Home » বিশেষ নিবন্ধ » তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব ১৩)

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব ১৩)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ::

৩০ মার্চ বিকেলে তাজউদ্দীন যখন সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন যখন তিনি শরণার্থী ছিলেন না, ছিলেন মুক্তিসংগ্রামী বাংলাদেশের প্রধান মুখপাত্র। ভারতের পক্ষ থেকে সেভাবেই তাঁকে গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে তিনি বিষন্ন বোধ করছিলেন। তার কারণ কেবল এটা নয় যে তিনি অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াচ্ছেন, কারণ এটাও যে জাতীয়তাবাদী একটি বিশ্বাসকে চূড়ান্তভাবে পরিত্যাগ করে আরেকটি বিশ্বাসের ভূমিতে পা রাখছিলেন। কিশোর বয়সে তিনি পাকিস্তানে বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশও নিয়েছেন; সে-রাষ্ট্রের ভিত্তিতে ছিল যে-জাতীয়তাবাদ তাকেই সত্য বলে জানতেন। সেই অবস্থান থেকে অবশ্য তিনি সরে আসা শুরু করেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে থেকেই। একাত্তরে এসে ধর্মভিত্তিক ওই জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন এক জাতীয়তাবাদের জগতে পৌছে গেছেন, সেটি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। একের মৃত্যুতে অপরের জন্ম; একদা যে আপনজন ছিল তার মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছেদের বোধ তৈরী করবে এটা অস্বাভাবিক নয়। ধারণা করা মোটেই অসঙ্গত নয় যে, সেটা সেদিন তাঁর বিষন্নতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

নতুন জাতীয়তাবাদ সামাজিকভাবে ইহজাগতিক, রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। সে সত্যটা প্রকাশ পেয়েছিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এপ্রিলের দশ তারিখে যে বেতার ভাষণটি তিনি দেন তার মধ্যে। আগের জাতীয়তাবাদে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ প্রতিফলিত ছিল, নতুন জাতীয়তাবাদে সংগ্রামটা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলের; এর প্রতিপক্ষ হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী পাকিস্তানী রাষ্ট্র। সে জন্য ভাষণটিতে তিনি বলেছিলেন, ‘‘এক মুহূর্তের জন্যও ভুললে চলবে না যে, এ যুদ্ধ গণযুদ্ধ […] এ যুদ্ধ বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের যুদ্ধ।’’ আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, রক্ত আর ঘামে ভেজা বাংলাদেশের মাটিতে গড়ে উঠবে নতুন এক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। সাতাশ তারিখ সকালে তাজউদ্দীন যখন ঢাকা ত্যাগ করেন তখন তাঁর বেশভূষা ছিল মধ্যবিত্তের; থলি হাতে মাথায় টুপি চাপিয়ে যিনি বাজারে বের হয়েছেন। সীমান্ত অতিক্রমের সময় তাঁর মুখে ছিল খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বেশভূষা কৃষকের। ওটি ছিল ভারত যদি সমর্থন না-দেয় তাহলে আত্মগোপন করে দেশের ভেতরে থেকেই যুদ্ধ চালাবার প্রস্তুতির অংশ। গণযুদ্ধ যে মূলত কৃষকের যুদ্ধই হবে এ-নিয়ে তাঁর মনে কিছু মাত্র সংশয় দেখা দেয়নি। কৃষক প্রশ্নে মওলানা ভাসানী এবং তাজউদ্দীন তখন এককাতারে।

