Home » আন্তর্জাতিক » চীনকে মোকাবেলায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র নয়া সামরিক চুক্তি

চীনকে মোকাবেলায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র নয়া সামরিক চুক্তি

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র অতি সম্প্রতি উভয় দেশের সেনা, বিমান ও নৌ ঘাঁটিগুলো পারস্পরিক ব্যবহারের ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছেছে। আর এর মূল উদ্দেশ্য ভারত মহাসাগরসহ পুরো অঞ্চলে চীনকে যৌথভাবে প্রতিরোধ ও মোকাবেলা করা। ওয়াশিংটন চার বছর ধরে ‘লজিস্টিকস সাপোর্ট এগ্রিমেন্ট’ (‘কৌশলগত সমর্থন চুক্তি’) নামের ওই সমঝোতার জন্য নয়া দিল্লিকে রাজি করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। নিরপেক্ষ থাকার একটি ছদ্মবেশ বহাল রাখার জন্য দিল্লি এতে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু নাচতে নেমে ঘোমটা রেখে লাভ কী? তা-ই নরেন্দ্র মোদি সরকার ওই সমঝোতায় রাজি হতে খুব একটা দেরি করেনি। ১২ এপ্রিল দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিল্লিতে বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। এর মাধ্যমে এশিয়ায় নতুন সমীকরণের সৃষ্টি হলো। এর প্রতিক্রিয়া হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং সেইসাথে ভয়াবহ মাত্রার। ভারতের বিরোধী দলগুলো এই সমঝোতার ব্যাপারে আপত্তি করলেও তাতে খুব একটা জোর ছিল বলে মনে হয়নি। এই সমঝোতার আলোকে দেশ দুটি একে অপরের স্থল, বিমান ও নৌ ঘাঁটিগুলো জ্বালানি ভরা, মেরামতি ও বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করতে পারবে।

সমঝোতা হলেও এখনো চুক্তিতে সই হয়নি। তবে নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরের সাথে আলোচনার পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার বলেছেন, ‘সব জটিলতা নিরসনের জন্য আমরা নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছি।’ আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তি চূড়ান্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বলা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগর এবং ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমানশীল ভূমিকার কারণে মোদি প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার পথ ধরেছেন। এছাড়া ভারতের অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি হ্রাস করার জন্য মার্কিন প্রযুক্তিও আরো বেশি বেশি চাচ্ছেন মোদি। নরেন্দ্র মোদির এই চাওয়ার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কামনার যথেষ্ট মিল রয়েছে। চীনকে মোকাবেলার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী চায় ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এই লক্ষ্যেই এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ভারত সফরে গেলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি চাচ্ছেন, বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট আমলের শেষ সময়টাতে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরো জোরদার করতে।

এই চাওয়া-পাওয়ার রেশ ধরে দুই দেশের মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি আরো কয়েকটি সামরিক চুক্তি দেখা যেতে পারে।

তবে দুই দেশ কিন্তু আগে থেকেই সামরিক খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে চলেছিল। ২০১২ সালের চুক্তিবলে দুই দেশ বিমানবাহী রণতরীর নক্সা প্রণয়নের কাজেও এগিয়ে যাচ্ছে।  ভারত আগে রুশ-নির্মিত রণতরী ব্যবহার করত। এখন তারা নিজেরাই এ ধরনের রণতরী বানাতে চাইছে। এছাড়া বিমান বাহিনী আধুনিকায়নের কাজও চলছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।

চীনকে প্রতিরোধ করার কথা বলে সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। ফিলিপাইনের সাথেও যুক্তরাষ্ট্রের একটি চুক্তি হচ্ছে। এর মাধ্যমে সেখানে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হবে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনকে ঠেকানোর জন্য ফিলিপাইনের ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়। জাপান আরো আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। চলতি বছরেই পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরের কাছাকাছি ফিলিপাইন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপান যৌথ নৌ মহড়া চালাবে।

অথচ এই সাগরের কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে চীনের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সমঝোতাতেও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ প্রকটভাবে ফুটে ওঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সমঝোতার বিষয়টি চীনের অগোচরে থাকেনি। চীন অবশ্য এখনো সরাসরি সমালোচনা করেনি। বরং ভারতকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার অনুরোধ করেছে।

চীনের প্রতিক্রিয়া : সমঝোতা স্বাক্ষরের পরদিন তথা ১৩ এপ্রিল নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লু কাং কিছুটা সংযতভাবে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত বেশ প্রভাবশালী দেশ। ভারত বরাবরই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। নিজের স্বার্থ অনুযায়ী তারা কূটনৈতিক অবস্থান নেবে।’

তবে এই ইস্যু নিয়ে নয়া দিল্লির সাথে বেইজিং কথা বলবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর ১৮ এপ্রিল বেইজিং যাচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে দুই দেশের কেউই এখন পর্যন্ত দুই দিনের এই সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।