কর্মীসভা, জনসভা ইত্যাদি করিয়া যাইতেছিলেনমুসলিম লীগ মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন কোথাও ১৪৪ ধারা জারি করিয়া আবার কোথাও  গুন্ডামীর আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আওয়ামী মুসলিম লীগের কর্মসূচি পালনে সর্বপ্রকার ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে থাকেকিন্তু জনতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অবিচল আস্থা স্থাপন করিয়া ক্রমশঃ আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে কাতারবন্দী হইতে শুরু করে

অবশেষে ১৯৫৩ সালে তাজউদ্দীন আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দিলেন। একই সময়ে অলি আহাদও যোগ দিয়েছেন। তাজউদ্দীন ওই বছরই ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। পরের বছর তিনি যুক্ত ফ্রন্টের মনোনয়ন পেয়ে ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন। কয়েক মাস পরে ৯২-ক ধারা জারি হলে গ্রেফতার হন; বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ১৯৫৮-তে সামরিক শাসন জারি হলে আবার তাঁকে জেলে যেতে হয়; এবং পরের বছর মুক্তি পান। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরে ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনে তাজউদ্দীনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য; তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরের বছর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারাভিযানে অংশ নেন। ১৯৬৬-তে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের যে-সম্মেলনে শেখ মুজিব ৬ দফার ঘোষণা দেন তাতে তাজউদ্দীন উপস্থিত ছিলেন। ৬-দফার রচনায় অনেকেই যুক্ত ছিলেন; তবে এর চূড়ান্ত রূপটি তাজউদ্দীনই দেন। ওই বছরই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। এরপরে তিনি গ্রেফতার হন, মুক্তি পান ১৯৬৯-এ, এবং রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিলে অংশ নেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর অসহযোগ আন্দোলন এবং একাত্তরের গণহত্যা। তাজউদ্দীন আহমদের তখনকার ভূমিকা আমাদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল।

প্রশ্ন থাকে কেন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। (চলবে)