ভারতের কাছ থেকে কোন ধরনের সাহায্য চান সেটাও তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতকারেই’ যেটি ঘটে দিল্লীতে, এপ্রিলে ৩ তারিখে। তিনি বলেছিলেন, ‘‘এটা আমাদের যুদ্ধ। আমরা চাই ভারত এটাতে জড়াবে না। আমরা চাই না ভারত তার সৈন্য দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে আমাদের স্বাধীন করে দিক।’’ ১০ এপ্রিলের বক্তৃতাতেও ওই একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত। তাতে বলা হয়েছিল, ‘‘বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের কাছে যে অস্ত্রসাহায্য আমরা চাইছি তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে একটি স্বাধীন দেশের মানুষ হিসাবে আর একটি স্বাধীন দেশের মানুষের জন্য। এই সাহায্য আমরা চাইছি শর্তহীন ভাবে এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি তাঁদের শুভেচ্ছা ও সহানুভূতির প্রতীক হিসেবে, হানাদারদের রুখে দাঁড়াবার এবং আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে যে অধিকার মানবজাতির শাশ্বত অধিকার…।’’ বাংলাদেশের ভেতরকার মানুষসহ প্রায় সবাই যখন বলাবলি করছিল ভারত কেন অতি দ্রæত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে আমাদেরকে উদ্ধার করার ব্যবস্থা করছে না, তাজউদ্দীন তখন সতর্ক ছিলেন যুদ্ধটা যাতে কিছুতেই ভারত-পাকিস্তানের চিরকালের বিবাদের নতুন বহির্প্রকাশ হিসাবে চিহ্নিত না হয়, পাকিস্তানের জন্য যেটা ঈপ্সিত ছিল। এও তাঁর দূরদর্শিতার প্রতিফলন।

যুদ্ধে শেখ মুজিব উপস্থিত ছিলেন না এটা সত্য, কিন্তু তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার সার্বক্ষণিক উৎস। অস্থায়ী বাংলাদেশের সরকারেরও তিনিই ছিলেন প্রধান। তাজউদ্দীন তাঁর ১০ এপ্রিলের বক্তৃতা করেছিলেন যে বাক্যটি দিয়ে সেটি হলো, ‘‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মুক্তি-পাগল গণ-মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদেরকে আমার সংগ্রামী অভিনন্দন জানাচ্ছি।’’ পঁচিশের রাত্রের পর দুই নেতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, সেই বিচ্ছিন্নতা যাতে স্থায়ী দূরত্বের রূপ নেয় সে-লক্ষ্যে একদিকে মোস্তাক ও তাঁর অনুসারীরা এবং অন্যদিকে মুজিববাহিনীর নেতারা অত্যন্ত তৎপর ছিলেন। মুজিবনগরে অবস্থানকালে তাজউদ্দীনের সতর্কতার জন্য তাঁরা সফল হন নি।

কিন্তু দূরত্বটা তৈরী হওয়া শুরু করলো ১০ জানুয়ারী তারিখে শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। এ ব্যাপারে মোস্তাকের চেষ্টার চাইতে অধিকতর ফলপ্রসূ হয়েছিল মুজিববাহিনীর চার নেতার কূটকৌশল। তাঁরা প্রথম সুযোগেই শেখ মুজিবের কান ভারী করেছেন। এস এ করিমের ইংরেজী বইটিতে যে-বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে তা এরকম : মুজিবের প্রত্যাবর্তনের পরের দিন খুব সকালে তাজউদ্দীন গেছেন তাঁর নেতার সঙ্গে দেখা করতে। গিয়ে দেখেন মুজিব তাঁর দিকে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কথা তাজউদ্দীনই শুরু করেন, তিনি বলেন, ‘‘আমি আশা করেছিলাম যে, ওই কঠিন সময়ে বিরূপ পরিবেশে স্বাধীনতার সংগ্রাম কীভাবে পরিচালনা করেছিলাম সে-বিষয়ে আপনি জানতে চাইবেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আপনি সেটা শুনতে আগ্রহী নন। কিন্তু দেশের স্বার্থে আপনার সঙ্গে একটি বিষয়ে আলাপ করা দরকার। সেটি হলো এই যে, মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র রয়ে গেছে। সেগুলো জমা দিতে আমি অনুরোধ করেছিলাম। তারা শোনে নি।’’ সব শুনে মুজিব নাকি বলেছিলেন, ‘‘ওনিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। আমার ছেলেরা অস্ত্র রেখেছে। আমি বললে সেগুলো তারা দিয়ে দেবে।’’ তাজউদ্দীন তখন বুঝে ফেলেছেন যে তিনি তাঁর নেতার আস্থা হারিয়েছেন। তাঁর সে-ধারণা সত্য প্রমাণিত হয়েছে যখন তাঁকে প্রথমে প্রধানমন্ত্রিত্ব ও পরে মন্ত্রিসভার সদস্যপদও ছেড়ে দিতে হয়। (চলবে)