Home » শিল্প-সংস্কৃতি » নজরদারির নামে নাগরিক স্বাধীনতাহরণ : প্রামাণ্যছবি ‘সিটিজেন ফোর’

নজরদারির নামে নাগরিক স্বাধীনতাহরণ : প্রামাণ্যছবি ‘সিটিজেন ফোর’

ফ্লোরা সরকার ::
২০০৬ সালে ইরাক যুদ্ধ ভিত্তিক ছবি “মাই কানট্রি মাই কানট্রি” নির্মিত হবার পর থেকেই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা লরা পোয়েট্রাস আমেরিকান সরকারের নজরে চলে আসেন। তার প্রতিটি কাজ-কর্ম, চলাফেরার উপর শুধু নজরদারিই করা হয়না সেই সঙ্গে ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্য ৫১ বছর বয়সি এই নির্মাতাকে ৫০ বারেরও বেশি বিভিন্ন সময়ে দেশের সীমানায় ঘন্টার পর ঘন্ট আটকে রাখা হয়। এমনকি তাকে “ নো ফ্লাই ” তালিকায়ও অন্তুর্ভূক্ত করা হয় এবং সর্বশেষ উকিলিক্সের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের উপর যখন প্রামাণ্য ছবি নির্মাণ করছিলেন তখন তার কাছে রাখা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ৪১ দিন পর্যন্ত আটকে রাখা হয় এবং কোনো নোট নেয়া হলে তাকে সোজা হ্যান্ডকাফ পরানো হবে বলে শাসিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এতসব ঘটনার পরেও ২০১৪ সালে মুক্তি পায় লরা পোয়েট্রাসের প্রামাণ্যছবি “ সিটিজেন ফোর ”; ২০১৫ সালে যে ছবি অস্কারে ভূষিত হয়। যে ছবির নায়ক, আমেরিকা তথা পুরো বিশ্বের বিশেষ করে যেসব দেশ অগনতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারি শাসক দ্বার শাসিত তাদের জন্যে রীতিমতো এক আতঙ্কের নাম – তিনি আর কেউ নন প্রাক্তন এন.এস.এ. ( ন্যাশানাল সিকিউরিটি এজেন্সি ) কর্মকর্ত, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ এবং “হুইসেল ব্লোয়ার” বা কারো কারো ভাষায় কুখ্যাত- এডওয়ার্ড স্নোডেন।
ছবির শুরুতে ধারাভাষ্যের মধ্য দিয়ে আমরা জানতে পারি, ৯/১১-র পট পরিবর্তনের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিচালক পোয়েট্রাস একের পর এক ধারাবাহিক আকারে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে গেছেন। ২০১৩র শুরুতে স্নোডেন “ সিটিজেন ফোর ” ছদ্ম নাম ব্যবহার করে পোয়েট্রাসকে ই-মেইল করেন। তার পরের দৃশ্যেই আমরা দেখি গার্ডিয়ানের জাদরেল সাংবাদিক ও লেখক গ্লেন গ্রিনওয়াল্ড তার ব্রাজিলের বাড়িতে ই-মেইলে যোগাযোগ করছে কারো সঙ্গে, পর্দায় লেখা ভেসে ওঠে- “এখন থেকে তুমি জানবে, যত সীমান্ত তুমি পার হও, যা কিছু কেনা-কাটা করো, যতগুলো টেলিফোন কল তুমি করো, যতগুলো সেলফোন টাওয়ার তুমি পার হও, যত বন্ধু তোমার আছে, যা কিছু তুমি লেখো প্রবন্ধ, নিবন্ধ ইত্যাদি, ইন্টারনেটের যেসব সাইটে তুমি চলাফেরা করো, যেসব বিষয়ের খোঁজ-খবর সেখানে তুমি রাখো- সব জায়গায় চলাফেরা করার দরজা তোমার অবারিত ভাবে খোলা, তবে সেসব জায়গার কোনোটারই পাহাদার তুমি নও। পাহাদার থাকেন আড়ালে।” আমরা বুঝে যাই, রাষ্ট্রের খবরদারি করার জায়গাগুলো কতটাই বিস্তারিত। রাষ্ট্রের এসব খবরদারি আগেও ছিলো। কিন্তু ইন্টানেটের আবিষ্কার নজরদারির এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। নেটের ফাঁক দিয়ে কোনো নাগরিকের পক্ষে রাষ্ট্রকে ফাঁকি দেয়াও আজ সম্ভব না।
