Home » আন্তর্জাতিক » মোদির দুই বছর : সার্বিক অসহিষ্ণুতার উত্থান

মোদির দুই বছর : সার্বিক অসহিষ্ণুতার উত্থান

এ জি নুরানি

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

দুই বছর আগে এই মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। সময়ের পরিক্রমায় অনিবার্যভাবেই ঔজ্জ্বল্য কমে যাবে তা ধরে নেওয়ার পরও  বলা যায়, ভারতে তার ভাবমূর্তি এখন কম আকষর্ণীয় ও আগের চেয়ে অনুজ্জ্বল। বিশেষ করে তাকে ‘কাজের লোক’ হিসেবে অভিহিতকারী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য এটা বিশেষভাবে সত্য।

ব্যাংকগুলো টালমাটাল অবস্থায় পড়ে গেছে; ঋণ-পরিশোধ – যা তারা কখনো দিত না, নামকা-ওয়াস্তে জবাবদিহিতার মাধ্যমে। রফতানি, শিল্প উৎপাদন ও কৃষি প্রবৃদ্ধিতে যে পতন হয়েছে তারাও নিজেদের কাহিনী বলছে; ঠিক যেভাবে কৃষকদের আত্মহত্যা বৃদ্ধির কথাও বলছেন তারা নিজেরাই। ক্ষমতাসীন বিজেপি উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। মোদি ‘কংগ্রেস-মুক্ত দেশ’ অভিযান শুরু করে এতে বিরোধীদলের সহযোগিতা আশা করছেন। অরুনাচল প্রদেশ ও উত্তরখন্ড নামের দুটি রাজ্যে বিজেপি এর মধ্যেই সবচেয়ে ভয়াবহভাবে এর শিকার হয়েছে।  গত বছর দিল্লি ও বিহারের নির্বাচনে বিজেপি বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম,কেরালা, তামিল নাড়– এবং কেন্দ্র শাসিত এলাকা পাদুচেরির (সাবেক ফরাসি উপনিবেশ পন্ডিচেরি) নির্বাচনে মিশ্র ফলাফল হয়েছে। তবে আসামে তারা ভালোই করেছে।

নির্বাচনী প্রচারকালের ভীতিকর বৈশিষ্ট্য ছিল নরেন্দ্র মোদির অভ্যাসগত সস্তা গলাবাজি, যা কোনো প্রধানমন্ত্রীর জন্য বেমানান।

তামিল নাড়–তে তিনি ইতালির সাথে দুর্নীতি-সংশ্লিষ্ট ‘আগস্তাওয়েস্টল্যান্ড’ হেলিকপ্টার চুক্তির কথা বলার সময় সোনিয়া গান্ধীর ইতালিয়ান কানেকশনের কথা বলেছেন, তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন ইউপিএ সরকার অপরাধী এবং কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী এর জন্য দায়ী। একই কায়দায় তিনি সংবাদপত্র, এনজিও, স্বায়াত্তশাসিত সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণ করেছেন। ঠিক একই সময় মোদি দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যাতে ইঙ্গিত দেয়, তিনি পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করতে চান। একজন তার গুজরাট আমল থেকেই তার আস্থায় রয়েছেন। তিনি হলেন অমিত শাহ, তাকে বিজেপির সভাপতি নিযুক্ত করা হয়েছে। তাকে জায়গামতোই বসানো হয়েছে। এল কে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশি, যশোবন্ত সিনহাদের মতো বর্ষীয়ানদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখেছেন।

অন্য পরিবর্তনটি ছিল মৌলিক প্রকৃতির। প্রধানমন্ত্রীর অফিসটিকে পরিণত করা হয়েছে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে। এর প্রধান একজন আমলার কাছ থেকে মন্ত্রীদের প্রাথমিক অনুমোদন নিতে হয়।

