Home » Uncategorized » যখন শাসকের আর কোন প্রতিপক্ষের প্রয়োজন নেই

যখন শাসকের আর কোন প্রতিপক্ষের প্রয়োজন নেই

“Those who cast the votes decide nothing. Those who count the votes decide everything.”—- Joseph Stalin

আমীর খসরু ::

প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন পদ্ধতিটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম জনগণের জন্য এই কারণে যে, তারা প্রতিনিধি নির্বাচন করার জন্য অন্তত একটি সুযোগ পেয়ে থাকেন একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে। আর এই নির্বাচন হচ্ছে যাদের গণতন্ত্র নেই তাদের জন্য গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং যাদের গণতন্ত্র আছে তাদের ক্ষেত্রে ওই ব্যবস্থাটি আরও শক্ত-পোক্ত করার জন্য। গণতন্ত্র নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করেন তারা এখন বলছেন, গণতন্ত্রের পুরনো সংজ্ঞায় বিষয়টিকে দেখলে আর চলবে না। বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র হচ্ছে ক্ষমতার অধিকতর বিকেন্দ্রায়ন। অর্থাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন বা কর্তৃত্ববাদী শাসনে যাতে রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি চলে না যায় তা নিশ্চিত করা। নির্বাচন হচ্ছে এই কারণে গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ মাত্র। তবে প্রতিনিধিত্বশীল শাসনে নির্বাচনই সব কিছু এবং শেষ কথা- এমনটা যারা বিশ্বাস করেন তারা ভুল সিদ্ধান্তে পৌছেছেন। গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন প্রাপ্যগুলোকে বুঝিয়ে দিয়ে অন্যান্য যে সব অধিকারগুলো আছে যেমন বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ নানামুখী অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনুদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক শ্রেণী সব সময়ই নির্বাচনই হচ্ছে সব কিছু এমন একটা ধারণাকে স্বতঃসিদ্ধ করার প্রবল চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এটা ঠিক, নির্বাচনী গণতন্ত্র অনিবার্যভাবে কতিপয়ের বা গোষ্ঠীর শাসনে রূপান্তরিত হতে বাধ্য।

কিন্তু এর উল্টোটা হচ্ছে, স্বৈরতান্ত্রিক এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায়। এই ব্যবস্থায় নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং জনগণকে ভোলানোর জন্য উন্নয়নের শ্লোগান উঠে প্রবলভাবে। এই ধরনের শাসকেরা এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে এবং তাদের মনোজগতে এই বিষয়টি প্রবল যে, উন্নয়নের কথা বললে জনগণ আর গণতন্ত্রের কথা এবং গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ নির্বাচনের কথা বলবে না। কারণ নির্বাচন ব্যবস্থাটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হলে ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব। আর এখানেই একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের আপত্তি। আপত্তি এই কারণে- তারা পালাবদল চায় না, বরং তারা তাদের ক্ষমতার জন্য জনগণের গণতান্ত্রিক আকাংখার বদল চায়। এরও কারণ হচ্ছে, নানা দোষ-ত্রুটি  সত্ত্বেও নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সচল-সজীব ও প্রাণবন্ত থাকলে জনগণের অধিকার কিঞ্চিৎ হলেও যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাশ্রয়ী পক্ষকে সামান্য হলেও জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়। এখানেই স্বৈরশাসকদের আপত্তি। তবে এ কথা বার বার বলা হচ্ছে যে, গণতন্ত্রই যে সর্বোচ্চ পন্থা তা নয়, তবে এর চাইতে ভালো পদ্ধতি আবিষ্কার এখনও পর্যন্ত হয়নি।

এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন, গণতন্ত্রের সাথে জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন যাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বলা যায়- সে বিষয়টিও জড়িত। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কোনো রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোতে এর নাগরিকগণও কম ক্ষমতা ভোগ করেন। অর্থাৎ তাদের অধিকারগুলো থেকে সহজে বঞ্চিত করা যায়। আবার অর্থনৈতিক দিক থেকে সক্ষম বা উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকরা উচ্চ মাত্রায় অধিকার ভোগ করে। আমাদের মতো দেশে কতিপয়ের শাসন ও স্বৈরশাসনের উদ্ভব ঘটে অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের কারণে, দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকার জন্য।

এতো সবের পরেও আমাদের মতো দেশে নির্বাচনই হচ্ছে জনগণের একমাত্র ভরসা- যা থেকে এই জনগণ বার বার বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীন হওয়ার আগে জনগণের সম্মিলিত লড়াই, সংগ্রাম ছিল শক্ত-পোক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম সিঁড়ি বা ধাপটি অর্থাৎ নির্বাচনী ব্যবস্থাটি প্রথম দিন থেকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ, শাসকদের মনোজগতে তখনো অতীত বাসা বেধে আছে অর্থাৎ মনেপ্রাণে তারা গণতান্ত্রিক ছিলেন না। গণতন্ত্রের প্রতি যে অসীম ভালোবাস এবং শ্রদ্ধা থাকতে হয় সে শিক্ষাটিই হয়তো তারা পাননি।

এদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার ইতিহাসের দিকে যদি ফিরে তাকাই তাহলে দেখা যাবে, স্বাধীনতার স্বল্পকাল পরেই ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা অনিয়ম হয়েছে- যা ছিল অবিশ্বাস্য। এরপরে দীর্ঘ সামরিক শাসনে আমরা দেখেছি জিয়াউর রহমানের ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। এরশাদ জমানার ১৯৮৬, ১৯৮৮-এর নির্বাচন কেমন হয়েছিল তাও সবার জানা। ১৯৯০-এর পরবর্তী সময়কালের নির্বাচনগুলোতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যেও শুনতে হয়েছে সূক্ষ-স্থূল কারচুপি, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা কথা। ১৯৯০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সময়কালের নির্বাচনগুলো যে কোনো অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। ১৯৯৬ সালে অতি স্বল্পস্থায়ী একটি সংসদের জন্য যে নির্বাচনটি বিএনপি সরকার করেছিল তা ছিল এর ব্যাতিক্রম।

কিন্তু বাংলাদেশের অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে রীতিটি গড়ে উঠছিল তার বিদায় সূচিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে। বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ তো বটেই অন্যান্য কোনো দেশে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। একদলীয়, ভোটারবিহীন এমন নির্বাচন ইতিহাসে নজিরবিহীন। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থার অন্তর্ধান ও বিলুপ্তি ঘটানো হলো ওই দিনটিতে। এরপরে উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌর নির্বাচন এবং সবশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সবই একই বৈশিষ্ট্যের, অভিন্ন চরিত্রের। কোনো হেরফের এখন তাদের তৈরি নির্বাচনী পদ্ধতির ক্ষেত্রে আর হচ্ছে না। এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচনের অর্থই হচ্ছে- বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হওয়া, হুমকি, দখল, হামলা, আগুন, ভাংচুর, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হত্যা, খুন এবং নির্বাচনের সময়ে ও আগে-পরে নানাবিধ মামলা। বর্তমান সরকার পুরো বৃত্তই সম্পন্ন করে ফেলেছে।

আগেই বলা হয়েছে গণতন্ত্রের আধুনিক সংজ্ঞা হচ্ছে- ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটি এই কারণেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রবিহীন শাসনামলের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনায় দেখা যাবে, এই সময়কালে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনগুলোও মারাত্মক পর্যায়ে ত্রুটিপূর্ণ এবং নানা দোষে দুষ্ট। ১৯৮৮ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ শাসনামলে যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং এক কথায় ভোট বলতে আর তখন কিছুই হয়নি।

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নানা কারণে নজিরেরও বেশি সৃষ্টি করেছে। এই নির্বাচনের প্রথম দুই দফায় ভোটের নামে কি হয়েছে তা সবারই জানা। প্রথম দুই দফার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের কমপক্ষে ৮৩ জন বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১৩শ’র মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যে প্রায় দুইশটিতে প্রধান বিরোধী দলের কোনো প্রার্থী থাকতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। আর খুন-জখম এখনো অব্যাহত আছে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে দুঃখজনক দিকটি হচ্ছে- এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের নৌকা প্রতীক পেলে তিনিই বিজয়ী। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসমূহ ক্ষমতাসীনদের এমন মনোভাব ও ইচ্ছার ইঙ্গিত পেয়ে গেছে। আর কাজও হচ্ছে সে মতো। তাহলে কি এটা ধরে নেয়া যায়, এই কারণেই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে?

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে যে বিশাল এবং সীমাহীন ক্ষতিটি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তাহলো- তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ‘ক্ষমতার উগ্রতা, দম্ভ ও শক্তিমত্তা প্রদর্শন’ ছড়িয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের অবনতিশীল অভ্যন্তরীণ শৃংখলা আরও ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির যে আরও অবনতি হবে, তারও আলামত দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হবে, যার ফলশ্রুতিতে হানাহানি আরও বাড়বে। অর্থাৎ একদলীয় শাসনের বিষয়টি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও পড়বে।

নির্বাচন ব্যবস্থার বিদায়ের মধ্যদিয়ে তিনটি বিষয় স্পষ্ট যে, এক, রাজনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়ে তা আরও ব্যাপকতর বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। যে শূন্যতা ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে পুরো ব্যবস্থার ভারসাম্যে, তাতে শূন্যতা আরও বাড়বে। দুই, এই বিপর্যয়কর শূন্যতার মধ্যদিয়ে বিদ্যমান পুরো ব্যবস্থাটি টাল-মাটাল হয়ে পড়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। আর এ থেকে বের হওয়া কতোটা সম্ভব তা বলা মুশকিল। তিন, এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীনরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচাইতে বেশি। তাদের জনবিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে, ব্যাপক মাত্রায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিয়ে কেন এই ভয়ংকর খেলা? এর জবাব হচ্ছে, এ সবই করা হচ্ছে জনমনে অধিকতর ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। কারণ ক্ষমতাসীনরা চায়, জনগণের মধ্যে যাতে কোনো দিনই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের আকাংখাটি আর বিদ্যমান না থাকে। আর তেমন এক ভীতিকর, ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই সব আয়োজন। আগেই বলেছি, যেকোনো শাসকের জন্য জনবিচ্ছিন্নতাই হচ্ছে তার প্রধানতম শত্রু । কারণ যেকোনো শাসক সীমাহীন শূন্যতার মধ্যে পড়ে গেলে, তার আর প্রতিপক্ষের প্রয়োজন হয় না।