Home » বিশেষ নিবন্ধ » জঙ্গী আছে, জঙ্গী নেই, আইএস আছে, আইএস নেই

জঙ্গী আছে, জঙ্গী নেই, আইএস আছে, আইএস নেই

শাহাদত হোসেন বাচ্চু::

…আমি এই দেখিলাম সোনার ছবি, আবার দেখি নাইরে, নদীর কূল নাই…। মরমী শিল্পী আব্দুল আলীমের কালজয়ী এই গানটি নিষ্ঠুরভাবে ফিরে এসেছে আজকের বাংলাদেশে। কান পাতুন, চোখ খোলা রাখুন, শুনবেন-দেখবেন, জঙ্গী আছে, জঙ্গী নেই, আইএস আছে, আইএস নেই। আল-কায়েদা আছে, আল-কায়েদা নেই। এসব বিতর্কের কূটচালের মাঝে চাপাতির খুন অব্যাহত রয়েছে। সময়ের সেরা মানুষগুলো একের পর এক খুন হয়ে যাচ্ছে। অসহায় পরিবারগুলো বিচার পাচ্ছে না। রাষ্ট্র-সমাজে ভয়-আতঙ্কের বাত্যাবরণে জঙ্গী থাকা না থাকার কূটতর্ক এখন আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছে।

এদেশে জঙ্গীবাদের চাষাবাদ শুরু হয় আফগানিস্তানে তালেবানদের হাতে সোভিয়েতদের পতনের পর। তালেবানদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহন করা পাঁচ সহস্রাধিক বাংলাদেশী যুবক দেশে ফিরে আসার পর আফগান ষ্টাইলে বিল্পবের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তখন দেশে সিভিল আদলে সামরিক সরকার। পাকিস্তানী সামরিক শাসক জিয়াউল হকের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (আইএসআই) প্রত্যক্ষ সহায়তায় তালেবানরা প্রশিক্ষিত হয়েছিল। এরকম প্রশিক্ষিত বাঙালী যুবকরা দেশে ফিরে সে সময়ে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাধর অংশের সহায়তা লাভ করতে সমর্থ হয়েছিল।

জঙ্গীবাদ নিয়ে খেলা-ধূলা করা, নিয়ন্ত্রনে রাখা, অঙ্কুরে বিনাশ না করে বেড়ে উঠতে দেয়া- এগুলি রাষ্ট্রকে সামরিকীকরণের পাকিস্তানী কৌশল এবং অবশ্যই বুমেরাং কৌশল। জঙ্গীবাদ যেখানে সামরিক কিংবা বেসামরিক কতৃত্ববাদী শাসকের নিয়ন্ত্রনে বেড়ে উঠেছে, সেখানেই শক্তি সঞ্চয় করেছে। একসময় চলে গেছে নিয়ন্ত্রনের বাইরে। এই ফ্রাঙ্কেনষ্টাইনের দানবকে এখন চাইলেও নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে না। বিশ্বে পাকিস্তান এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ষাট দশকে মিলিটারি জান্তা ধর্মের ব্যবহারে যে অপরাজনীতির সূচনা করেছিল তা রাষ্ট্রটিকে এখন গ্রাস করে ফেলেছে।

তালেবান, আল-কায়েদা বা আইএস-এর মতাদর্শ ধারন করে এদেশে জঙ্গীবাদের চাষবাস হয়েছে। তাদের বিকাশের সোনালী সময়টি ছিল ২০০১-০৬ সময়ে যখন তারা সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে। এরপরে নির্মূল করার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতাসীনরা জঙ্গীবাদ জুজু’র ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে চেয়েছে। পূর্ববর্তী শিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা কাজে লাগেনি, যেসব দেশে এই কাজটি করা হয়েছে সেখানে জঙ্গীবাদ ভয়াল আকারে আবির্ভূত হয়ে রাষ্ট্রকে গিলে ফেলতে উদ্যত হয়েছে। এজন্য এখন সবচেয়ে জরুরী প্রশ্নটি হচ্ছে, বাংলাদেশ কি জঙ্গীবাদী খেলা-ধূলার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে?

