Home » প্রচ্ছদ কথা » কোনটা আগে : গণতন্ত্র না উন্নয়ন?

কোনটা আগে : গণতন্ত্র না উন্নয়ন?

তাজ হাশমী :::
‘‘বাংলাদেশ কেন প্রতিষ্ঠাতা পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা স্বৈরতন্ত্রের উদগাতা লি, মাহাথির বা অন্যদের অনুসরণ করবে’’
অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ
অবিশ্বাস্য, তবে সত্য। কিছু সংখ্যক মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রে উত্তরণের আগে প্রয়োজন ‘উন্নয়ন’! ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি : টাইম টু লুক টু দি ইস্ট’ শীর্ষক সা¤প্রতিক এক নিবন্ধে (ডেইলি স্টার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬) মোজাম্মেল খান যুক্তি দিয়েছেন, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন একজন লি কুয়ান বা মাহাথির মোহাম্মদের। কানাডার শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট হওয়া সত্তে¡ও মোজাম্মেল খানের যুক্তি ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা স্বৈরশাসনের পক্ষে আইয়ুব খান ও সুহার্তো যেসব কথা বললেন, ঠিক সে রকমের।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মোজাম্মেল খানের মনগড়া ছবিটির ব্যাপারে আমার ভিন্নমতকে এখানে না টেনে আমি কেবল তার নিবন্ধের প্রধান বিষয়টার দিকে মনোনিবেশন করতে চাই, যাতে বলা হয়েছে : ‘… পাশ্চাত্যের উদার গণতান্ত্রিক-ব্যবস্থার বদলে উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রাচ্যের নীতি গ্রহণ করার এটাই সম্ভবত সঠিক সময়। এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুর। এই উভয় দেশই গত ৫০ বছরে দৃষ্টান্তমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।’
আমার মনে হয় না, পৃথিবীতে কোনো দেশের উচিত নয়, তথাকথিত উন্নয়নের জন্য মানবাধিকার, মানব-মর্যাদা, গণতন্ত্র এবং সর্বোপরি স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দেওয়া। আমি উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন নিয়ে আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক, হামজা আলাভি এবং ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইনের (এছাড়া আরো অনেকে রয়েছেন) মতো মানুষেরা ১৯৭০-এর দশকে যে সমাধান দিয়ে ফেলেছেন, সে বিতর্কে যাচ্ছি না।
উপনিবেশবাদ এবং উপনিবেশ-পরবর্তী বৈশ্বিক পুঁজিবাদের আশ্রিত রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়ন মিথের সত্যিকারের যে স্বরূপ তারা উন্মোচন করেছেন, তা বিজ্ঞোজনোচিত। আমি মনে করি, যারা এখনো সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের উন্নয়নের তথাকথিত সাফল্যময় কাহিনীতে মুগ্ধ হয়ে আছেন, তাদের উচিত আবার গুন্ডার ফ্রাঙ্কের ‘ডেভেলপমেন্ট অব আন্ডারডেভেলপমেন্ট’, ওয়ালেস্টেইনের ‘অ্যান্টি-সিস্টেমেটিক মুভমেন্টস, থিসিস এবং আলাভির ‘দি স্টেট ইন পোস্ট-কলোনিয়াল সোসাইটিস : পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ’-এর দিকে মনোনিবেশন করা।
দশ বছর আমি সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আধুনিক এশিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাস পড়িয়েছি। প্রায় দুর্নীতিহীন সরকার-ব্যবস্থা, চমৎকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি; চলনসই খাবার, বাসস্থান, স্বাস্থ্যপরিচর্যা, শিক্ষা ও মেট্রোরেল; ‘সর্বোত্তম এয়ারলাইন’ এবং ‘সর্বোত্তম বিমানবন্দর’-সংবলিত পুরোপুরি পরিষ্কার, সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল নগর রাষ্ট্রটি কখনোই আমাকে এই ধারণা দিতে পারেনি যে, আমি উন্নত কোনো দেশে বাস করছি। সিঙ্গাপুর কিন্তু উন্নয়নের বিবেচনায় আরেকটি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড কিংবা পশ্চিম ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার কোনো দেশ নয়।
নির্মম ‘ইন্টারন্যাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের’ মাধ্যমে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যেকোনো মানুষকে বিচার ছাড়াই অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত কারাগারে রাখা যায়। দেশি-বিদেশী সস্তা শ্রমিক শোষণ, লুকানো-ছাপানোহীন দারিদ্র এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মানব-মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধার অভাব সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াকে উপসাগরীয় এলাকার আরব স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর সমান্তরালে নিয়ে গেছে। এসব উন্নত নয়, বাংলাদেশের জন্য রোল মডেল হওয়ার মতো তো নয়ই।
মাহাথিরের শাসন ছিল লি কুয়ান ইয়েয়ুর মতোই স্বৈরতান্ত্রিক। জনৈক লেখক বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন : ‘… তার [মাহাথিরের] ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হওয়াটা ঘটেছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মালয়েশিয়ার রাজার ঐতিহ্যবাহী ক্ষমতা ও সুবিধার বিনিময়ে। তিনি বিতর্কিত ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ব্যবহার করেছেন অ্যাক্টিভিস্ট, অ-মূলধারার ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের, ১৯৯৮ সালে বরখাস্ত করা উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমসহ, আটক করার কাজে।’
গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নিয়ে লি কুয়ানের যে ধারণা ড. খান উদ্ধৃত করেছেন, তার চেয়ে অসার আর কিছু হতে পারে না। লি মনে করতেন, ‘গণতন্ত্র বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা উন্নয়নের জন্য প্রতিবন্ধক।’ তিনি আরেক সুকর্ন বা আইয়ুব খানের ভাষায় কথা বলতেন :
কোনো রাজনৈতিক-ব্যবস্থার মূল্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা হলো সেটা প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে সমাজকে সহায়তা করতে পারে কি না। গণতন্ত্র হলো কাজটি সম্পন্ন করার একটি পন্থা, তবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনী-প্রক্রিয়া যদি আরো বেশি ফল দেয়, তবে আমি উদার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। কোনো প্রক্রিয়া বাছাই করার মধ্যে ন্যায়-অন্যায় নেই।… গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো অপরিহার্য মূল্যবোধ নেই। আসল বিষয় হলো সুশাসন।
লি ও মাহাথির উভয়ে বিশ্বাস করতেন, শাসন পরিচালনাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ’ থেকে ‘এশিয়ার মূল্যবোধ’ ভিন্ন ও উন্নত। ‘গণতন্ত্রের আগে উন্নয়ন’ পরিভাষাটি আসলে স্বৈরাচারেরই নামান্তর, গৌরব ও ক্ষমতার জন্য স্বৈরাচারের অদম্য আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করার একটি গোপন হাতিয়ার।
তবে আমরা ‘উন্নয়ন’ বলতে কোনো দেশের কয়েকটি উঁচু ভবন ও ফ্লাইওভার; মসৃণ রাস্তার দৈর্ঘ্য; গণপরিবহন নেটওয়ার্ক; ঝলমলে গাড়ির সংখ্যা বুঝি না। সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন বলতে বোঝায় আমাদের মনন ও সংস্কৃতির বিকাশ। উন্নত দেশে জনগণ কোনো ধরনের ভয়-ভীতি ছাড়াই চিন্তা করতে পারে; অভিমত প্রকাশ করতে পারে; সরকার মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে; জাতি-বর্ণ-ধর্ম-জেন্ডার-নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। আর কেবল সত্যিকারের গণতন্ত্রই আইনের শাসন এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানবাধিকারকে সুরক্ষিত করে।
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার সিকি শতক পরও আজ এখনো যারা গণতন্ত্রকে বিশেষ কিছু হিসেবে মনে না করেন এবং বেসামরিক-সামরিক একনায়কদেরকে নির্বাচিত সরকারের মতোই বৈধ বিবেচনা করেন, তারা স্রেফ জানেন না, পরিবর্তনের হাওয়া (গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য) সবজায়গায় জোরালো হচ্ছে, এমনকি আরব দুনিয়াতেও। বাংলাদেশ এবং অন্য যেকোনো স্থানেই লি ও মাহাথিরের ‘সোনালি অতীতে’ ফিরে যাওয়ায় অনেক দেরি হয়ে গেছে। অতীতে বিদ্যমান মার্কসের প্রবাদসম ‘প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রকে’ আর কেউই টিকে রাখতে পারবে না, যদিও মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে তাদের অস্তিত্ব রয়েছে।
অবশ্য ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা নিরঙ্কুশ স্বৈরতন্ত্রের, স্নায়ুযুদ্ধকালে তাদের কেউ ছিল পাশ্চাত্যপন্থী এবং কেউ পাশ্চাত্যবিরোধী, প্রতি সাফাই গাওয়ার দিন দ্রæত শেষ হয়ে আসছে। ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, মিসর, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও ইমেয়েনের মতো অনেক দেশে এ ধরনের সরকার ইতোমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আরো কয়েকটি কোনোমতে টিকে থাকার কোশেশ করছে। মস্কো ও বেইজিং তাদের দুর্বৃত্ত ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোকে সমর্থন করে গেলেও ওয়াশিংটন দ্রæততার সাথে তাদের ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
উদার গণতন্ত্র উন্নয়নের প্রতিবন্ধক নয়, বরং গণতন্ত্রই উন্নয়ন। এটা হলো মানুষের অর্জন ও উন্নয়নের সারকথা, এটা ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো উদার গণতন্ত্র। শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাস-প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সন্ত্রাসবাদ উত্থানের পেছনে প্রধান কারণগুলো হচ্ছে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মানব-মর্যাদা ইত্যাদি অস্বীকার করা। উত্তাল বাংলাদেশ পুরোপুরি উদার গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হওয়ার আগে ছলনাময়ী ‘উন্নয়নের’ জন্য অপেক্ষা করতে পারে না।
শেষ তবে সর্বশেষ কথা নয়। পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের নেতা নির্বাচনে বাঙালিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করার ফলেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটেছিল। বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের প্রধান কারণ গণতন্ত্র হওয়ায় অবাকই লাগতে পারে, দেশটি কেন জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াইকারী এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সাথে আপস করতে অস্বীকারকারী তার নিজের প্রতিষ্ঠাতা পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা স্বৈরতন্ত্রের উদগাতা লি, মাহাথির বা অন্যদের অনুসরণ করবে। মুজিব যদি তার জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে অসম্মানিত করতেন, তবে আমাদের ইতিহাস হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন তা গৌরবের কিংবা গর্বের বিষয় হতো না।
*লেখক Austin Peay State University –এর সিকিরিটি স্টাডিজের শিক্ষক। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে Global Jihad and America: The Hundred-Year War Beyond Iraq and Afghanistan (Sage, 2014)|