Home » বিশেষ নিবন্ধ » ঐতিহাসিক মে দিবসের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ

ঐতিহাসিক মে দিবসের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ

হায়দার আকবর খান রনো ::

মে দিবস হলো দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকদের আট ঘন্টা শ্রম দিবসের দাবিতে ধর্মঘট ও মিছিলের ওপর বুর্জোয়া সরকারের গুলিবর্ষণ ও শ্রমিক হত্যার দিবসটিকে বেছে নেয়া হয়েছিল শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের ও আন্তর্জাতিক সংহতির দিবস হিসাবে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধেও ইউরোপ অমেরিকায়-সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শ্রমিকদের খাটানো হতো। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে, বিশেষ করে আমেরিকায় ২০ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো। অনেকটা বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের মতো। তথাকথিত সুসভ্য আমেরিকানদের প্রাচুর্য গড়ে উঠেছিল একদিকে আফ্রিকা থেকে মানুষ শিকার করে বর্বর দাস প্রথা চালু করা এবং অপরদিকে শ্রমিকদের নির্মমভাবে শোষণ করে। পুঁজিবাদী বিশ্বের সর্বত্রই প্রায় একই রকম অবস্থা ছিল। তাই ঊনবিংশ শতাব্দীতে কাজের ঘন্টা কমানোর দাবিতে বড় বড় আন্দোলন হয়েছিল। মার্কিন সরকার কাজের ঘন্টা কমাতেও রাজি হয়নি অথবা শ্রমিক আন্দোলন ও শ্রমিক ধর্মঘটকেও স্বীকৃতি দিতে রাজি হয়নি। প্রবল আন্দোলনের চাপে ১৮৩৭ সালে মার্কিন সরকার বাধ্য হয়েছিল সরকারি কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য ১০ ঘন্টা শ্রম দিবস চালু করতে। ১৮২০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে কাজের ঘন্টা নির্ধারণের দাবিতে অনেক ধর্মঘট হয়েছিল। এই দাবির ভিত্তিতে যে সংগ্রাম তার ফলে জন্ম নিয়েছিল পৃথিবীর প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন ফিলাডেলফিয়ার মেকানিকদের ইউনিয়ন ১৮২৭ সালে।

আমেরিকার মহান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একমাত্র ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রপতি যিনি শ্রমিকদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘যা কিছু শ্রমিকদের ক্ষতি করে, আমেরিকার প্রতি তা বিশ্বাসঘাতকতা। দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যায় না।…শ্রমিকরা যখন ইচ্ছে তখনি ধর্মঘট করতে পারে এমন একটি শ্রম ব্যবস্থা চালু থাকতে দেখে আমি খুশি।’

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকদের স্বাধীন ধর্মঘটের অধিকার কখনোই স্বীকৃত হয়নি। বরং শ্রমিকদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য পুলিশ প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের সব কিছুই ব্যবহার করে এসেছে পুঁজিপতিরা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে প্রাইভেট সশস্ত্র বাহিনীও তৈরি হয়েছিল প্রকাশ্যেই, বৈধভাবেই ঊনবিংশ শতাব্দীর ৮০-এর দশকে।

এই রকম একটি সংস্থা ছিল পিংকার্টন এজেন্সি। শ্রমিকদের মধ্যে গোয়েন্দাগিরি, খুন করা এই সকল কাজের জন্য মালিকরা তাদের ভাড়া করতো। এই সশস্ত্র গুন্ডাবাহিনীর কদর এতো বেশি ছিল যে, এক পর্যায়ে তাদের আয় দারুনভাবে বাড়তে থাকে এবং এই সংস্থাটিও বৃহৎ পুঁজিপতির স্তরে উঠে যায়।

