Home » প্রচ্ছদ কথা » ওলামা লীগের ফতোয়া আর পহেলা বৈশাখে সরকারী নিষেধাজ্ঞা

ওলামা লীগের ফতোয়া আর পহেলা বৈশাখে সরকারী নিষেধাজ্ঞা

আমীর খসরু ::

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বরাবরই এবং বর্তমানে আরও তীব্রভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে যে, তারাই দেশের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক শক্তি ও ধর্ম নিরপেক্ষতার ধারক-বাহক। এই প্রচার-প্রচারণার ভিত্তি হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আর তারা এ কথাও বলছে যে, তারাই রক্ষা করে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং এক্ষেত্রে তাদের অভিভাবকত্ব ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নাকি বিপন্ন হবে; সাথে সাথে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হবে ও ধর্ম নিরপেক্ষতা হবে বাধাগ্রস্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন পক্ষ ১৯৭২-এ মূল সংবিধানে ফিরে যাবার কথা বলে এমন কিছু বিষয় বহাল রেখেছে-যা আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।

১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতারা ধর্ম নিরপেক্ষতাকে শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি হিসেবেই স্থান দেননি, তাদের চিন্তা-চেতনার মধ্যে এ বিষয়টি ছিল অতিমাত্রায় সক্রিয়। ১৯৭২-এর সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য ক, সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা, খ, রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান, গ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, ঘ, কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে

কিন্তু এতোকাল পরে এসে আওয়ামী লীগ সংবিধান প্রণীত সেই মৌল চেতনার পরিপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছে। এটা শুধুমাত্র যে রাজনৈতিক অবস্থান বা পথ পরিবর্তন তাই নয়, সামগ্রিকভাবেই তাদের মধ্যে এই বিষয়গুলো ক্রিয়াশীল রয়েছে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এই আওয়ামী লীগই নির্বাচনী লাভালাভের জন্যে ২০০৬-এ খেলাফত মজলিসের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল-যাতে শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এ কথাটি মনে রাখতে হবে, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক অতীতে বার বার সভা-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের সাথে ক্ষমতাসীন মহলের যুক্ত থাকা এবং মদদদানের অভিযোগ করা হয়। তারা কয়েকজন মন্ত্রীসহ প্রভাবশালীদের নামও প্রকাশ্যে এবং সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছিলেন ও তালিকাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে যে কোনো কাজ হয়নি- তা দাবি করছেন ওই সংগঠনের নেতারাই।

পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে দীর্ঘকাল ধরে। চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উদযাপন এই অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। কিন্তু আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ওলামা লীগ আবার ফতোয়া দিয়েছে এই বলে যে, পহেলা বৈশাখ পালন হারাম। তারা ওই ফতোয়া দেয়ার জন্য মানববন্ধনও করেছে। মানববন্ধনে শুধু পহেলা বৈশাখ পালনকে হারামই বলা হয়নি, বেশ কয়েকটি দাবি-দাওয়াও তাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে। এমন দাবি-দাওয়া যে নতুন তা নয়। তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাধর নেতা, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, তারা ওলামা লীগের বক্তব্যের সাথে একমত নন এবং ওই বক্তব্য তারা গ্রহণ করেন না। কিন্তু এই ব্যাখ্যাই যথেষ্ট বলে মনে হয় না। কারণ এর আগেও ওলামা লীগ প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ব্যাপারেও কয়েক দফায় নেতিবাচক মন্তব্য করেছিল। ওলামা লীগ বলছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে একজন হিন্দুকে প্রধান বিচারপতি রাখা যায় না। তখনো সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি দল থেকেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে-তারও কোনো নজীর খুজে পাওয়া যায় না।

