Home » আন্তর্জাতিক » পাকিস্তানে সেনাবাহিনী কেনো রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ

পাকিস্তানে সেনাবাহিনী কেনো রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, দি ইকোনমিস্ট থেকে

পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক এলিটরা সবসময়েই দুবাইয়ে পাড়ি দিয়ে আসছেন। তবে গত মাসে এমিরেটসের যে নিয়মিত ফ্লাইটটি করাচি ত্যাগ করেছিল, তাতে লক্ষণীয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ, সামনের সুসজ্জিত আসনে তিনি বসেছিলেন। ২০১৩ সালে স্বেচ্ছানির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পর সরকার তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ বেশ কয়েকটি মামলা করায় তিন বছর ধরে তার ওপর ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা ছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার খুব সম্ভবত অসুস্থতার কারণে বিদেশ যেতে দিতে সম্মত হয়। ১৯৯৯ সালে মোশাররফের অভ্যুত্থানের শিকার হওয়া ওই প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পরিশেষে ‘এক্সিট কন্ট্রোল লিস্ট’ থেকে সাবেক সেনাপ্রধানের নামটি বাদ দেওয়াটা ছিল পাকিস্তানের পরাক্রমশালী সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের ব্যর্থতার লজ্জাজনক স্বীকৃতি।

সাবেক এক সামরিক শাসকের সৃষ্ট হলেও তার দ্বিতীয় সরকার উৎখাত হয়ে সাত বছর সৌদি আরব ও লন্ডনে প্রবাস জীবন অতিবাহিত করতে হওয়ায় নওয়াজ শরিফের মনে দৃঢ়প্রত্যয় জন্মেছিল যে, জেনারেলদের অবশ্যই ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।

২০১৩ সালের মে মাসে তৃতীয় বারের জন্য নওয়াজ শরিফ যখন ক্ষমতায় এলেন, অনেকের ধারণা জন্মেছিল, এবার তিনি হয়তো সফল হবেন। তিনি নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়েছিলেন। মোশাররফের আমল এবং সাবেক আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন সেনাবহিনীর অফিসার প্রশিক্ষণ একাডেমীর অনতিদূরেই বহুদিন ধরে লুকিয়ে থাকার খবর প্রকাশসহ অন্যান্য বিপর্যয়ের কারণে সেনাবাহিনীর অবস্থা তখনো বেশ কলঙ্কিত। একটি বিশেষ আদালতে মোশাররফের বিচারের সিদ্ধান্তকে একটা বড় পদক্ষেপই বলতে হবে। তবে এই বিচারের আয়োজন করা হয়েছিল ১৯৯৯ সালের অভ্যুত্থানের কারণে নয়, এটা ২০০৭ সালে স্বল্প সময়ের একটি জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণে। বড় কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টি বাদ দিলেও সাবেক এক সেনাপ্রধানের জন্য আদালতে হাজির হওয়াটা হতে পারত বেসামরিক ক্ষমতার একটি ঐতিহাসিক প্রকাশ।

নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সমস্যাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে মোশাররফকে আদালতে দাঁড় করার প্রয়াস ব্যাহত করার চেষ্টা চালিয়ে যায় সেনাবাহিনী, যদিও অবশেষে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি আদালতে হাজিরা দেন। এর পরপরই মোটা দাগে সরকারপন্থী টিভি চ্যানেল বলে পরিচিত জিও টিভি এবং সেনাবাহিনীর মধ্যকার এক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে ক্ষমতাশীন দল। টিভি চ্যানেলটি প্রকাশ্যে তাদের শীর্ষ এক সাংবাদিককে গুপ্তহত্যা চেষ্টার জন্য সামরিক বাহিনীর স্পাই মাস্টারকে অভিযুক্ত করে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ২০১৩ সালের নভেম্বরে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ। তিনি মোশাররফ আমলে কেবল নিস্কলুষই থাকেননি, সেইসাথে পাকিস্তানে হামলা চালানো জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে ধীরে ধীরে জনগণের শ্রদ্ধার আসন থেকে প্রধানমন্ত্রীকে অনেকটাই টলিয়ে দিয়েছেন। ২০১৪ সালে রাজধানী ইসলামাবাদের রাজপথে বিরোধী গ্রুপগুলোর ডাকা গণবিক্ষোভকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করে নওয়াজ শরিফের সরকারকে রক্ষা কৃতিত্বও লাভ করেন তিনি।

সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া সরকার চালাতে পারবেন না-এই উপলব্ধিতেই প্রধানমন্ত্রী শরিফ আরেক শরিফের (যদিও তারা আত্মীয় নন) সঙ্গে যৌথ শাসন প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছেন। যদিও দুই শরিফ নিয়মিত বৈঠক করছেন এবং প্রায়ই বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে একসঙ্গে হাজির হচ্ছেন, কিন্তু তবুও তাদের মধ্যকার অব্যাহত দ্বন্দ্ব অনিবার্য। গত মাসে লাহোরের একটি পার্কে তালেবানের বোমা হামলায় ৭২ জন নিহত হওয়ার পর তাদের সম্পর্কে নতুন রূপ নেয়। জেনারেল রাহিল শরিফ সুযোগটি লুফে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নিজ এলাকা পাঞ্জাব প্রদেশের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী এখনো এটা প্রতিহত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।