‘‘বাংলাদেশে জঙ্গী আছে, বিএনপি-জামায়াত দেশকে জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিনত করতে চায়, আমরা ক্ষমতায় না থাকলে জঙ্গীরা ক্ষমতা দখল করবে’’- সরকারের এসব বক্তব্য কি বুমেরাং হয়ে উঠলো? এই বক্তব্যের বাস্তবতায় আইএস সমন্বয়ক, আল-কায়েদা সমন্বয়ক গ্রেফতারের খবর মিডিয়ায়ও ফলাও করে প্রচার হয়েছে। তখন কি সরকার বোঝেনি আইএস ইস্যুটি কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক বড় বড় কিছু শক্তি মুখিয়ে আছে? হত্যাকান্ডগুলির পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নানা নামে জঙ্গী সংগঠনের কথা বলছে, সরকারের শীর্ষ মহল বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করছে। এভাবে নিজেদের অপকৌশলে কার্যত: জড়াচ্ছে জালে- আইএস আছে কিংবা আইএস নেই।

জঙ্গীবাদ দমন ও বিনাশে সরকারের কোন সমন্বিত কর্মকৌশল আছে? সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবেলার পরিকল্পনা আছে? উল্টো কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতী ইসলামী নামে রহস্যময় এক সংগঠনের সাথে তাদের বর্তমান সম্পর্ক সকলেই জানে। ফলে জনমনের পারসেপশন হচ্ছে, সরকারের জঙ্গীবাদ দমনের বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এজন্য দেশীয় জঙ্গী সংগঠনগুলির সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গীদের অর্থাৎ আইএস-এর সাথে সম্পর্ক নিয়ে পরিস্থিতি ধোঁয়াশা রয়েছে। এসব নিয়ে ক্ষমতাসীনদের খন্ডিত আলোচনা ও সামগ্রিক বিশ্লেষণ না থাকার সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক শক্তি তার কর্মকৌশল বাস্তবায়নে খুবই তৎপর।

সরকার নিশ্চয়ই এগুলি জানছে। তারপরেও চটুল ও হাল্কা বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে যে, কূটনৈতিক মোকাবেলার ক্ষেত্রেও সরকার একই পথ বেছে নিয়েছে। হত্যাকান্ড ঘটছে, কথিত আইএস, আল-কায়েদা দায় স্বীকার করছে। সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে না বলছে। সরকারের এই বক্তব্য দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে না। বিশ্ব গণমাধ্যমে খবর হয়ে উঠছে বাংলাদেশের জঙ্গীবাদ। সিঙ্গাপুরে কয়েকজন বাংলাদেশী কর্মী  জঙ্গী হিসেবে সনাক্তের পর জাপান টাইমসসহ গণমাধ্যমগুলো শিরোনাম করেছে, “গভীর সংকটে বাংলাদেশ”।

অবশ্যই প্রশ্ন আসবে সরকার কেন দেশকে এরকম সংকটের মধ্যে নিয়ে গেল? যদিও সরকার কখনও স্বীকার করছে না দেশে কোন সংকট আছে। দাবী করছে সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রনে। এসব যে দাবী তার মীমাংসা রয়েছে, উন্নয়নকে গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর কৌশলের মাঝে। আর কে না জানে, উন্নয়নকে গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ তখনই করা হয়, যখন শাসকদের জনসমর্থন নিঃশেষ হতে থাকে। বিপুল জনসমর্থণ নিয়ে এসে ধরে না রাখতে পারলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সব তুরুপের তাস এক এক করে ব্যবহার করতে থাকে।

এখানেও তাই ঘটছে। এজন্য নানাবিধ আতঙ্ক- ছড়িয়ে সুষ্ঠ নির্বাচন নির্বাসনে পাঠিয়ে “উন্নয়ন না গণতন্ত্র”  তত্ত্ব সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। তর্কের খাতিরে যদি একমত হওয়া যায় যে, জঙ্গী দমনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এই প্রয়োজনে নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিকতা ধ্বংস করে আইনের শাসনহীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে? লুন্ঠন ও পাচারের স্থায়ী সংস্কৃতি কায়েম করতে হবে? ২০১৪ সালে যদি দেশ থেকে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে থাকে তার তদন্ত হয় না কেন? শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারী, ব্যাংক লুটসহ ইয়াবা পাচারের হোতারা ধরা পড়ে না কেন?  এ কারনেই কী বাঙালীর সবচেয়ে আবেগের জায়গা মুক্তিযুদ্ধ, জঙ্গী-সাম্প্রদায়িকতা দমন ও ধর্মকে নিয়ে একধরনের খেলা চলছে। আর এর শিকার হচ্ছে সেই মানুষগুলো যারা সমাজে বিবেক।

পৃথিবীর বেশকিছু দেশে জঙ্গীবাদ জুজু নামিয়ে সরকার জনগনকে বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে স্বাভাবিক রাজনীতি সংকুচিত করে কর্তৃত্ববাদী শাসনে সবকিছু নিয়ন্ত্রনে নেয়ার চেষ্টা হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসর সংকুচিত করে ভয়-আতঙ্ক ছড়িয়ে মানুষকে নিরাপত্তাহীন করে ফেলা হচ্ছে। ওইসব দেশে জঙ্গীবাদী প্রবণতা বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে এরকম একটি পরিস্থিতি চলছে নাকি তৈরী করা হচ্ছে- যা ক্রমশ: ঝুঁকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

