Home » আন্তর্জাতিক » যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক চুক্তি : ভয় পাচ্ছে ভারত!

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক চুক্তি : ভয় পাচ্ছে ভারত!

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, (ফরেন পলিসি থেকে)

ভারত কি পিছু হটছে? সাম্প্রতিক সময়ের ওয়াশিংটন-নয়া দিল্লি ঘনিষ্ঠতা আরো উষ্ণ হয়ে ওঠেছিল গত এপ্রিলে। নয়া দিল্লি-তে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টারের সাথে আলোচনার পর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরিকর ‘কয়েক সপ্তাহের মধ্যে’ দুই দেশের মধ্যে ‘লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট’ নামে পারস্পরিক কৌশলগত ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের চুক্তি হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন। চুক্তিটির বিস্তারিত বিবরণ জানা না গেলেও কার্টারের কথায় বোঝা যাচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সশস্ত্র বাহিনী এখন থেকে ‘একসাথে আকাশ, স্থল ও সাগরে কাজ করবে, মানবিক সহায়তা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ত্রাণ সরবরাহ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করবে। ‘কৌশলগত পারস্পরিক ব্যবহার ও বিনিময়ে নীতিগতভাবে’ একমত হওয়ার মাধ্যমে দুই দেশ এ ধরনের মিশনে ‘আরো বেশি সক্রিয়’ হওয়ার সামর্থ্যও প্রদর্শন করবে।

এই চুক্তির বলে দুই দেশ একে অপরের স্থল, বিমান ও নৌ ঘাঁটিগুলো জ্বালানি সংগ্রহ, মেরামত ও বিশ্রামের কাজে ব্যবহার করতে পারবে বলে জানানো হয়েছিল।

চুক্তিটি নিয়ে ভারত সরকারের মধ্যে যে উৎসাহ দেখা গিয়েছিল, তাতে মনে কয়েছিল এটি চূড়ান্ত হতে বেশি সময় নেবে না। কিন্তু ‘কয়েক সপ্তাহ’ এখনো শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ভারতের মাটিতে মার্কিন সৈন্য অবতরণের কোনো চুক্তি তারা মেনে নেওয়া হবে না, মর্মে বিরোধীদের প্রবল আপত্তির কারণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার রাজনৈতিক চাপে পড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চুক্তিটি বেশ ভালোই মনে হবে। এর বলে দুই দেশ একসাথে চীনকে কোণঠাসা করার কাজটি আনায়াসে করতে পারত বলে মনে করা হচ্ছে তাদের দু’তরফেই। দুই দেশ কয়েক বছর ধরেই বিমানবাহী রণতরী তৈরিতে পারস্পরিক সহযোগিতা করছে; উপমহাদেশে জঙ্গিবিমান নির্মাণ নিয়ে শলা-পরামর্শে নিয়োজিত রয়েছে; গভীর সাগরে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ওই কৌশলগত চুক্তিটি হলে দুই দেশ আরো কাছাকাছি চলে আসতো বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে।

কৌশলগত দিক থেকে বিষয়টি ঠিক থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক বা সামরিক সম্পর্ক নিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্র-কাঠামোর ভেতর থেকে সমান ও বিপরীত চাপের সৃষ্টি হয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের প্রাধান্যের ব্যাপারে ভারত স্বাভাবিকভাবেই বেশ সতর্ক। এখানে অন্য কোনো শক্তির আনুগত্য মানতে সে ইচ্ছুক নয়। তাছাড়া স্নায়ুযুদ্ধের সময় জোট নিরপেক্ষ ব্লকে অবস্থান করায় এবং সেইসাথে সোভিয়েত ব্লকের প্রতি কিছুটা ঝুঁকে থাকায় তখন ওয়াশিংটনের সাথে নয়া দিল্লি বেশ ঝামেলাপূর্ণ সময় গেছে; আর সেই স্মৃতি এখনো ভারতীয়দের মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত যে কারণেই এখন পরস্পরের কাছাকাছি হোক না কেন, অতীতটা বিস্মৃত হতে সময় নেবেই। তাছাড়া চীনের বিষয়টিও রয়েছে। বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ঘনিষ্ঠ হওয়া মানে চীনের বৈরিতারই প্রকাশ বলে ধরে নেওয়া হয় ভারতের দিক থেকে। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের কঠোর অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, দেশটি অনেক পশ্চিমে মালাক্কাতেও হাত দিতে পারে। ভারত মহাসাগর নিয়ে চীনেরও রয়েছে উচ্চাভিলাষ।

চীন যাতে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, সেজন্যই জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং বারাক ওবামা উভয়েই নয়া দিল্লির সাথে কৌশলগত চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এটা করা গেলে টোকিও উপসাগর থেকে বাহরাইন পর্যন্ত একটি বেল্ট তৈরি করতে পারে ওয়াশিংটন। চীনও একই যুক্তিতে পাকিস্তানে গোয়াদরে একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে, জিবুতিতে নৌ স্থাপনা তৈরির কাজ শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত চুক্তির ব্যাপারে ভারতের পক্ষ থেকে আপত্তি আসছে প্রধানত দুটি বিষয়ে। এটা সামরিক চুক্তি হলেও ভারতীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা তাদের ঘাঁটিতে অবলীলায় ভারতীয় বাহিনীর প্রবেশাধিকার দিতে চাচ্ছে না। আরেকটি হলো, মার্কিন যুদ্ধে ভারতের যোগদান বাধ্যতামূলক না করা। কারণ বাধ্যবাধকতা থাকলে তার আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া প্রায় নিশ্চিত।

চীনের কাছ থেকেও কী চাপ আসছে? ভারত যদি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষ সুবিধা দেয়, তবে চীন সেটা কেন ভুলে থাকবে? তাছাড়া এখন তার একটা স্বতন্ত্র ভাবমূর্তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গাঁটছড়া বাঁধলে তা আর থাকবে না। আবার মস্কোর সাথেও নয়া দিল্লি সব সম্পর্ক শেষ করতে চায় না। তার সামরিক কার্যক্রমে রুশ সরঞ্জামের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি।

তবে ভারত সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত গ্রহণই করবে। তার আগে দেখতে চাইবে, চীন বেশ আগ্রাসী হয়ে ওঠছে কিনা। আন্দামানে চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতির মতো কিছু কিছু ঘটনা ভারতকে উদ্বিগ্ন করলেও সেটা এখন পর্যন্ত এমন পর্যায়ে যায়নি যে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যেতেই হবে। সম্ভবত এজন্যই তারা একটু অপেক্ষা করতে চাইছে।