Home » অর্থনীতি » মাথাপিছু আয় আর জিডিপি বৃদ্ধির সরকারি প্যাচগোচ

মাথাপিছু আয় আর জিডিপি বৃদ্ধির সরকারি প্যাচগোচ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সরকারি হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় হবে এক হাজার ৪৬৬ ডলার-যা বিগত বছরের তুলনায় ১৫০ ডলার বেশি। তা ছাড়া এই অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশেরও বেশি হবে বলেও বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলনে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ বলা হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক প্রাক্কলনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই অর্থ বছরে প্রথমবারের মতো জিডিপি সাত শতাংশ হয়েছে । প্রশ্ন হলো, জিডিপি প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় বাড়লেই কি দেশের সব মানুষ ভালোভাবে খেতে, পড়তে পারছে। ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তাসহ আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত জীবন-যাপন ও মানসম্পন্ন বাসস্থানের সুযোগ কি পাচ্ছে? মোটেই না। বাংলাদেশে মাথাপিছু আয়ের বৈষম্যের দিকে তাকালেই দেখা যাবে যে, একদিকে বহু মানুষ দিনে ১৫০ থেকে টাকা আয় করে অথবা কখনো সারাদিন উপোস করে সংসার চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, কোন মানুষের দিনে এক লাখ টাকা আয় করে সংসার চালাচ্ছে। এভাবে কোন দেশের মাথাপিছু আয়ের প্রকট বৈষম্য রেখে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে না, পেছনে পড়ে রয়েছে। সংশি¬ষ্টরা বলছেন, এ ধরনের বৈষম্য রেখে দেশের মাথাপিছু আয়ের হিসাবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হলেও সাধারন মানুষের কোনো লাভ নেই। একজনের আয় যদি হয় ১০০ টাকা এবং আরেকজনের হয় ২ টাকা, তাহলে গড় করলে দেখা যাবে দুই জনের গড় আয় ৫১ টাকা। তাহলে দুজনের প্রকৃত আয় কি সমান হলো? এ প্ররিপ্রেক্ষিতে যদি ধরে নেয়া হয়, যার বার্ষিক আয় ৪ থেকে ৫ লাখ ডলার এবং একজন দিনমজুরের আয় যদি হয় চার-পাঁচশ ডলার। তবে বলতে হবে দিনমজুরের আয়ের সাথে কোটিপতির আয় যুক্ত হয়ে হয়েছে ১৪৬৬ ডলার। আবার কোটিপতির আয় বছরে যে হারে বৃদ্ধি পায়, দিনমজুরের বৃদ্ধি তার থেকে যোজন যোজন ব্যবধানে থাকে। কাজেই মাথাপিছু গড় আয়ের হিসাবে প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে না। এর মধ্যে বেকার তরুণ শ্রেণীও রয়েছে। তাহলে কি বেকারের আয়ও ১৪৬৬ ডলার? সরকারের তরফ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, গড় আয় বৃদ্ধির যে হিসাব দেয়া হচ্ছে, তা সেদিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি ইঙ্গিত সরকার দিতে চাচ্ছে। এরই মধ্যে আগামী বছর হয়তো এই আয় আরও বাড়বে। প্রশ্ন আসতে পারে, সরকার যেভাবে আয় ও জিডিপি বৃদ্ধির হিসাব দিচ্ছে এবং অর্থনীতির যে গতি দেখাচ্ছে, আসলে কি এ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে?

মাথাপিছু আয় পুরো সত্যটি তুলে ধরে না। কারণ এটি একটি গড় হিসাব। হাতি এবং পিঁপড়ার ওজনের গড় হিসাব করলে যে  গড়ের হিসাব পাওয়া ছাড়া আর কি? বাংলাদেশে দারিদ্র্য  হ্রাস পেলেও ধনবৈষম্য, আয়বৈষম্য প্রকট। সরকারি গিনি কোফিশিয়েন্টের হিসাবে সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ ধনাঢ্যদের ধনসম্পদ ও আয়ের পরিমাণ লুক্কায়িত থেকে যায়। জিডিপি শুধুমাত্র ‘খারাপগুলো’ যেমন- স্বাস্থ্যগত সমস্যা, দুর্ঘটনা, পরিবারের ভাঙ্গন, অপরাধ এবং দূষণ এগুলোর দায় অন্তর্ভুক্ত করে তাই নয়,  বরং এটা ‘ভালোগুলোকেও’ বাদ দেয়, যেমন- বাচ্চা মানুষ করার মত বিনা-বেতনের কাজ, সংসার চালানো, বন্ধু এবং প্রতিবেশীকে সাহায্য করা, দাতব্যসেবা ও স্থানীয় সামাজিক রাজনীতির মত কর্মকান্ড।