এরপরেই পরিচালক আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন, এই যুগের সব থেকে আলোচিত-সমালোচিত “ রাষ্ট্রীয় নজরদারির” উদ্ভাবক, প্ররোচক বা উপযাচক যে নামেই অভিহিত করিনা কেনো, সে এন.এস.এ.র গুপ্ত-গণিতবীদ সেই উইলিয়াম বিনের সঙ্গে। ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় যিনি নিউক্লিয়ার সন্ত্রাস আবিষ্কার করেছিলেন, ’৯০ এর দশকে সেই বিষয় থেকে সরে এসে ইন্টারনেটের উন্নয়নের পাশাপাশি ডাক বিশ্লেষণ, যা মূলত খবরদারির অপর নাম- সেই কাজে মনোনিবেশ করেন। বিন স্বীকার করেন, ৯/১১-র পর তাদের নজরদারির পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু কতটা বেড়েছে ছবির শুরুতে আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারিনা। ছবি যত এগিয়ে যায়, আমাদের চোখের সামনে থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে একের পর এক পর্দায় উন্মোচিত হতে থাকে। ইতিমধ্যে ভিডিও ফুটেজে প্রশ্ন-উত্তরের মধ্য দিয়ে আমরা দেখি, এন.এস.এ.র কর্মকর্তাদের একের পর এক মিথ্যাচার। যেমন-
প্রশ্ন : এন.এস.এ. কি নজরদারি করে ?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : এন.এস.এ. কি মেইল, সেলফোন এসব চেক করে ?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : এন.এস.এ. কি গুগুলসহ অন্যান্য নেটওয়ার্ক নজরবন্দী করে ?
উত্তর : না।
অন্যদিকে বারাক ওবামা’র ভিডিও ফুটেজে আমরা দেখি, সংসদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সীমাবদ্ধ ক্ষমতার কথা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নাগরিক ভাষণে ওবামা বলছেন। এমন ভাবে বলেন, যেন, দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের একক কোনো ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টেরও নেই (ঠিক তখন আমাদের অজান্তেই ইরাক আক্রমণের প্রাক্কালে জর্জ ডব্লিউ বুশের চেহারাটা ভেসে ওঠে)। এন.এস.এর.র মিথ্যাচার, ওবামা’র কথাবার্তা আমাদের কাছে ছবি কিছুদূর যাবার পরেই দিনের মতো পরিস্কার হয়ে যায়, যখন পোয়েট্রাস এবং গ্রিনওয়াল্ড, হংকং এ আশ্রয়রত স্নোডেনের হোটেলে গিয়ে উপস্থিত হন। অত্যন্ত সাদামাটা সাক্ষাতকারের মধ্য দিয়ে পোয়েট্রাস, স্নোডেনের ছোট্ট হোটেলের রুমে চার/পাঁচ দিনের শুটিং এর মধ্য দিয়ে তার প্রামাণ্যচিত্রের শুটিং পর্ব শেষ করেন। স্নোডেন তার সাক্ষাতকারে বলেন, “ এন.এস.এ. তে যোগদানের পর থেকেই ‘স্টেট পাওয়ার ’ বা ‘ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ’ নামক বিষয়টার গভীরে আমি যেতে থাকি; এবং যতই যেতে থাকি ততই সকিছু আমাকে বিস্ময়ে হতবাক করার পাশাপাশি ভাবিয়ে তোলে। ওবামার দেয়া ভাষণগুলো আমাকে ক্রমেই বিরক্ত করে তোলে —- একবার ভাবুন তো, দেশে এমন একটা সংস্থা আছে ( এখানে স্নোডেন এন.এস.এ.র কথাই বলছেন), যে সংস্থাটা আপনার ই-মেইল আইডি, ফোন নম্বর এমনকি পাসওয়ার্ডের খবর পর্যন্ত রাখে। আপনার বউ আপনাকে বা আপনি আপনার বউকে যেসব চিঠি লিখেন তা যদি অন্য কেউ পড়ে ফেলে, কেমন লাগবে? এই সমস্যাগুলো শুধু আমার একার না, পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের, সব নাগরিকের সমস্যা।”