আমেরিকায় ও ইউরোপে পুঁজিপতি ও রাষ্ট্রের চরম দমননীতি সত্তে¡ও শ্রমিক আন্দোলন প্রবলতর হতে থাকে। এর আগে কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক মতাদর্শ তুলে ধরেছেন। তারা ডাক দিয়েছেন, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও।’ শোষণের যন্ত্রকে উপড়ে ফেলে শ্রমিক শ্রেণী তৈরি করবে সাম্যবাদী সমাজ বা তার প্রাথমিক ধাপ সমাজতান্ত্রিক সমাজ। মার্কস-এঙ্গেলস শ্রমিক শ্রেণীকে শুনিয়েছেন তাদের ঐতিহাসিক কর্তব্যের কথা।

হয়তো তখনো সবার কাছে পৌছায়নি মার্কস-এঙ্গেলসের বাণী। তবু শ্রমিক শ্রেণী তার সহজাত বিপ্লবী চরিত্রের কারণে শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তারা দশ ঘন্টা শ্রম দিবসের দাবি তুলেছিলেন। তারপর বললেন, শ্রম দিবস হবে আট ঘন্টার। একদিকে শ্রমিক ধর্মঘট, অপরদিকে পুলিশের গুলি দুটোই ছিল সেই সময়ের ‘সুসভ্য’ আমেরিকার সাধারণ ও প্রায় প্রতিদিনের চিত্র।

১৮৬৬ সালের ২০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ৬০টি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বাল্টিমোরে সমবেত হয়ে গঠন করেছিলেন ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন। সেই সম্মেলনেই আট ঘন্টা শ্রম দিবসের দাবির ভিত্তিতে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। প্রস্তাবের অংশ বিশেষ নিচে উদ্ধৃত হলো:

‘‘এই দেশের শ্রমিককে পুঁজিবাদী দাসত্বের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য, বর্তমানের প্রথম ও বিরাট প্রয়োজন এমন একটা আইন পাস করা, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত রাজ্যগুলোতে আট ঘন্টাই যেন স্বাভাবিক কাজের দিন বলে গণ্য হতে পারে। যতোদিন এই গৌরবময় ফল অর্জন করতে না পারি, ততোদিন আমরা আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগের সংকল্প নিচ্ছি।’

শ্রমিক আনেন্দালন তীব্রতর হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক আন্দোলন করার অপরাধে কোর্ট দশজন খনি শ্রমিককে ফাঁসি দিয়েছিল ১৮৭৫ সালে। আমেরিকার বিচার ব্যবস্থা যে এখনো শ্রমিকবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী তার সূত্র অতীত থেকেই পাওয়া যায়।

১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর ফেডারেশন অফ অর্গানাইজড ট্রেডস এ্যান্ড লেবার ইউনিয়ন অফ দি ইউনাইটেড স্টেটস এ্যান্ড কানাডা (১৮৮৬ সালে যার নাম হয় আমেরিকান ফেডারেশন অফ লেবার) প্রস্তাব গ্রহণ করে যে, ১৮৮৬ সালের পহেলা মে সারাদেশে আট ঘন্টা শ্রম দিবস চালু করার জন্যে সমস্ত সংগঠিত শ্রমিক লড়াই করবে।

এরপর থেকে সমগ্র আমেরিকায় শ্রমিকদের মধ্যে আট ঘন্টা শ্রম দিবসের দাবি বিপুল আবেদন সৃষ্টি করে, তৈরি করেছিল ‘আট ঘন্টার উন্মাদনা’। নাইটস অফ লেবার নামক সংগঠনটি আট ঘন্টা শ্রম দিবসের দাবিকে সামনে নিয়ে আসছিল তার সদস্য সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সদস্য সংখ্যা ছিল ১৮৮০ সালে ২৪ হাজার, ১৮৮৬ সালে এক লাখ আর ১৮৮৭ সালে এক লাফে সাত লাখ।

১৮৮৬ সালের এপ্রিল মাসের দিকে মালিক-সরকার এবং সেই সঙ্গে মিডিয়া শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আক্রমণ তীব্রতর করেছিল। ফেডারেল কোর্টের ইনজাংশন অমান্য করে ধর্মঘট করার অপরাধে ১৩শ ধর্মঘটীকে গ্রেফতার করা হয়ছিল। এদিকে উপরোক্ত নাইটস অফ লেবারের সভাপতি বিশ্বাসঘাতকতাকে করে শ্রমিক ধর্মঘটের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করেছিল, যদিও তা শ্রমিকদের ধর্মঘট ও আন্দোলনের মেজাজকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।

