Home » অর্থনীতি » বাংলাদেশ কি আদৌ রিজার্ভের অর্থ ফেরত পাবে?

বাংলাদেশ কি আদৌ রিজার্ভের অর্থ ফেরত পাবে?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ::

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের একটি অংশ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে বলে বদ্ধমুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল। ফিলিপাইনের যে ক্যাসিনো থেকে ওই টাকা হস্তান্তর হয়েছিল, তার পরিচালক কিম অং কিছু অংশ এর মধ্যেই ফিলিপিনো সিনেট অনুসন্ধান কমিটির কাছে ফেরত দিয়েছেন। আরো একটি অংশ হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সে আশা কতটা বাসস্তবায়িত হয় সে নিয়েই এখন সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ এর মধ্যেই আইনের ফাঁদ পাতা হয়ে গেছে। আর সেই ফাঁদ থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ ওই টাকা ফেরত পাবে কি না তা নিয়ে গভীর সন্দেহেরও সৃষ্টি হয়েছে।

ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অং প্রথম দফায় দিয়েছিলেন ৮৬ হাজার ডলার। এরপর দ্বিতীয় দফায় দিয়েছেন ৮৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এছাড়া মঙ্গলবার সিনেটের শুনানিকালে ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আরো ৯৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার ফেরত দিবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এতে করে বাংলাদেশের আশাবাদী হওয়ার ভালো সম্ভাবনাই ছিল। কিন্তু মঙ্গলবারই বড় ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এ দিন সিনেট কমিটির চতুর্থ দফা শুনানি হয়। বাংলাদেশকে প্রাপ্ত অর্থ ফেরত দেয়া নিয়ে সিনেট কমিটিতে বিতর্কও শুরু হয়েছে পক্ষে-বিপক্ষে।

ফিলিপাইনের সংবাদপত্র ইনক্যুইয়ারে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অং সাক্ষ্য দিতে আসেন। তখনই বলা হয়, বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিরাপদ হেফাজতে রাখার জন্য সিনেট কমিটিকে ওই টাকা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি কমিটিকে জানান, এএমএলসি’র নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া ব্যাকে-আবাদ।

এই প্রশ্ন ওঠায় কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর তেওফিস্তো গুইনগোনা ওং এবং তার আইনজীবী ইনোসেনসিও ফেরারের কাছে জানতে চান, তাদের হস্তান্তরিত অর্থ বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তরে কোনো আপত্তি আছে কি না। এই প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান অং। তিনি মিনমিন করে কিছু বলে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি তার আইনজীবীর কাছে ছেড়ে দেন। আর আইনজীবী জানান, বাংলাদেশ সরকারের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য নয়, ওই টাকা এএমএলসি’কে দেওয়া হয়েছে নিরাপদে রাখার জন্য।

আইনজীবী আইনের মারপ্যাঁচই কষেছেন। তিনি ফিলিপিনো আইনের দোহাই দিয়ে বলেন, কেউ দাবি করলেই তা পরিশোধ করা যায় না, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেই হবে। তিনি জানান, বিশেষ তদন্ত কমিটির সম্মান রক্ষা করে তাদের অনুরোধেই ওই টাকা হেফাজতে রাখার জন্য তাদের কাছে তারা সমর্পণ করেছেন।

কিন্তু সিনেট কি এ ধরনের কোনো অনুরোধ করেছিল? এক সিনেটরই কিন্তু এই প্রশ্নটি করেছেন। টেমপোরে রালফ রেকটো জানান, কমিটি নিরাপদ হেফাজত করার জন্য অর্থ তাদের কাছে রাখার কোনো অনুরোধ তারা করেছিলেন কিনা তা তিনি মনে করতে পারছেন না। পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটা রাজনৈতিক বিষয়েও পরিণত হয়ে গেছে।

সিনেটের সংখ্যালঘু গ্রুপের নেতা জুয়ান পঞ্চ এনরিল দৃশ্যত ওই টাকা বাংলাদেশে হস্তান্তর বিলম্বিত করার অবস্থানই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সম্মানিত চেয়ারম্যান, আমি মনে করি, আমরা বাংলাদেশকে এ কারণে সহায়তা করতে চেয়েছি, যাতে আমরাও যদি কখনো একই ধরনের সমস্যায় পড়ি, তবে যাতে সহায়তা পেতে পারি। এখন কথা ওঠছে, আমাদেরকে আমাদের আইন দেখতে হবে, যেভাবে তারা তাদের আইন বিবেচনা করবে। আর আমি মনে করি না যে, সিনেট কমিটি বা এমনকি খোদ সিনেট কোনো ব্যক্তিকে কারো কাছে কিছু সমর্পণ করতে বাধ্য করতে পারে না, যতক্ষণ না এই প্রজাতন্ত্রের আদালত সেটা তাকে করতে বলে।’ এই বক্তব্যের পর গুইনগোনাও তার আগের অবস্থান থেকে দৃশ্যত সরে আসেন। তিনি নরম সুরে বলেন, কমিটি অংকে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করতে চায় না, কেবল তাকে সম্মত করানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে এনরিল সন্তুষ্ট হননি। তিনি বলেছেন, কমিটি যদি কাউকে সম্মত করানোর চেষ্টা করে, তবে সেটা আসলে হয়ে যায় জরবদস্তি।

কাজেই অং যদি নিজ থেকে বাংলাদেশকে অর্থ ফেরত দিতে রাজি না হন, তবে ফিলিপাইনের সিনেট কমিটি তাকে বাধ্য করতে পারবে না, ওই পথে যাবেই না। বরং তাদেরকে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। আর আইনি-প্রক্রিয়া সব দেশেই কমবেশি জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয়। তাছাড়া অং কিন্তু ইতোমধ্যেই সে দেশের বিরোধী দলের কিছু সমর্থন পেয়ে গেছেন। কাজেই অং এখন সহজে অর্থটা দিয়ে দেবেন, এমনটা মনে হচ্ছে না।

সবাই জানে, ওই টাকার মালিক বাংলাদেশ। কিন্তু এনরিল জানিয়েছেন, ওই টাকা এখন ফিলিপাইনের এখতিয়ারভুক্ত। তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে অবশ্যই বাংলাদেশের আইন মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশকে এই টাকা ফেরত দেওয়ার আগে সরকারকে অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। আমরা বিচারক হতে পারি না, আমরা কেবলই আইন প্রণয়ন করতে পারি।’

ফলে বেশ জটিলতার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর অবশ্য বলেছেন, বেশির ভাগ অর্থই ফেরত পাওয়া যাবে।