Home » বিশেষ নিবন্ধ » চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৪৩ : গ্রাম শহরের উৎপাদন সংস্থা

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৪৩ : গ্রাম শহরের উৎপাদন সংস্থা

আনু মুহাম্মদ ::

বিপ্লবের পর বিভিন্ন পর্যায়ে এই শহর ও গ্রামের সংস্থা (township and village enterprises) নামের উৎপাদনী প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছিলো। কমিউন যতোদিন চীনের রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রে ছিলো ততোদিন এই প্রতিষ্ঠানগুলো কমিউনের অংশ হিসেবেই পরিচালিত হতো। ১৯৭৮ সালের সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হবার পর থেকে এগুলো ক্রমে ভিন্ন চেহারা নিতে থাকে। বহুদিন পর্যন্ত মালিকানার ধরন প্রধানত যৌথই ছিল, তবে এর ব্যবস্থাপনা লক্ষ্য উদ্দেশ্য আগের চাইতে ভিন্ন ছিলো। এই পরিবর্তনের পর এসব সংস্থার সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে আগের তুলনায় দ্রুত। ১৯৭৮ নাগাদ এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান ছিলো প্রায় ৩ কোটি, ১৯৯৬ সালের মধ্যে এই সংখ্যা পৌঁছে যায় ১৪ কোটিতে। উৎপাদনের আর্থিক মূল্য আগে ছিলো ৪৯ বিলিয়ন ইউয়ান, তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ ট্রিলিয়নে। ৮০ দশকেই বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান জন্ম নেয়, এবং এগুলোর শতকরা ৫০ ভাগই প্রতিষ্ঠিত হয় প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল প্রদেশগুলোতে। এই প্রদেশগুলো হলো গুয়াংডন, ফুজিয়ান, ঝেজিয়াং জিয়াংসু এবং শানডং।[i] জিয়াংসু এবং শানডং-এর প্রতিষ্ঠানগুলো ছিলো বৃহত্তর।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো আইনত যৌথ মালিকানাধীন হলেও এগুলো কার্যতব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পথে একটি ধাপ হিসেবে কাজ করে। কাগজে পত্রে যৌথ মালিকানা ছিলো ঠিকই কিন্তু কর্তৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিকল্পনায় কমিউনের মতো সকলের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিলো না। এর সবটাই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার সহ আমলাতন্ত্রের হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিলো যা কার্যত ব্যক্তি মালিকানার একটা ধরনই প্রতিষ্ঠা করেছে। মুনাফা অর্জনকে মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান তাই ব্যক্তিমালিকাধীন প্রতিষ্ঠানের মতোই কাজ করেছে।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো ৯০ দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত বিকাশের পথে ছিলো কিন্তু এর পর থেকেই শুরু হয় সংকোচন এবং পতন। যেহেতু প্রথমদিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে নানারকম বিধিনিষেধ ছিলো, এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যথেষ্ট সমর্থন পেতো সেহেতু তার বিকাশ ছিলো অবধারিত। তাছাড়া স্থানীয় নেতা ও আমলাতন্ত্রের জন্যও বিত্ত ও ক্ষমতার জন্য এসব প্রতিষ্ঠান ছিলো খুবই অনুকূল। ১৯৯৫ সালের পর থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও কমে যায়। কোথাও কোথাও রাষ্ট্রীয় বৈরীতারও মুখে পড়ে এসব প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি সেসময় শুরু হয় ব্যাপক মাত্রায় প্রাইভেটাইজেশন। এই সময় থেকে ব্যক্তি ও বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি পক্ষপাত এবং যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কারণে এগুলো প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এক হিসাবে দেখা যায় শতকরা প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে যায়।[ii]  তারপরও বাজারমুখিতা বাড়ানোর জন্য এগুলোর পুনর্বিন্যাস করা হয় নানাভাবে। একে একে যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠান লুপ্ত হয় বা ব্যক্তি মালিকানায় চলে যায়। স্থানীয় কর্মকর্তারাই অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়ে বসে।

চীন সরকারের অনুমোদিত প্রকাশনাও এবিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে। ১৯৭৮/৭৯ সালে চীনে গ্রামীণ সংস্থা ছিলো প্রায় ১৫ লক্ষ, ১৯৯৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায়  ২ কোটি ২০ লাখ। ১৯৭৯ সালে শহর ও গ্রামের এসব প্রতিষ্ঠানে শতকরা ২১.৬৫ শহরে এবং শতকরা ৭৮.৩৫ ভাগ গ্রামে যৌথ মালিকানা বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় কাজ করতো। ১৯৯৫ সাল নাগাদ এই যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের শতকরা হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ১.৯১ এবং ৫.৪৫। অন্যদিকে একইসময়ে  গ্রাম শহরে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের শতকরা হার অনেক বেড়ে ৮৮.২৯-এ পৌঁছে যায়।[iii] তার মানে পুরো চিত্রটিই এই কয়বছরে বদলে যায়।

১৯৮৪ সালে, এই সংস্কার প্রক্রিয়ার শুরুর দিকে, আমার পর্যবেক্ষণ ছিলো এরকম: ‘কমিউন ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি অর্থনীতি শিল্পজ-কৃষি অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। অগ্রসর ব্যবস্থা-বৃহদায়তন সমষ্টিগত উৎপাদন প্রচলনের ফলে অবকাঠামোর উন্নয়নও অনেক সহজ হয়েছিল। বাঁধ নির্মাণ, খালখনন, ঘরবাড়ি নির্মাণ, জমির উন্নয়ন, দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়নে উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ইত্যাদি তখন সম্ভব হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক উদ্দীপনা ও কাঠামোর উপস্থিতির ফলেই। বর্তমানে ব্যক্তিগত ভিত্তিতে উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও তা একটি পর্যায়ে নতুন দ্ব›দ্ব সংকটে পড়তে বাধ্য। অবকাঠামো কিংবা ম্যাক্রো পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়নে এখন জনগণের কোন মাথাব্যথা থাকবে না। মুনাফা যেখানে প্রধান লক্ষ্য সেখানে দুর্নীতি, ফটকাবাজারী, কালোবাজারী ইত্যাদি প্রবণতারও বিকাশ ঘটবে। তাছাড়া সমষ্টিগত থেকে ব্যক্তিগত এবং বৃহদায়তন থেকে ক্ষুদ্রায়তন চাষাবাদের প্রবর্তন নি:সন্দেহে একটি পশ্চাদপসরণ, প্রায় ২৫ বছরে কৃষকদের মধ্যে গড়ে উঠা বিপ্লবী ও সমষ্টিগত চেতনাকে বিনষ্ট করবার একটি প্রক্রিয়া।’ [iv]

উৎপাদন কিছুটা নয়, উল্লেখযোগ্য মাত্রাতেই বেড়েছিলো। তবে এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিলো আগে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৫ এই সময়কালে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয় মালিকানাসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনও বেশ স্পষ্ট আকার নেয়।

—————————————————————————————-

[i]Barry Naughton: The Chinese Economy: Transitions and Growth. Cambridge: MIT Press, 2007.

[ii]TonySaich: Governance and Politics of China. New York: Palgrave, 2001.

[iii] Li Jingwen (chief editor): The Chinese Economy into the 21st Century, Foreign Language Press, Beijing, 2000.

[iv]আনু মুহাম্মদ: “চীনে সমাজতন্ত্র এবং শ্রেণী সংগ্রাম”, পূর্বোক্ত।