Home » Uncategorized » তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন-(পর্ব ৯)

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন-(পর্ব ৯)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ::

তাঁর ইংরেজী ভাষার চর্চা নিজের ভেতরকার বুর্জোয়া বিকাশেরই অংশ। কিন্তু বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই যে, তিনি মোটেই উৎপাটিত নন, সৃষ্টিশীল ও গভীর ভাবে প্রোথিত। দেখতে পাচ্ছি গ্রামে গিয়ে তিনি মুর্শিদী ও জারি গান শুনছেন। বিলে নেমে অন্যদের সঙ্গে মাছ ধরছেন। কর্মরত মানুষজনের সাথে আত্মীয়ের মতো আলাপ করছেন।

যেমনটা প্রত্যাশিত ছিল, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তাজউদ্দীন যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন। পরিস্থিতিটা অবশ্যই উত্তেজানপূর্ণ ছিল। কিন্তু তাজউদ্দীনের ভেতর তার কোনো ছাপ নেই। ডায়েরী পড়ে জানা যাচ্ছে যে, তাঁর নির্বাচনী সভায় মুসলিম লীগের লোকরা আক্রমণ করছে, সভা পন্ড হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তিনি অস্থিরতা প্রদর্শন করছেন না। বিচলিত না হয়ে সাইকেলে করে জনসংযোগ করে চলেছেন। মার্চ মাসের ১০ তারিখে ভোট গ্রহণ হয়েছে, ১৩ তারিখের ডায়েরীর পাতায় বি:দ্র: দিয়ে নোট রাখছেন যে, ওই দিনই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’ ক্লাস শুরু করলেন। তারপর প্রতিদিন সন্ধ্যায় ক্লাশ করছেন। ১৮ তারিখ একটি বিশেষ দিন; সেদিন ভোট গণনা হয়েছে। তাজউদ্দীন জিতেছেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠিক তিনগুণ নয়, তার চেয়েও বেশী ভোটে পরাজিত করে দিয়েছেন। ঢাকায় তাঁকে নিয়ে মিছিল বের হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের কারণে তিনি যে আবেগে আপ্লুত এমন কোনো লক্ষণ নেই তাঁর ডায়েরীতে। কয়েকদিন পর তাঁকে দেখতে পাই তিনি এই জন্য খুশি হয়েছেন যে তাঁর এলাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। লিখেছেন ‘‘এই মৌসুমের জন্য এটি শুভ লক্ষণ। এই বৃষ্টি বোরো ধান ও আউষ চাষের জন্য খুব ভালো হবে। জমি বেশ ভিজেছে। কড়া রোদ আর অনাবৃষ্টিতে সারা দেশ কুঁকড়ে উঠেছিল। জলবসন্ত ছড়িয়ে পড়ছিল।’’ ২৯ এপ্রিলের দিনলিপিতে দেখছি চালের দাম নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন; পঞ্চাশ সালে যে মন্বন্তর হয়েছিল তার কথা তাঁর স্মৃতিতে। বলছেন, ‘‘কিছুদিন ধরে শহরে ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু হওয়ায় তা শহরের মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হয়েছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ আগের মতোই ভুক্তভোগী।’’

নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, এখন কি কি সুযোগ সুবিধা নেয়া যায় তা নিয়ে কোনো সুচিন্তা ডায়েরীর কোথাও নেই। যে কারণে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন ঠিক সে কারণেই তাঁর রাজনীতি ভিন্ন চরিত্র গ্রহণ করেছে। শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদের মাঝে যে সম্পর্কটি স্থাপিত সেটি তাঁদের উভয়ের জন্য তো বটেই, আমাদের সমষ্টিগত ইতিহাসের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা অনিবার্য ছিল যে তাঁরা এক সাথে কাজ করবেন, এবং কাজের সময়ে ও ভেতর দিয়ে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠবেন। দু’জনের মধ্যে বয়সের দূরত্ব ছিল পাঁচ বছরের, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব এস. এ করিম তাঁর লেখা শেখ মুজিব, ট্রায়াম্প এ্যান্ড ট্রাজেডি  বইতে এই ব্যবধানের কথা বলতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে মুজিব ছিলেন অতুলনীয় বক্তা, এবং সাধারণ মানুষের মনের ভাব ও ইচ্ছাকে সরল ভাষায় তুলে ধরে তাদের আস্থা ও ভালোবাসা জয় করে নেবার ব্যাপারে তাঁর ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি তাঁর দলকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। অন্যদিকে তাজউদ্দীনের ছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং সুশৃঙ্খল মন; তিনি যে খুব ভালো বক্তা ছিলেন তা নয়, কিন্তু আলাপ-আলোচনার বেলায় ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তাঁর কর্তব্যবোধ ছিল দৃঢ় দুর্দান্ত।

দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য ছিল। ডা. করিম ছিলেন উভয়েরই বন্ধু; ১৯৬২ সালে তাঁরা এক সঙ্গে জেলে ছিলেন; তখন তিনি দেখেছেন যে পূর্ববঙ্গকে যে স্বাধীন করতে হবে-এ বিষয়ে শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনের ভেতর ঐকমত্য ছিল, কিন্তু কোন পথে এগুতে হবে তা নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক হতো। ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মনকষাকষির ঘটনা যে ঘটতো না তাও নয়। একদিনের কথা তাঁর বিশেষভাবে মনে আছে। সেদিন তাঁরা সবাই মিলে ভলিবল খেলছিলেন। একদিকের দলপতি শেখ মুজিব, অন্যদিকের দলপতি তাজউদ্দীন। হঠাৎ একটি পয়েন্ট নিয়ে দু’দলের ভেতর বচসা বেধে যায়; রেফারি ছিলেন মানিক মিয়া, তিনি রায় দিলেন পয়েন্ট কেউ পাবে না। খেলা নতুন করে শুরু হলো। মুজিবের দল জিতল, করিম লিখছেন, ‘‘মুজিব বললেন, ‘দেখলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। তাজউদ্দীন টিপ্পনী কেটে বললো, ‘হ্যাঁ যে-দিকে বাতাস সে-দিকে নড়ে’।’’ তাজউদ্দীন ওই মন্তব্যে দু’জনের ভেতর ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় এবং কয়েকদিন কথাবার্তা বন্ধ থাকে। করিমের ধারণা শেখ মুজিব মনে করেছিলেন যে, তাজউদ্দীন ধর্মকে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু তিনি নিশ্চিত যে তাজউদ্দীন তা করেননি।

১৯৬২-তে আন্দোলন ছিল না; নেতারা সবাই বন্দী ছিলেন; স্রোতহীনতার ওই সময়ে ভুল বোঝাবুঝিটা অস্বাভাবিক ছিল না; কিন্তু ১৯৬৪-তে যখন রাজনৈতিক তৎপরতার একটি প্রবাহ তৈরি হলো তখন দেখি শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন এক হয়ে গেছেন; মুজিব আছেন সামনে, নেতা তিনিই; কিন্তু সবাই বুঝতে পারছেন যে, তাজউদ্দীন আছেন সঙ্গেই, পরিপূরক হিসেবে। ছয় দফার ঘোষনা দেয়ার পর জুলফিকার আলী ভুট্টো মুজিবকে বিতর্কে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। মুজিব সে-চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ভুট্টো তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়ে ঢাকায় এলে তাজউদ্দীন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন, বিতর্কের আনুষ্ঠানিকতা ঠিক করার জন্য। তাঁর সাথে কথা বলে ভুট্টো বুঝেছেন বিতর্কের জন্য এপক্ষ থেকে যে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে তাতে তিনি সুবিধা করতে পারবেন না। তর্কযুদ্ধে না নেমে ভুট্টো সদলবলে প্রস্থান করেন।

সাতই মার্চের সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতাটি শেখ মুজিবেরই; কিন্তু তার পেছনেও তাজউদ্দীন ছিলেন; কোন কোন পয়েন্টে বলতে হবে তা তিনিই সাজিয়ে দিয়েছেন; এবং মঞ্চে বসে সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন কোনোটি যেন অঘোষিত না থাকে। এরপরে শুরু হয় অসহযোগ, তখন বাংলাদেশের সরকার চলতো আওয়ামী লীগের নির্দেশে। পঁয়ত্রিশটি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, সেগুলো তাজউদ্দীনের হাতেই রচিত। দেশের কাছে মুজিব তখন অদ্বিতীয়, আর তাজউদ্দীন অদ্বিতীয় মুজিবের কাছে।

চরম মুহূর্তটি এসেছিল পঁচিশে মার্চের রাত্রে। পাকিস্তানী হানাদারেরা কী করবে টের পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু আন্দোলনের নেতারা কী করবেন সেটা ছিল অনিশ্চিত। এখন জানা যাচ্ছে যে, পরিকল্পনা ছিল আত্মগোপন করে স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়া হবে এবং অনিবার্য যুদ্ধে মুজিব ও তাজউদ্দীন এক সঙ্গে থাকবেন। তদনুযায়ী তাজউদ্দীন গেলেন মুজিবের কাছে; গিয়ে শোনেন তিনি ঠিক করেছেন বাড়িতেই থাকবেন, তাজউদ্দীনদের সঙ্গে যাবেন না। দেশের ইতিহাস তখন তাকিয়ে ছিল সিদ্ধান্তের দিকে, সিদ্ধান্ত এলো না। তাজউদ্দীন একটি লিখিত বিবৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন শেখ মুজিবের স্বাক্ষরের জন্য, একটি টেপ রেকর্ডারও তাঁর সঙ্গে ছিল, নেতার কণ্ঠস্বরে দিকনির্দেশ রেকর্ড করবেন এই আশায়। স্বাক্ষর পেলেন না, কণ্ঠস্বরও পেলেন না। হানাদার বাহিনী যে হত্যাকান্ড শুরু করবে তার সব লক্ষণ তখন স্পষ্ট, খবরও আসছে নানা সূত্রে। মোকাবিলা করতে হলে নেতাকে চাই, শেখ মুজিব তখন জাতির অবিসংবাদিত নেতা, তাঁকে বাদ দিয়ে যুদ্ধ চলবে কি করে? তাছাড়া তাঁর অনুপস্থিতিতে কার পরে কে থাকবেন সেই ক্রমটি যেহেতু তিনি জানিয়ে দেননি, তাই নেতৃত্বের কেবল যে অভাব ঘটবে তা নয়, যাঁরা থাকবেন তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে, কেউ কাউকে মানতে চাইবেন না, ফলে সংকটের সৃষ্টি হবে। এসব যুক্তি তাজউদ্দীন দিয়েছেন। কিন্তু নেতা অনড় ছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তে। (চলবে)