Home » প্রচ্ছদ কথা » নির্বাচনী ব্যবস্থার সংকট কী দীর্ঘস্থায়ী

নির্বাচনী ব্যবস্থার সংকট কী দীর্ঘস্থায়ী

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কী গভীর সংকট ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? সাধারণ অর্থে জনকর্তৃত্বের অনুপস্থিতি অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে সবক্ষেত্রে। কিন্ত বাংলাদেশে তো শাসকদের কর্তৃত্বের অনুপস্থিতি নেই, শাসন ব্যবস্থা বড় বেশী সরল-রৈখিক, একক ও কর্তৃত্ববাদী। সুতরাং এই ধরণের ব্যবস্থা অস্থিরতার কারণ হতে পারে কীনা, সেই প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এরকম শাসনের প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষ আইনকে শাসন করা হয়, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উস্কে দেয় । এই পরিস্থিতির সংকট সবক্ষেত্রে যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে তা  প্রবল হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতাসীনদের অনেকেই আইনের আওতার বাইরে সুবিধে ভোগ করে থাকে।

দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ সরকার হবে নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার কর্তৃত্ববাদী হবে, এটি আমাদের বুধবার-এ প্রকাশ করা হয়েছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর পরই এবং এটি এখন বাস্তবতা। নৈতিকভাবে দুর্বল এই সরকার স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠছে প্রতিশোধপরায়ন ও ক্ষিপ্র। একটি একক নির্বাচনে এবং প্রায় কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া নির্বাচিত ক্ষমতাসীনদের এই পর্যায়ে জনগনের কাছে দায়বদ্ধতা বলে কিছু আছে কীনা, থাকলে কী আছে, প্রতিষ্ঠানগুলিসহ মিডিয়ার চেহারায় সেটি দৃশ্যমান। দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার বাসনা তৈরী হচ্ছে। সেই কারনেই অসহিষ্ণুতা ক্রমশ: সুস্থ সমালোচনাকে রুদ্ধ করতে চাইছে।

রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকলে নাগরিকদের মিত্র থাকতে পারে না। দুর্বল নাগরিকদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। রাষ্ট্রের গুনাগুনের পরীক্ষা অন্য কোথাও তেমন দিতে হয় না, যেমনটা হয় ব্যক্তি নাগরিকের জীবনে। কাদের সুবিধা হচ্ছে, কাদের জন্য ঘনিয়ে আসছে বিপদ, তা দেখেই বোঝা যায়- রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র অবশিষ্ট থাকল কিনা! রাষ্ট্রের উত্থান ও পতনের সাথে সাথে ব্যক্তির ভাগ্যের পরিবর্তন, কিছু মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি অন্যদের দুর্ভোগ-এর রহস্য নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের চরিত্র এবং রাজনীতিকদের কার্যকলাপের ভেতরেই। ব্যক্তি এখানে শক্তিহীন, এমনকি যাদের ভাগ্যের দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের ফলে- তারাও কি শক্তিশালী?

গত কয়েকমাসে বাংলাদেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা এক গভীর সংকট ও অস্থিরতার ইঙ্গিঁত বহন করে। দেশে হত্যা গুম, অপহরন, ধর্ষন লুন্ঠনের বেশুমার ঘটনা ফিবছর ঘটে চলেছে। কিন্তু এর মাঝে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা এবং এ নিয়ে শাসক মহলের নিস্পৃহ আচরন চমকে দেয়ার মত। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য, আদালতের প্রতিক্রিয়া, মন্ত্রীদ্বয়ের শর্তহীন ক্ষমা প্রার্থনা এবং অন্তিমে সংবিধান লংঘন করার অভিযোগে তাদের শাস্তির পরে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা না নেয়া বিস্ময়কর হলেও কর্তৃত্ববাদী শাসনে এটিই স্বাভাবিক।

এ অবস্থায় শাসন ক্ষেত্রে সংকট ও অস্থিরতা দেখা দিলে শাসকদের প্রতিক্রিয়া থাকেনা । কেন্দ্রীভূত ক্ষমতায় রাষ্ট্রের অঙ্গগুলি স্বাধীনভাবে কাজ না করায় অখন্ড স্বত্তা হিসেবে আইন-কানুনের অনুশীলন করেনা। বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় এমত অস্থিরতা দেখা দিয়েছে কিনা, এটি সমাজ বিজ্ঞানীদের গভীর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষনের বিষয়। তবে শাদা চোখে মনে হবে যে, কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বে বসবাসরত দেশের জনগনের জন্য এই পরিস্থিতি দিনকে দিন নৈরাজ্যিক হয়ে উঠছে এবং পরিনামে দেশ গভীর সংকটের মধ্যে ও অস্থির হয়ে পড়ছে।

এই অনিবার্যতায় বাংলাদেশে এখন নির্বাচন ব্যবস্থার সংকট ও অস্থিরতা নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনের মত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও একপেশে হতে চলেছে। দলীয় মার্কার এই নির্বাচনে ইতিমধ্যেই ক্ষমতাসীন দলের ৭৭ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। অর্থ দাঁড়ায়, যে কোন প্রকারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের  প্রার্থীতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিরা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়েছে। গাদা গাদা অভিযোগ থাকলেও নির্বাচন কমিশন ছিল নির্লিপ্ত, নিস্ক্রিয়।

রাজনৈতিক দলের কথিত মনোনয়নের বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য। দল যে প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন দেয় তা মেনে নেয়নি নিজ দলের প্রার্থীরা । ক্ষমতাসীন দলে বিদ্রোহের সংখ্যা বেশি, এখন এটি স্পষ্ট যে, দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছিলনা। ধমক, চাপ, বহিস্কার, মামলা ও গ্রেফতার- এসব পথে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করা তৃনমূলে গনতন্ত্র চর্চার বিষয়টি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

