Home » বিশেষ নিবন্ধ » চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৩৮ :: মাও-এর মৃত্যু ও চার কুচক্রীর পতন

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৩৮ :: মাও-এর মৃত্যু ও চার কুচক্রীর পতন

আনু মুহাম্মদ :

চৌ এন লাইয়ের মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই মাও সেতুং (নতুনভাবে যার উচ্চারণ মাও জে দং) মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। এর কয়েক মাস আগে থেকেই তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন পার্টি ও চীনা নেতৃত্ব নিয়ে কঠিন সংঘাতে অনিশ্চয়তা চারিদিকে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় পার্টিতে যে বিভাজন ও লড়াই শুরু হয়েছিলো তা স্তিমিত হলেও তার সমাপ্তি তখনও ঘটেনি। পার্টির মধ্যে কঠিন সংগ্রামের ওঠানামার মধ্যেই দেংজিয়াও পিং পার্টি নেতৃত্বে ফিরে আসেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবে তিনি আক্রান্ত ছিলেন, আক্রান্ত ছিলেন চৌ এন লাইও। আগেই বলেছি, সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে যারা মূল কর্তৃত্বে ছিলেন তাঁদের প্রধান লিনপিয়াও ১৯৭০ সালেই চক্রান্তকারী হিসেবে চিহ্নিত হন এবং নিহত হন। এরপর অনেককিছুই পরিবর্তিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অভিহিত হতে থাকে ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’ নামে। অনেকসময় তারাই হয়ে দাঁড়ায় প্রধান শত্রু । চীনের অভ্যন্তরেও নীতি ও কর্মসূচিতে অগ্রাধিকারে পরিবর্তন দেখা যায়।

চৌ এন লাইএর মৃত্যুর পর মাও যাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন করেন সেই হুয়ো গুয়ো ফেং তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ছিলেন এবং দেং জিয়াও পিং এর অনুসারী ছিলেন না। কিন্তু তাঁকে সামনে রেখেই দেং নিজেদের প্রভাব বলয় শক্ত করতে সক্ষম হন। তার ফলে খুব গুছিয়ে বিরোধীদের দমন অভিযান চালানো সম্ভব হয়, এবং মাও এর মৃত্যুর ২৭ দিনের মাথায় ৬ অক্টোবর‘চার কুচক্রী’ বলে অভিহিত করে গ্রেফতার করা হয় দেং বিরোধী নেতৃবৃন্দকে। এঁরা হলেন জিয়াং কিং (১৯১৩-১৯৯১), ঝাং চুনকিয়াও (১৯১৭-২০০৫), সাহিত্য সমালোচক ইয়াও ওয়েনইউয়ান (১৯৩১-), এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওয়ান হং ওয়েন (১৯৩৫-১৯৯২)। গ্রেফতার করবার পর তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে অনেক মানুষের দুর্ভোগ, অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি, বিশৃঙ্খলা এবং হতাহতের জন্য তাঁদের দায়ী করে বিচারের সম্মুখিন করা হয়। ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত বিচারে আত্মপক্ষ সমর্থনে জিয়াং ছিলেন সবচাইতে সরব ও প্রতিবাদী। তিনি নিজেই নিজের পক্ষে যুক্তি তথ্য উপস্থাপন করেন। তাঁদের মূল বক্তব্য ছিলো তাঁরা মাওয়ের নির্দেশেই সবকাজ করেছেন। কিন্তু বিচারে জিয়াং ও ঝাংকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে পরে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়, অন্য দুজনকেও দীর্ঘ মেয়াদের কারাদন্ড দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, জিয়াং কিং ছিলেন মাও সে তুং এর স্ত্রী। এই সময়ে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয, সাংহাই সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক কর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়। বিচারের বিবরণী আর প্রকাশ করা হয়নি।

পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করতে থাকে যে, মাও সে তুং তাঁর শেষবছরে জিয়াং কিং এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেকারণে এরা মাও সেতুং এর মৃত্যুর পর ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করে। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত পার্টির দলিলে বলা হয়েছে, ‘‘অক্টোবর ৬, ১৯৭৬: পার্টি ও জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটির পলিট ব্যুরো, এর নিউক্লিয়াস হুও কুয়ো ফেং, ইয়ে জিয়ানইং ও লি জিয়াননিয়ান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং তদন্তের জন্য জিয়াং কিং, ঝাং চুনকিয়াও, ইয়াও ওয়েনইউয়ান, এবং ওয়ান হং ওয়েনকে আটক করেন। এর মধ্য দিয়ে জিয়াং কিং প্রতিবিপ্লবী চক্রের পতন ঘটে। এই পদক্ষেপ সারাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে উষ্ণ সমর্থন পায়। সর্বত্র এই ঐতিহাসিক বিজয়কে অভিনন্দন জানাবার জন্য জনসমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ যা দশ বছর ধরে উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছিলো তার সমাপ্তি ঘটলো।’’ [i]

যেহেতু এরপর পার্টির কর্তৃত্ব দেং গ্রুপ পুরোপুরি করায়ত্ত করতে সক্ষম হয় সেহেতু উপরের বর্ণনা তাদের দিক থেকে খুবই স্বাভাবিক। একই কারণে চীন থেকে আর কখনোই এই পরিস্থিতি নিয়ে অন্য কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে এ নিয়ে চীনের বাইরে মাওবাদী ও বিপ্লব সমর্থকঅন্যদের লেখালেখি আছে। জিয়াং কি দের পক্ষে এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য রেমন্ড লোট্টার বই। তিনি বিভিন্ন দলিলপত্র দিয়ে বলতে চেয়েছেন কথিত চার কুচক্রী আসলে মাও সেতুংএর আদর্শেই কাজ করেছেন। তাঁরা যদি চার কুচক্রী হন তাহলে মাও হচ্ছেন পঞ্চম। [ii] ঠিক এই অবস্থান না হলেও চার্লস বেটেলহেইম ও উইলিয়াম হিনটন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু লেখা লিখেছেন।

দেংবিরোধী মূল শক্তির পতনের পর হুয়া গুয়ো ফেং, মার্শাল ইয়ে জিয়াইং এবং দেংজিয়াও পিং নেতৃত্বের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯৭৭ সালে গঠিত পলিটব্যুরোতে তাঁরাসহ চারজন মার্শাল, সাতজন জেনারেল সহ সামরিক ব্যক্তিদের অবস্থান পরবর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতাচক্রের সাথে সামরিক শক্তির যোগসূত্র নির্দেশ করে।

[i]CPC: History of the Chinese Communist Party, A chronology of Events (1919-1990), Beijing 1991. p. 377.

[ii]Raymond Lotta:And Mao Makes Five: Mao Tsetung’s Last Great Battle, June 1978, Banner Press, LLC