Home » বিশেষ নিবন্ধ » তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব ১৪)

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব ১৪)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী::

তাজউদ্দীনের অনুপস্থিতিতে চার যুব নেতা মুজিবকে কী কী বুঝিয়েছিলেন সে-সম্পর্কে একটি ধারণাও বইটিতে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা বলেছেন তাজউদ্দীন ক্ষমতালোভী, সে জন্যই তিনি কারো সঙ্গে পরামর্শ না-করেই নিজেই নিজেকে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করে দিয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অমান্য করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যুবনেতাদেরকে তাঁদের কর্তব্য পালনের ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করবেন কী, তাজউদ্দীন নেতাদেরকে বিভক্ত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। তাজউদ্দীনের উচ্চাভিলাষ খুব বেশী, এবং তিনি চেষ্টা করবেন মুজিবকে প্রেসিডেন্টের পদে বসিয়ে সব ক্ষমতা নিজে কুক্ষিগত করতে। কাজেই তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়া দরকার। তাজউদ্দীন নেতাকে-প্রদত্ত তাঁদের এসব বক্তব্য ও পরামর্শের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতেন না। তবে নিশ্চয়ই তিনি অনুমান করেছিলেন যে যুবনেতারা যা বলেছে সে-সব কথা নেতার অপছন্দ হয়নি। নেতা হয়তো সেগুলোই শুনতে পাবেন বলে আশা করেছিলেন। ব্যাপারটা এক পাক্ষিক ছিল না, ছিল উভয়পাক্ষিক। তবু তাজউদ্দীন আশা করছিলেন যে, মুজিব হয়তো শিগগিরই তাঁর ভুল বুঝতে পারবেন। সেটা যখন ঘটলো না তখন তাঁর একজন হিতাকাঙ্খীকে তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই আমি যদি মারা যেতাম তাহলে সেটাই বরঞ্চ ভালো ছিল।’

এস. এ করিম মুজিবের সঙ্গে জিন্নাহর একটি তুলনামূলক চিত্র দিয়েছেন। তিনি দেখাচ্ছেন এঁরা দু’জনেই ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু দু’জনার মধ্যে পার্থক্য ছিল এখানে যে-জিন্নাহ সব ক্ষমতা নিজের হাতে ধরে রাখতে চাননি, মুজিব যেটা চেয়েছিলেন; ফলে ভীতিজনক দায়িত্বের এক বোঝা বহন করতে গিয়ে তিনি সংকটে পড়েছিলেন এবং দেখতে পাচ্ছিলেন যে, সব কাজেই তাঁর ব্যক্তিগত মনোযোগের দরকার পড়ছে।

কিন্তু কেবল যে অন্যদের কুমন্ত্রণাই মুজিব এবং তাঁর প্রধান অনুসারীর ভেতর ব্যবধান সৃষ্টির একমাত্র কারণ তা বোধ হয় নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরও পার্থক্য ছিল। প্রাথমিক ভাবে চারটি ব্যাপারে তা প্রকাশ পেয়েছিল। ১. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার; ২. মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে একটি জাতীয় মিলিশিয়া তৈরী’র প্রস্তাব; ৩. বিশ্বব্যাংকের সাহায্য গ্রহণ; এবং ৪. বাকশাল গঠন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে তাজউদ্দীনের সুস্পষ্ট আগ্রহ থাকা সত্তে¡ও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পাকিস্তানী হানাদারদের বিচার করাটা সহজ হবে না, তাই আপাতত তাদের দেশীয় দোসরদেরকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এক্ষেত্রে তাঁর চিন্তাধারাটি অনুসরণ করা দুঃসাধ্য নয়। তিনি ভাবছিলেন যে অতবড় অপরাধ করে কারো পক্ষেই পার পেয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রতিহিংসাপরায়ণতা নয়, ন্যায় বিচারের স্বার্থেই তাই দালালদের বিচার করাটা জরুরি। ওই রকম ভয়ংকর মাত্রায় অপরাধে যারা অভিযুক্ত তাদের যদি শাস্তি না হয় তাহলে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি দেশবাসীর আস্থাটাই দুর্বল হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত এটাও হয়তো তাঁর ধারণার মধ্যে ছিল যে, রাষ্ট্রের প্রকৃত শত্রু রা যদি চিহ্নিত না হয় তাহলে তারা পুনর্বাসিত হয়ে যাবে এবং শত্রু  খুঁজতে গিয়ে রাষ্ট্রের চোখ বামপন্থীদের ওপরই গিয়ে পড়বে। মূলত তাঁর আগ্রহেই ‘বাংলাদেশ দালাল আদেশ ১৯৭২’ প্রবর্তিত হয়েছিল। তাই ১৯৭৩ সালে যখন তাঁর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন, তাজউদ্দীন তখন হতাশ হয়েছিলেন। তাঁর মনে আশংকা তৈরী হয়েছিল যে এর ফলে হানাদারদের অনুচরেরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ১৯৭৪ সাল থেকেই তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলতে শুরু করেছিলেন, ‘তুমি বিধবা হতে চলেছ। মুজিব ভাই বাঁচবেন না, আমরাও কেউ বাঁচব না। দেশ চলে যাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে।’

মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে একটি জাতীয় মিলিশিয়া গঠনের উদ্যোগটিও ছিল তাজউদ্দীনের নিজের চিন্তা-প্রসূত। এ সম্পর্কে একটি সরকারী ঘোষণাও প্রকাশিত হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল যে, অর্থনীতির পুনর্গঠন ও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার দুরূহ কর্তব্য সম্পাদনের লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এ বাহিনীটি গঠিত হবে। কিন্তু ওই ঘোষণাটি কার্যকর করা হয়নি, তার বিপরীতে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল, যার অধিকাংশ সদস্যই এসেছিলেন মুজিববাহিনীর ধারাপ্রবাহ থেকে। পরবর্তীতে দেখা গেছে যে মুজিববাহিনীর মতোই রক্ষী বাহিনীরও প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বামপন্থীদেরকে নির্মূল করা। এতে করে আল বদর রাজাকারদের সুবিধা হয়েছে, তারা দম ফেলবার এবং ক্রমান্বয়ে পুনর্বাসিত ও সুসংগঠিত হবার সুযোগ পেয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেয়ার ব্যাপারে তাজউদ্দীন একেবারেই উৎসাহী ছিলেন না। প্রথমদিকে তিনি এমন ঘোষণাও দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ আমেরিকার কাছ থেকে কোনো প্রকার সাহায্য নেবে না। বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে তাঁর অনাগ্রহের একাধিক কারণ ছিল বলে আমরা ধারণা করতে পারি। প্রথমত বিশ্ব ব্যাংক মানেই আমেরিকা; ১৯৭২ সালে ওই ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রবার্ট ম্যাকনামারা, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসাবে ভিয়েতনামের যুদ্ধের স্থপতিদের যিনি ছিলেন পুরোধা; তাজউদ্দীনের পক্ষে তাই ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা ম্যাকনামারা অনুরাগী হবার কারণ ছিল না। অনাগ্রহের মূলে সম্ভবত অন্য দুটি কারণও ছিল। একটি হলো একাত্তরের যুদ্ধে আমেরিকার শত্রু তা। অপরটি বাংলাদেশ কারো তাবেদার হবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, তাজউদ্দীনের এই ঘোষিত নীতি; যাকে স্বপ্নও বলা চলে। (চলবে)