তৃনমূলের রাজনৈতিক দলগুলির এই প্রাতিষ্টানিক ব্যর্থতার ফাঁক গলে সহিংসতা, রক্তপাত, দূর্নীতি-অনাচার আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রার্থী মনোনয়নে তৃনমূলের মতামতের চাইতে আর্থিক লেনদেন ও নেতৃত্বের কোটারি স্বার্থের প্রভাব হয়ে উঠেছিল বড়, ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীর অবাধ্যতা না ঠেকাতে পেরে দলীয় নেতারা বহিস্কারের হুমকিসহ নেপথ্যে প্রভাব খাটিয়ে মামলা ও গ্রেফতার করে ক্ষোভ ঠেকাতে চেয়েছেন। নির্বাচনী মাঠ সমতল ছিলনা, প্রচার- প্রচারনা ছিলনা নির্বিঘ্ন। এরকম নির্বাচন শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলের বিজয় নিশ্চিত করতে পারে, পারেনা উৎসবের আমেজে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ।

সকল রাজনৈতিক দলের আমলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা সব নির্বাচনে রকম-ফেরে প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়ে থাকে। কিন্তু জনরায় প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের বিপক্ষে যেতে দেখা গেছে এভারেই প্রথম প্রশাসনের সহযোগিতায় এতটাই মাত্রা ছাড়িয়েছে যে, শুধুমাত্র পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় অনেক প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে। নিস্ক্রিয়, নির্লিপ্ত ও অনুজ্জল নির্বাচন কমিশন শেষতক সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারসহ ৫ জন ওসিকে ডেকে ‘তিরস্কার’ করেছে, বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেখানকার নির্বাচন কমিশন ডিসি, এসপিসহ  ৩৮ জন কর্মকর্তাকে বদলী করেছে নিরপেক্ষ ভূমিকা না থাকার কারণে।

এ পযর্ন্ত দু’দফা ইউপি নির্বাচনে শিশুসহ কুড়িজন মানুষের প্রাণ করেছে। আহত হয়েছে অগনিত মানুষ । ২২ মার্চ মঠবাড়িয়া কলেজ কেন্দ্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া গুলিতে মারা গেছে ৫ জন। এটি প্রমান করে যে, আমাদের  আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কতটা  ‘ট্রিগারহ্যাপি’ হয়ে উঠেছে এবং মানুষের প্রান কতটা সস্তা হয়ে গেছে! এই ঘটনার পর ঐ বাহিনীর ডিজি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নয় ) সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ম্যাজিষ্ট্রেটের নির্দেশে তারা গুলি করেছে। এখানেই শেষ নয়, এই পাইকারী হত্যাকান্ডের ঘটনায় পরবর্তীতে ১৩০০ জন অজ্ঞাতনামার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

গত কয়েক বছরে প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব অব্যাহত রেখেছে। প্রশাসনের এই বিষয়গুলি নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রন তো দূরে থাকে, আমলে নিয়ে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়নি। ফলে নির্বাচনকালে ও নির্বাচন পরবর্তীতে সংঘটিত সহিংসতায় কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জালভোট ও ব্যাপক প্রানহানির ঘটনা ঘটেছে। নিকট অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসন ন্যুনতম মানসম্পন্ন যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাগুলি অর্জন করেছিল, ২০১৪ থেকে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনে তা আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

দুই দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে আরো অস্থির করে তুলেছে। ভোটবঞ্চিত জনগন ভয়ে ও ক্ষোভে আগ্রহ হারাচ্ছে তৃনমূল পর্যন্ত। এর মধ্য দিয়ে সহিংসতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র দাখিল তেকে ভোটের দিন পর্যন্ত এবং ভোট পরবর্তী প্রতিটি স্তরে সংঘটিত ক্ষমতাসীনদের দাপট তৃনমূলের সামাজিক সম্প্রীতি ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গেছে। এক দলের সঙ্গে অন্য দলের পাশাপাশি  নিজেদের দলের মধ্যে বিরোধ ও শত্রুতা বাড়ছে। আশংকা বাড়ছে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তৃতীয় দফার নির্বাচনে নিচেরা ছাড়া আর কী কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচনের মাঠে পাওয়া যাবে?

দেশের শাসনব্যবস্থা বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় এমত অস্থির পরিস্থিতির মূল কারণ হচ্ছে, সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলিকে অদৃশ্য দলীয় নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিযে এটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সরকার দলীয় পরিচয়ের সাথে প্রতিষ্ঠানগুলিকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও সাংবিধানিক দায়িত্ব না ভেবে অনেকটা সরকারী কর্মকর্তাদের মত আচরন করছেন। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা  হারাচ্ছে রাষ্ট্র, জনআস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে যাচ্ছে।

এবারের নির্বাচন তৃনমূলের রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সমূলে বিনষ্ট করে দিয়েছে। দুই দফায় অনুষ্ঠিত প্রায় দেড় হাজার ইউনিয়নে এই অক্ষমতা সবরকম সামাজিক ভারসাম্য ধ্বংস করে দেবে। ফলে সমাজ জুড়ে আগত সংকট ও অস্থির পরিস্থিতি তৃনমূলকে বিপুল বেগে আঘাত করতে চলেছে। যার শিকার হবে প্রধানত: গ্রামীন জনগোষ্ঠি।  নির্বাচন কমিশন, সরকার ও রাজনৈতিক দল মিলে কি সেদিকেই যাত্রা করলো ?