পূর্ব ঘোষণা মতো ১৮৮৬ সালের পহেলা মে শিকাগোসহ যুক্তরাষ্ট্রের সকল শহরে ও শিল্পাঞ্চলে সফল ধর্মঘট হয়েছিল। আমেরিকার বুর্জোয়া প্রেসের রিপোর্ট অনুযায়ী সারাদেশে তিন লাখ চল্লিশ হাজার শ্রমিক মিছিল করেছেন, এক লাখ নব্বই হাজার শ্রমিক ধর্মঘট করেছেন এবং শিকাগোতেই মিছিলে অংশ নিয়েছেন আশি হাজার শ্রমিক। পহেলা মে কোনো ধরনের রক্তপাত হয়নি, যদিও পুলিশ ও মালিকের দালালদের উস্কানি ছিল। ৩ ও ৪ মে পুলিশ বিনা কারণে গুলি চালায়। মালিকের ভাড়াটিয়া গুন্ডার দল নিজেরাই এক বোমা ফাটিয়ে গুলি চালাবার অজুহাত সৃষ্টি করেছিল। সংঘর্ষ বেধেছিল পুলিশ আর শ্রমিকের মধ্যে। উভয় পক্ষেই নিহত হয়েছিল। এরপর চললো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। আমেরিকার বড় বড় বুর্জোয়া কাগজগুলো দাবি করলো ‘প্রত্যেকটি ল্যাম্পপোস্ট কমিউনিস্টদের লাশ দ্বারা সুসজ্জিত করা হোক’। শিকাগো ট্রিবিউন প্রকাশ্যে ধর্মঘটী শ্রমিকদের জন্য ফাঁসি দাবি করেছিল।

শ্রমিকদের খুন করলো যারা তাদের কোনো বিচার হলো না। বিচার হলো শ্রমিক নেতাদের। বিচার তো নয়, প্রহসন মাত্র। আমেরিকার বিচার ব্যবস্থা এমনই পক্ষপাতদোষে দুষ্ট এবং শ্রমিক বিদ্বেষী ও বর্ণবাদী যে তাকে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। বিচার ব্যবস্থা চারজন শ্রমিক নেতাকে ফাসি দিল। স্পাইজ, ফিশার, এঞ্জেল ও পার্সনস-শ্রমিক শ্রেণীর মহান চার বীর নির্ভীক চিত্তে ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রহসনমূলক বিচারের প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকায় ও ইউরোপে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। মৃত্যুদন্ড না দেয়া অথবা পুনর্বিচার করার জন্য হাজার হাজার মানুষ আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু আমেরিকার সুপ্রীম কোর্ট আপিল গ্রহণ করতেই রাজি হয়নি। গভর্নরের কাছে আবেদন জানিয়ে যারা টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন অনেক বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। যেমন এডওয়ার্ড কার্পেন্টার, উইলিয়াম মরিস, অলিভ শুনার, এলিনর মার্কস (মার্কসের কনিষ্ঠ কন্যা), অস্কার ওয়াইল্ড, জর্জ বার্নার্ড শ, ওয়াল্টার কেন, উইলিয়াম রসেটি, হেনরি হিল্ডম্যান, এডওয়ার্ড অ্যাভেলিং, ই বেলফোর্ড বাকস, ই নেসবিট, ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস, স্টপফোর্ড ব্রুক, অ্যানি বেসান্ট, ওয়াল্টার বেসান্ট, স্টেপনিয়াক, রিচার্ড হিথ, আর বি কানিংহাম গ্রাহাম।

আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণী তার বীরদের ভোলেনি। মে মাসের রক্তপাতও বিস্মৃত হয়নি। আজও পৃথিবীর সকল দেশেই শ্রমিক শ্রেণী স্মরণ করে আমেরিকার শিকাগোর সেই বর্বর হত্যাকান্ড ও শ্রমিক শ্রেণীর সাহসী লড়াইয়ের কথা এবং এই ভাবে বৃহত্তর শ্রমিক আন্দোলনের জন্য প্রেরণা লাভ করে।

১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই (ফরাসী বিপ্লবের বাস্তিল পতনের ঠিক শতবর্ষ পরে) ফ্রেডারিখ এঙ্গেলসের নেতৃত্বে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্যারিসে। ইতোপূর্বেই কার্ল মার্কস মারা গেছেন। উক্ত কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল যে পরের বছর অর্থাৎ ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছর শিকাগোর মহান শ্রমিক সংগ্রাম ও বুর্জোয়া কর্তৃক শ্রমিক হত্যার ঘটনাকে স্মরণে রেখে পহেলা মে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসাবে পালন করা হবে।

১৮৯০ সালের পহেলা মে ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রায় প্রতিটি দেশে মে দিবস পালিত হয়েছিল ধর্মঘট, সমাবেশ ও মিছিলের মাধ্যমে।

তখন থেকেই শ্রমিক শ্রেণী মে দিবস পালন করে আসছে। মে দিবস হলো পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের প্রতীকী দিবস ও আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস। যে আন্তর্জাতিকের সিদ্ধান্ত অনুসারে মে দিবস পালিত হয়ে আসছে, সেই আন্তর্জাতিকের জুরিখ সম্মেলনের (১৮৯৩ সালে) প্রস্তাবে এটা আরও সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছিল যে-

‘শুধু আট ঘন্টা দিনের জন্যই মে দিবসের সমাবেশ নয়, সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শ্রেণী বৈষম্যকে ধ্বংস করার জন্য তাকে অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণীর দৃঢ় সংকল্পের সমাবেশে পরিণত করতে হবে এবং এভাবেই যেতে হবে সেই পথে যেটা সকল জাতির শান্তির পথ, বিশ্ব শান্তির একমাত্র পথ।’

দেশে দেশে মে দিবস

আন্তর্জাতিকের আহবানে প্রায় সকল পুঁজিবাদী দেশে ১৮৯০ সালে মে দিবস পালিত হয়েছিল।

১৮৯০ সালে নিউইয়র্কের ইউনিয়ন স্কোয়ারে মে দিবস পালিত হয়েছিল ধর্মঘটী শ্রমিকদের সমাবেশের মাধ্যমে। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘আট ঘন্টা কাজের দিনের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাবার সময় আমরা কখনোই ভুলবো না যে, আমাদের চরম লক্ষ্য হলো পুঁজিবাদী মজুরি ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন।’ দেশে দেশে মে দিবস পালিত হতে লাগলো প্রতি বছর। প্রথম দিকে বুর্জোয়া সরকার মে দিবস পালনকে নিষিদ্ধ করেছিল। তা সত্তে¡ও মে দিবস পালিত হয়ে আসছিল। শ্রমিক আন্দোলনের অপ্রতিরোধ্য গতিকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ১৮৯০ সালে প্রথম মে দিবস পালিত হয়েছিল লন্ডনে ৪ মে হাইড পার্কে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ হয়েছিল। এই সমাবেশে কার্ল মার্কসের কন্যা এলিনর মার্কস যোগদান করেছিলেন। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে যে বিশাল উৎসব রূপে মে দিবস পালিত হয়েছিল তা এঙ্গেলসের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়।