এসবই বাজারের বাইরে ঘটা কর্মকান্ড। কিন্তু এগুলোই আমাদের অর্থনীতির মূল মূল অংশ। আমাদের অর্থনৈতিক জীবনের যেসব দিকগুলোর মূল্য পরিমাপ সবচেয়ে বেশি, যথারীতি এড়িয়ে গিয়ে জিডিপি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সামাজিক এবং পরিবেশগত মুল্যকে হিসাবের মধ্যে ধরে না। উদাহরণ হিসেবে, যা সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ফলে প্রভাব রাখে সেই জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলা যায়; অর্থনীতিবিদ নিকোলাস স্টার্নস এটাকে আখ্যা দিয়েছেন, ‘বাজার ব্যবস্থায় এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় এবং সীমাহীন ব্যর্থতা।’ বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল সুফলভোগী ধনীরা। ধনীরা দ্রুতগতিতে সম্পদ বাড়াচ্ছে, ফলে আয় বৈষম্য বেড়েই চলেছে। আর দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠি কোনো রকমে বেঁচে রয়েছে। চলতি (২০১৪-১৫) অর্থবছরে দেশের উচ্চবিত্তদের একটি হিসাব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেখানেও দেখা যায়, দেশের মোট সম্পদের বেশির ভাগের মালিক মাত্র দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ মানুষ। তাদের বার্ষিক আয় ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকার উপর। এসব ব্যক্তির সম্পদ আছে কোটি টাকার বেশি। এদের মধ্যে অনেকেই আবার শত কোটি থেকে হাজার কোটি টাকারও বেশী অর্থ-বিত্তের মালিক। হিসাবটি করা হয়েছে আয়কর জমার বিবরণী থেকে। ধারণা করা যায় -এতে ব্যাপক গড়মিল রয়েছে। কেউ সম্পদের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে চায় না। সবাই রেখে ঢেকে তারপর সম্পদ বিবরণী জমা দেয়। অনেকে আয়কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা থেকে সম্পদ কম করে দেখায়। তারপরও দেশের অধিকাংশ সম্পদ ধনী শ্রেণীর হাতেই। প্রকৃত অর্থে সম্পদের পরিমাণ আরো বেশি হবে। এরাই দেশের অর্থনীতির মূল সুবিধাভোগী। অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে সব সুবিধা কাজে লাগিয়ে সম্পদ সৃষ্টি করছে ধনী শ্রেণী। কারণ সরকারের সুবিধা ভোগ করার মতো সব ধরনের ক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এটাই তাদের সম্পদ বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্নীতি আর লুটপাটের মাধ্যমে একটি শ্রেণী দ্রুত অর্থ তৈরি করেছে। ফলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে সম্পদের বন্টন ব্যবস্থা। দারিদ্রের সম্পদ লুটে ধনী হয়েছে অনেকে। ফলে সমাজে ব্যাপক আয়-বৈষম্য বিরাজ করছে। কিন্তু এ সম্পর্কিত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা বাস্তবের তুলনায় কম। কারণ অতি ধনীরা তথ্য দেয় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে উচ্চবিত্তরা ও ধনীরা বেশি লাভবান হচ্ছে।

টমাস পিকেটি’র ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি বইটিতে বলেছেন, রাষ্ট্র যদি অত্যন্ত কঠোরভাবে আয় ও সম্পদ পুনর্বণ্টনকারীর ভূমিকা পালন না করে, তাহলে উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে বিশ্বের সব দেশে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বাড়তে বাড়তে দ্রুত বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে যাবে। সাইমন কুজনেৎস যে একপর্যায়ে উন্নত দেশগুলোতে বৈষম্য আর বাড়বে না বলে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, সেই ‘ট্রিকল ডাউন তত্ত্বকে’ পুরোপুরি বাতিল করেছেন পিকেটি। পিকেটি মনে করেন, প্রগতিশীল আয়কর ব্যবস্থা, সম্পত্তি কর ব্যবস্থা ও বিশ্বব্যাপী পুঁজির ওপর ‘গ্লোবাল ট্যাক্স বসানোর মাধ্যমে এই আসন্ন মহাবিপদ ঠেকানোর প্রয়োজনকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের সরকার কি সেদিকে নজর দেবেন?