এখানেই শেষ নয়, ২০১৫ সালের আগস্টে ওলামা লীগ সমাবেশ করে বেশ কিছু দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছিল। এসব দাবি-দাওয়াগুলোর কয়েকটি ছিল এ রকম : নাস্তিক ব্লগার কর্তৃক বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইট, স্যোসাল মিডিয়ায় কুরুচিপূর্ণ নাস্তিক্যবাদী লেখা বন্ধে ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদন্ডের আইন প্রণয়ন করা, ঈদের দিন হিন্দুদের রথযাত্রা করে মুসলমানদের ঈদের দিন ম্লান করার ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে, বিদেশী স্বার্থ রক্ষাকারী দেশদ্রোহী সিএইচটি কমিশনসহ বিদেশী দালালদের নিষিদ্ধ করতে হবে, ইসলাম বিরোধী রচনা পাঠ্যক্রম থেকে বাদ বিতর্কিত শিক্ষানীতি বাতিল করতে হবে, বর্তমান পাঠ্যপুস্তকে কট্টর ইসলাম বিরোধী হিন্দু নাস্তিক লেখকদের লেখাকে নিরঙ্কুশ প্রাধান্য প্রদান করা হয়েছেউদাহরণস্বরূপ ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা বইয়ে অন্তর্ভুক্ত গল্প, কবিতা প্রবন্ধসমূহের মধ্যে মুসলমান লেখকদের তুলনায় বিধর্মী হিন্দু লেখকদের লেখাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছেযেমন ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত গল্প কবিতার সংখ্যা ১৯৩টিএর মধ্যে হিন্দু নাস্তিকদের লেখার সংখ্যা হলো ১৩৭টিযা সর্বনিম্ন শতকরা ৫৭ ভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৮২ ভাগ প্রাধান্য পেয়েছেএটা বন্ধ করতে হবে, মেয়েদের বিয়ের  কোনো বয়স নির্ধারণ করা যাবে না, সুন্নতি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কুফরী আইন বাতিল করতে হবে, প্রশাসনে হিন্দুতোষণ বন্ধ করা ইত্যাদিপাঠ্যক্রম সম্পর্কে ওলামা লীগের ওই সমাবেশে বলা হয়, ‘ইসলাম ধর্মের প্রতি যাদের কোন আস্থা বা বিশ্বাস নেই বরং ইসলাম ধর্ম বিদ্বেষী এমন সব বামপন্থী ব্যক্তি; জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটির চেয়ারম্যান কবীর চৌধুরী, কো-চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, সদস্য ড. জাফর ইকবাল, অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র সূত্র ধরদের দিয়ে বর্তমান শিক্ষানীতি প্রণয়ণ করা হয়েছেঅথচ এসব কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী ব্যক্তিদের প্রণীত শিক্ষানীতি মুসলমানদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়তারা মূলত এদেশের কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মন-মগজ থেকে দ্বীন ইসলাম উঠিয়ে দিয়ে নাস্তিক্যবাদী মন-মনন গড়তে শিক্ষানীতি প্রণয়ণ করেছেএদেশকে নাস্তিক্যবাদী দেশ বানাতে এই ইসলাম বিরোধী শিক্ষানীতি তৈরী করা হয়েছে’প্রশাসন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘চাকরীর ক্ষেত্রে ৯৮ ভাগ জনগোষ্ঠী মুসলমানদের নিয়োগ আনুপাতিকহারে করতে হবেহিন্দুদেরকে মুসলমানদের চেয়ে বেশি নিয়োগ দিয়ে বৈষম্য করা যাবে নাপ্রশাসনকে হিন্দুকরণ চলবে নাকারণ ২০১৩ সালের অক্টোবরে পুলিশের এসআই পদে নিয়োগে ১৫২০ জনের মধ্যে হিন্দু নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৩৩৪ জন যা মোটের ২১.৯৭ শতাংশ২০১১ সালে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইতে নিয়োগের ৯৩ জনের মধ্যে হিন্দু নিয়োগ করা হয়েছে ২৩ জনযা মোটের ২৪.৭৩ শতাংশসম্প্রতি ৬ষ্ঠ ব্যাচে সহকারি জজ পদে নিয়োগ দেয়া ১২৪ জনকেএর মধ্যে ২২ জনই হিন্দুশতকরা হিসেবে ১৭ শতাংশএসব বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মুসলমান দেশে মুসলমানদের প্রতি ব্যাপক বৈষম্যের দাবিই দৃঢ় হচ্ছে

সে সময়ও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে কারো জানা নেই। এমনকি ওলামা লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয়ভাবে নেয়া হয়েছে এমনটাও শোনা যায়নি। আওয়ামী লীগেরই কেন্দ্রীয় অফিসেই ওলামা লীগের অফিস। তাহলে এবারে ওলামা লীগের বক্তব্যের সাথে আওয়ামী লীগ একমত নয় বলে হানিফ যে বক্তব্যে দিয়েছেন তা কতোটুকু কার্যকরি হবে? এ কথা পরিষ্কার যে, ওলামা লীগ যে ভাষায় কথা বলছে তা অন্যান্য অনেক সাম্প্রদায়িক দলের বক্তব্যকেও হার মানায়।

ওলামা লীগের বিষয়টি যে শুধু ওলামা লীগের নিজস্ব সংকট তা মনে করার কোনো কারণ নেই। নেই এই কারণে যে, যদি থাকতো তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হতো।

ওলামা লীগ পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে ফতোয়া দিয়েছে। অন্যদিকে, এবারের পহেলা বৈশাখে বিকাল ৫টার মধ্যে বাইরের সব অনুষ্ঠান শেষ করতে হবেসহ যেসব নির্দেশাবলীর মাধ্যমে পুলিশ যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাতেও কিছু প্রশ্ন ইতোমধ্যে উত্থাপিত হয়েছে। পুলিশের এই নিষেধাজ্ঞা কি শুধুমাত্র নগন্য সংখ্যক যৌন সন্ত্রাসীর কারণে অথবা জঙ্গীবাদী-উগ্রবাদী কর্মকান্ডের আশংকায়? প্রথম বিষয়টি আলোচনা করতে গেলে দেখা যায়, গত বছরের পহেলা বৈশাখে যে হাতেগোনা কয়েকজন যৌন সন্ত্রাসীর তান্ডব প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী, এই এক বছরে তাদের ক্ষেত্রে কি আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? কেন ব্যবস্থা নেয়া যায়নি? তাহলে কি নগন্য সংখ্যক যৌন সন্ত্রাসীর কাছে পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা অসহায় অথবা অন্য কিছু? সামান্য কয়েকজন যৌন সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারার দায় সরকার ও তার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিতেই হবে। আর দ্বিতীয় প্রশ্নটি অর্থাৎ জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদীদের আশংকায়ই যদি এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তাহলেও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, সরকারের পক্ষ থেকে উগ্রবাদ-জঙ্গীবাদ মোকাবেলা করা গেছে এবং তারা সব সময় তৎপর রয়েছে-এ সব কি শুধুই কথার কথা? এই নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে সমাজে ভীতির সংস্কৃতি আরও বিস্তার লাভ করবে। আর ওলামা লীগের বক্তব্যও জনমনে শংকার সৃষ্টি করবে-তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ওলামা লীগের বক্তব্য এবং পহেলা বৈশাখে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে কি এটা প্রমাণিত হয় না যে, বাংলাদেশ ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে? অসীম সাহসী মানুষকে ক্রমশই পিছু হটতে বাধ্য করা হচ্ছে? এসব প্রশ্নের মীমাংসা অতীব জরুরী। কারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান এবং সবার সুরক্ষা প্রদান রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।