অতি সা¤প্রতিক ঘটনাক্রমগুলি কিসের ইঙ্গিত দেয়? ২৫ এপ্রিল ২০১৬, নিহত হন সমকামীদের অধিকার বিষয়ক পত্রিকা সম্পাদক ও ইউএসএইড কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান, যিনি পূর্বতন রাষ্ট্রদূতের প্রটোকল অফিসার ছিলেন। সাথে নিহত হন তার বন্ধু মাহবুব তনয়। এটি ইসলামী জঙ্গীদের কাজ বলে মনে করা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তার সরকারের তরফে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সংসদে প্রধানমন্ত্রী এই হত্যাকান্ডকে জামায়াত-বিএনপির কাজ বলে দাবি করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইএস বাংলাদেশে ঘাঁটি গাড়তে পারেনি। ২৭ এপ্রিল তৎপর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। একই তারিখ সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গীবাদ নিয়ন্ত্রন সম্ভব হয়েছে। ২৮ এপ্রিল ওয়াশিংটনে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যান্টনী ক্লিনকেন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিকে জানান, বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটতে পারে। তার ভাষায়, “আইএস এর শেকড় গেড়ে বসার সম্ভাবনা আমাদের ভাবাচ্ছে”।

৩ মে ২০১৬, সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পুলিশের আইজি জানান, ২০১৩ থেকে তিন বছরে দেশে সংঘটিত ৩৭ টি জঙ্গী হামলায় ৯০% ঘটনার কারণ পুলিশ শনাক্ত করেছে। ৪ মে ২০১৬, বাংলাদেশ সফরে আসেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিশওয়াল। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশ পরিস্থিতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিবিড় দৃষ্টি ও জন কেরির উদ্বেগ থেকে এই ত্বরিত সফর। তার সফরের আগের দিন সিঙ্গাপুরে জঙ্গী সন্দেহে ৮ বাংলাদেশী আটক ও ৫ জনকে দেশে পাঠানোর খবর  মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। ৫ মে ২০১৬ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই দেশে জঙ্গী সন্ত্রাসবাদের কোন স্থান নেই। জঙ্গী সন্ত্রাসবাদ নিয়ে অনেকেই খেলতে চাইবেন। কিন্তু সেই খেলা আমি খেলতে দেব না”।

১২ মে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর। তিনি জানালেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনে ভারত ও বাংলাদেশ একসাথে কাজ করবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ বিরোধী লড়াইয়ে ভারতের জোরালো সমর্থনের কথাও তিনি জানান। বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একসাথে কাজ করবে- গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরের বিষয় তিনি ঢাকায় এসে জেনেছেন বলে সুশীল সমাজের সাথে বৈঠকে জানান।

এসব ঘটনা প্রবাহের গভীরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এবং কেউ কেউ এমনটা বিশ্বাসও করেন, জঙ্গীদের অস্ত্র ও সরঞ্জাম আসছে ক্ষমতাবান দেশগুলো থেকে। আবার জঙ্গী দমনে ক্রয় করা অস্ত্রের সরবরাহকারীও ঐসব দেশ। বিশ্বে সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলোর সামরিক বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র হচ্ছে এশিয়ার বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলি। যুক্তরাষ্ট্র ভারতে যে বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরী করছে সেখানে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে যৌথ উদ্যোগে সমরাস্ত্র উৎপাদন। এই অস্ত্রের বাজার হবে কোন কোন দেশ?

সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান “ষ্টকহোম ইন্টান্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনষ্টিটিউট” স¤প্রতি “ট্রেনডস ইন ইন্টারন্যাশনাল আর্মস ট্রান্সফারস ২০১৫” শিরোনামে গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। জানা যাচ্ছে ২০০৬-১০ সময়ের তুলনায় ২০১১-১৫ সালের সারা পৃথিবীতে সমরাস্ত্র সরবরাহ ১৪% বেড়েছে। ২০১১-১৫ সালে পৃথিবীর সমরাস্ত্র বাণিজ্যের ৭৪% ছিল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানীর। এরমধ্যে ৫৮% হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার। এদের নির্মিত অস্ত্রেই চলছে বিশ্বব্যাপী সহিংসতা, জঙ্গীবাদ ও জীবনহানি।

ক্রমশ: বিস্তৃত হচ্ছে সমরাস্ত্র বাণিজ্য এবং যুদ্ধবাজদের দুনিয়া। শুভবুদ্ধি ও মুক্তবুদ্ধির দুনিয়া সংকুচিত হয়ে পড়ছে দেশ-বিদেশে। নানা কিসিমের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মধ্যে দেশকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কর্তৃত্ববাদী ও একক শাসনে। নিজেদের জালে নিজেরাই আটকা পড়তে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক দুষ্টচক্রে। এ থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ক্রমশ: যেন দুর থেকে দুরাগত হয়ে যাচ্ছে!