মে দিবসকে আর ঠেকানো গেল না। তখন অনেক সুচতুর বুর্জোয়া সরকার মে দিবসকে মেনে নিল। কিন্তু কীভাবে? মে দিবসের সংগ্রামী তাৎপর্যকে ভুলিয়ে দিয়ে শ্রেণী সংগ্রামের পরিবর্তে শ্রেণী সমন্বয়ের দিবস হিসাবে। আমাদের বাংলাদেশে মে দিবস সরকারি ছুটির দিবস। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা বিবৃতি দেন। মে দিবসের যে লক্ষ্য ছিল পুঁজিবাদের ধ্বংস সাধন, তারা মে দিবসে সে কথা ভুলেও বলেন না। তারা বলেন, শ্রমিক মালিক যৌথভাবে শান্তি বজায় রেখে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। এটা হলো চরম প্রতারণা। মে দিবসের তাৎপর্যকে একেবারে উল্টে দেবার অপকৌশল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য এখনো মে দিবস সরকারিভাবে পালিত হয় না। ছুটির দিনও নয়। মে দিবসকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পহেলা মে’কে শিশু স্বাস্থ্য রক্ষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

আর ১৯৫৫ সালে দ্বাদশ পোপ পায়াস একইভাবে শ্রমিকের মে দিবসকে ভুলিয়ে দেবার জন্য পহেলা মে কে এক নতুন ধর্মীয় দিবস-সেন্ট জোসেফ দিবস হিসাবে ঘোষণা দিলেন এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যাসহ বললেন যে, শ্রেণী সংগ্রাম নয়, বরং শ্রেণী শান্তির উপরই জোর দেবে মে দিবস।

১৮৮৯ সালে শ্রমিক শ্রেণীর চার বীর নেতাকে ফাসি দেবার পরপরই মার্কিন বুর্জোয়া হে মার্কেট স্কোয়ারে  (যেখানে সংঘর্ষ ও শ্রমিক হত্যা হয়েছিল) সংঘর্ষে নিহত পুলিশের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি পুলিশ মূর্তিসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছিল। বলাই বাহুল্য এই স্তম্ভটি শ্রমিকদের ঘৃণার বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। তাই শেষ পর্যন্ত ১৯৭২ সালে কর্তৃপক্ষ মূর্তিটিকে ‘পুলিশ দফতরের নিরাপদ আঙিনায় স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হয়েছিল।’

১৯৭০ সালে ৩ মে তারিখে হে মার্কেট স্কোয়ারে শহীদ শ্রমিকদের স্মৃতিফলক বসানো হয়েছিল। কিন্তু আমেরিকায় ছয় মাসের মধ্যেই সেটাকে  উপড়ে ফেলা হয়েছিল।

এমনকি বিপ্লবের দেশ ও ‘গণতন্ত্রের’ দেশ ফ্রান্সেও ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত মে দিবস পালন নিষিদ্ধ ছিল।

বিংশ শতাব্দীতেই পৃথিবীর বহু দেশে মে দিবস পালিত হয়েছে সরকারের ও পুঁজিপতিদের প্রচন্ড আক্রমণকে মোকাবেলা করেই।

আট ঘন্টার শ্রম দিবস এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত (যদিও বাংলাদেশে তা কার্যকর নয়) এবং মে দিবসও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এটা শ্রমিক শ্রেণীর আংশিক বিজয় ছিল।

১৮৫৬ সালেই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার ২১ এপ্রিল তারিখে শ্রমিকরা আট ঘন্টা শ্রম দিবসের জন্য ধর্মঘট করেছিলেন। এটা বিস্ময়কর মনে হলেও সত্য যে, ১৮৬২ সালেই পরাধীন ভারতে প্রথম আট ঘন্টার শ্রম দিবসের দাবিতে রেল শ্রমিকরা ধর্মঘট করেছিলেন। এবং সেটা ঘটেছিল অবিভক্ত বাংলাদেশে। হাওড়ার বারোশত রেল শ্রমিক কয়েকদিন ধরে ধর্মঘট করেছিলেন। এবং সেই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল ‘সোমপ্রকাশ’ নামক একটি পত্রিকায়। এই পত্রিকার সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সম্পর্ক ছিল।

ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয়েছিল ১৯২৩ সালের পহেলা মে মাদ্রাজের সমুদ্র সৈকতে কমরেড চেট্টিয়ার সভাপতিত্বে। কমরেড চেট্টিয়া ছিলেন কানপুর ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী এবং তিনি কমরেড মোজাফফর আহমদের মতোই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার প্রথম যুগের নির্মাতা।