Home » বিশেষ নিবন্ধ » তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব ১৬)

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব ১৬)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ::

জাতীয় মুক্তির আকাঙ্খাতেই যুদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু আঞ্চলিক শোষণের অবসানের পরে শ্রেণীশোষণের অবসান যে মানুষ চাইবে সেটা তো ছিল খুবই স্বাভাবিক। জনমুক্তির এই স্বপ্নের কথা তাজউদ্দীন জানতেন, যে জন্য ঐ যুদ্ধসময়ে তাঁর প্রথম ভাষণেই যুদ্ধটিকে গণযুদ্ধ বলে অভিহিত করেছিলেন। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া যে শোষণমুক্তি সম্ভব নয়, এ বিষয়ে তাঁর অস্পষ্টতা ছিল না। স্বাধীনতার পরে ঢাকার সচিবালয় প্রাঙ্গণে সরকারী কর্মচারীদেরকে উদ্দেশ্য করে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতায় এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে এই কথাটি ছিল যে, ‘শহীদের রক্তে উর্বর মাটিতে উৎপন্ন ফসল ভোগ করবে চাষী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। কোনো শোষক, জালেম ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাংলাদেশকে শোষণ করতে পারবে না।

সরকারী কর্মচারীদের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর যে কথাটি বলার ছিল তা হলো, তাঁরা যেন এই সত্যটাকে ভুলে না যান যে, বিপ্লব সম্পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন হবে ‘সাম্যবাদী অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ কায়েম করা।’ প্রথমদিকে ওই তিন লক্ষ্যের বাস্তবায়নই ছিল রাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রেস-কোর্সে দেয়া বক্তৃতাতে শেখ মুজিবও গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই বলেছিলেন।

রাষ্ট্রীয় মূলনীতির তালিকায় জাতীয়তাবাদের সংযোজন ঘটে পরে, সংবিধান রচনার সময়ে। সংযোজনটি তাৎপর্যহীন নয়। ধারণা করা সম্ভব যে, অন্য তিনটি নীতির বাস্তবায়ন যেহেতু সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের বাস্তববাদিতায় তাই এই উপলব্ধিটি ধরা পড়েছিল যে জাতীয়তাবাদী অর্জনটা জনগণের কাছে তুলে ধরলে আপাত জনসন্তুষ্টির কারণ ঘটবে। জাতীয়তাবাদকে অন্তর্ভুক্ত করার দরুন অবশ্য সমস্যাও তৈরী হয়েছে। একটি শুরুতেই দেখা দিয়েছিল, সেটি হলো ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের অস্তিত্বের অস্বীকৃতি; পরে ঘটলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী তত্ত্বের উদ্ভব। ধারাবাহিকতাটি লক্ষ্য করবার মতো।

সবকিছু মিলিয়ে এটা নিশ্চিত যে, রাষ্ট্র জনগণের ঈপ্সিত মুক্তির দিকে এগোয়নি, বরঞ্চ উন্নতির পুরাতন ধারণার অবরোধের ভেতরই আটকে থেকেছে। এগুতে না-পারাটা পিছিয়ে যাওয়ারই প্রমাণ। আর ওই পিছিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেই একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ঘটেছে, যার মধ্যে প্রধান দুটি হচ্ছে প্রথমে বঙ্গবন্ধুর এবং পরে তাজউদ্দীনের হত্যাকান্ড। এমনটি যে ঘটবে তা ছিল দুঃস্বপ্নেরও অতীত।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড তাজউদ্দীনকে শোকে অভিভূত ও বিমূঢ় করে। তিনি জানতেন যে তাঁর জন্যও বিপদ আসবে। বিপদ আসতে যে বিলম্ব ঘটেছিল তাও নয়। শোনা যায় ঘাতকেরা তাঁকে রাষ্ট্রপতি বানাতে চেয়েছিল এবং সে-জন্য এক প্রকার মানসিক চাপও প্রয়োগ করতে থাকে। বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর বন্ধু ডা. করিম অবহিত ছিলেন। ব্যর্থ ও নিরাশ হয়ে তাজউদ্দীনকে ঘাতকেরা জেলখানায় নিয়ে যায়। সেটাই ছিল তাঁর শেষ যাত্রা। যে-আশংকা তাঁর মনে ছায়াপাত করেছিল, সেটি অত্যন্ত ভয়াবহরূপে সত্য বলে প্রমাণিত হয়ে গেল।

ডা. করিম লিখেছেন, ‘মুজিবমন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত তাজউদ্দীনকে আমি বহুবার বলেছি, দেশ ছেড়ে চলে যেতে, কিন্তু তাজউদ্দীন রাজি হয়নি। বলেছি অন্তত ভারতে যাও, সে-কথাতেও কান দেয়নি। বলত দেশের পরিবর্তন হবে, কৃষক শ্রমিক ক্ষমতা পাবে, আর সেই যুদ্ধে আমি না থাকলে কেমন হয়?’ (চলবে)