শপথ গ্রহণের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ভারত সরকারের প্রায় ৫০ জন সচিবের সাথে সাক্ষাত করেন মোদি। তার বার্তা ছিল : কোনো বিষয়ে তাদের সাথে মন্ত্রীদের ‘সংঘাত’ সৃষ্টি হলে তারা ‘সমাধানের’ জন্য বিষয়টিকে সাথে সাথে মোদির নজরে আনবেন। এটা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়িয়ে দেয়; মন্ত্রীদের ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও মনোবল কমিয়ে দেয়; মন্ত্রীদের প্রতি সংশ্লিষ্ট বেসামরিক কর্মকর্তাদের শ্রদ্ধা হ্রাস করে; এবং সংসদীয়-ব্যবস্থার জন্য ধ্বংস ডেকে আনে।

বৈদেশিক ব্যাপারে মোদির কর্ম-সম্পাদন দক্ষতা বা এর অভাব প্রবলভাবে ফুটে ওঠেছে বিভিন্ন দেশে বিরামহীন সফরের মাধ্যমে এই দিকে নজর আকর্ষণ করার মাধ্যমে। বহুল আলোচিত কাঠমান্ডু সফরের মাধ্যমে তিনি নেপালের সাথে সম্পর্ক ভালোভাবে সূচনা করেছিলেন। পাঁচ মাসের অবরোধ নেপালকে চীনের সমর্থন কামনা করার পথে চালিত করে। ৯ মে ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভারতির। তিনি এর মাত্র কয়েক দিন আগে সফরটি বাতিল করেন, তিন দিন আগে ভারতে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত দিপ কুমার উপাধ্যায়কে ডেকে নেওয়া হয়। শ্রীলঙ্কা আবার চীনের সাথে সুযোগ সুবিধা চাওয়া শুরু করেছে, যেসব বিষয়ে ভারত আপত্তি উত্থাপন করেছিল।

পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের দোলাচল সমর্থকদের পাশাপাশি সমালোচকদেরও হতবুদ্ধি করে দিচ্ছে। মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে রাইউইন্দে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাসায় আকস্মিক সফরের পরপরই এমন বিপর্যয় ঘটে, যা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে প্রায়ই দেখা যায়।

চীনের সাথে সম্পর্ক এখন মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময়ের চেয়েও খারাপ। সীমান্ত বিতর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ত্রু টিপূর্ণ। একইভাবে চীনে তার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘সম্প্রসারণবাদী’ হিসেবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রত্যাশাগত সংঘাত এবং এই সংঘাত পরে সৌহার্দ্যকে আক্রান্ত করতে পারে।

মাত্র একটি দিকেই নীতি পুরোপুরি পরিষ্কার দেখা যায়। সেটা হলো হিন্দুৎভা বা হিন্দুত্ববাদীতা। গত দুই বছরে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা বাড়তে দেখা গেছে; গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে; ঘর ওয়াপিসি (হিন্দুতে ধর্মান্তর) প্রকল্প ও ভিন্নমতকে চেপে ধরাটা ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। অসহিষ্ণুতার পরিবেশে বেড়েছে।

পরিস্থিতিটি বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় স্বাধীনতা-বিষয়ক মার্কিন কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ভালোভাবেই দেখা গেছে। ‘২০১৫ সালে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার অবনতি ঘটেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন বেড়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে খ্রিস্টান, মুসলিম ও শিখরা প্রধানত হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাতে ভীতি, হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছে বিপুলভাবে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যরা এসব গ্রুপকে নীরবে সমর্থন দিয়েছে এবং উত্তেজনা আরো বাড়াতে ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত ভাষা ব্যবহার করেছেন।’

‘এসব বিষয়, এবং সেইসাথে পুলিশের পক্ষপাতিত্ব এবং বিচারিক কার্যক্রমের অপর্যাপ্ততার কারণে পার পেয়ে যাওয়ার ব্যাপক সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো ক্রমবর্ধমান হারে অনিরাপদ অনুভব করছে, ধর্মীয় উদ্দীপনাপ্রসূত অপরাধের কোনো প্রতিবিধান হচ্ছে না।’ মোদি এসব ঘটনায় অর্থপূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করে চলেছেন।

(লেখক মুম্বাইভিত্তিক প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, লেখক ও আইনবিদ)