নজরদারির বিষয়টা যে কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে, ছবির গতি আরেকটু এগিয়ে গেলেই আমরা বুঝতে পারি। ধারাভাষ্যে পরিচালক আমাদের জানান, চার-পাঁচদিন শুটিং এর পরেই, তারা সবাই বুঝতে পারেন, সেখানেও তাদের পেছনে লোক লাগানো হয়ে গেছে। তারা তখন তড়িঘড়ি শুটিং গুটিয়ে নেয়। স্নোডেনকে মস্কো পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন হংকং-এরই একজন মানবাধিকার কর্মী। অন্যদিকে, পোয়েট্রাস জার্মানিতে এবং গ্রিনওয়াল্ড ব্রাজিলে চলে যান। ছবিতে আমরা দেখি ব্রাজিলে গিয়ে গ্রিনওয়াল্ড সংবাদ সম্মেলন করে স্নোডেনের কাছ থেকে পাওয়া সব তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ ভয়াবহ এক ভাষণ দেন। সেই ভাষণের মধ্য দিয়ে গ্রিনওয়াল্ড বুঝিয়ে দেন, রাষ্ট্র (আমেরিকা) কীভাবে দিনের পর দিন, প্রতিনিয়ত পৃথিবীর সব দেশের বিভিন্ন নাগরিকের উপর গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত সব তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেসব দেশের পুরো পরিস্থিতি ( রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি ) নিজের হাতের মুঠোর মধ্য নিয়ে আসে। প্রতিটা ওয়েবসাইটের গুগুল থেকে শুরু করে ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার সহ সব ধরণের নেটযুক্ত যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর উপর কড়া নজরদারি করে রাখে। তবে গ্রিনওয়াল্ড এই পর্যন্ত বলে আরেকটা মজার কথা আমাদের জানান; আর তা হলো-আমেরিকান কোনো নাগরিকের উপর এই নজরদারির জন্যে সেই দেশের কোর্টের অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু পৃথিবীর আর কোনো দেশের জন্যে কোনো ধরণের অনুমতির ধার ধারতে হয়না। গ্রিনওয়াল্ড এসব নজরদারির যৌক্তিক জায়গাটা খুব ভালো করে ধরতে পেরেছেন। তার মতে, একমাত্র গণতন্ত্রহীন শাসকই নাগরিকের সব তথ্য সংগ্রহে রাখে।
ছবির একেবারে শেষে দেখা যায়, গ্রিনওয়াল্ডের সাথে স্নোডেনের আবার দেখা হয় মস্কোতে। গ্রিন কতগুলো নাম কাগজে লেখার পর স্নোডেনকে দেখিয়ে আবার সেগুলো ছিড়ে ফেলে। সেই ছেড়া কাগজগুলোর উপর ক্যামেরার ক্লোজ জুমের মধ্য দিয়ে ছবির সমাপ্তি ঘটে। দর্শক বুঝে যান, বর্তমান তথ্য প্রবাহের এই অবাধগতির মালিকানা একমাত্র রাষ্ট্র; কাজেই গোপন কোনো কথা কোনো জায়গা এমনকি কাগজে লিখেও রাখাও বিপদজ্জনক। তবে ছবির আলোচনা প্রসঙ্গে চিত্রসমালোচক গডফ্রে চেশাইযার দৃষ্টি কাড়ার মতো একটা কথা বলেছেন, “ আমি বলছিনা স্নোডেন কোনো নায়কোচিত কোনো কাজ করেছেন, কিন্তু তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের ক্ষেত্রে আমেরিকান কংগ্রেসের কাউকে কিছু বলতে দেখলাম না, সহায়তা দূরে থাক। এমনকি খোদ ব্রাজিল বা জার্মানিও তাকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিষয়ে কোনো ধরণের আগ্রহ দেখায়নি।” ছবিটা দেখার পর আমাদেরকে আধুনিক গণতন্ত্র নিয়ে আবার ভাবিয়ে তোলে। তাহলে গণতন্ত্র বলতে আমরা কি এটাই বুঝবো যে রাষ্ট্রের যথেচ্ছাচার ; তাও আবার নজরদারির? কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তার অবস্থা হয় স্নোডেন, জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ, পোয়েট্রাস এর মতো ? যদি তাও হয়ে থাকে, তারপরেও স্নোডেনের মতো মানুষদের তো দমিয়ে রাখা যাচ্ছেনা। একজন স্নোেডেনকে দমালে আরও দশটা স্নোডেন বিশ্বের কোথাও না কোথাও উঠে আসে। কাজেই নজরদারির নামে নাগরিকের স্বাধীনতা হরণ করা সম্ভব না কোনভাবেই; সম্ভব হয়না মুক্তচিন্তা, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা বন্ধ করা। অরাষ্ট্রীয় কোন সহিংস সংগঠনও এটা কখনই পারেনা, পারেনাই। কারণ, নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ হলে, খোদ স্বাধীনতাই হরণ হয়ে যায়।