Home » প্রচ্ছদ কথা » কথিত ক্রসফায়ার নিয়ে নানা প্রশ্ন

কথিত ক্রসফায়ার নিয়ে নানা প্রশ্ন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

১৬০৫ খৃষ্টাব্দে স্প্যানিশ সাহিত্যিক মিগুয়েল দ্য সারভান্তেস রচিত ‘‘ডন কুইক্সোট অব লা মাঞ্চা’’ উপন্যাসের কথা মনে আছে! ব্যঙ্গ-রসাত্মক এই কাহিনীর প্রধান চরিত্র ডন কুইক্সোট কিভাবে কল্পিত শত্রুর  বিরুদ্ধে হামলে পড়েছিলেন এবং সহচর ও প্রতিবেশি সাংকো পাঞ্জাকে নিয়ে হাওয়ায় তরবারি ঘুরিয়ে কচুকাটা করছিলেন শত্রুদের, উইন্ডমিলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলেন। উইন্ডমিল শব্দটির ব্যাখ্যা গুগল সার্চ এঞ্জিনে পাওয়া গেছে এভাবে; …Tilting at windmills is an English idiom which means attacking imaginary enemies… The phrase is sometimes used to describe confrontations where adversaries are incorrectly perceived, or course of action that are based on misinterpreted or misapplied heroic, romantic or idealistic justifications…    সম্প্রতি বিবিসি বাংলা প্রবাহ ‘প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে বিশেষ অভিযান চালানো’র বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে পুলিশের আইজি উত্তরে বলেন, পুলিশের অনেক কৌশল থাকে। তাদের গোপন অভিযান সারা বছর চলতে থাকে। মাঝে-মধ্যে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েও অভিযান চালানো হয় (চ্যানেল আই ১৭ জুন শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টা)। সাংবাদিক পরিচয়ে শফিক রেহমানকে গ্রেফতার প্রসঙ্গে মাত্র কিছুদিন আগে আইজি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আসামী ধরতে পুলিশকে অনেক সময় হকার, ভিক্ষুক ইত্যাদি সাজতে হয়। এক্ষেত্রে সাংবাদিকের ছদ্মবেশ নেয়া হয়েছে।

এবারে আর ওসব কৌশল ছিল না। কৌশল ছিল ঘোষণা দিয়ে অভিযান। নিট ফলাফল : ৭দিনে গ্রেফতার ১৩ হাজারের বেশী। এর মধ্যে জঙ্গী সন্দেহভাজন ১৯৪ জন, শতাংশের হিসেবে যা মাত্র দেড় জন। এদের মধ্যে পুলিশ এখন গুপ্তহত্যাকারী খুজছে, সনাক্তের চেষ্টা করছে এবং সনাক্ত হলে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ কর্তারা সন্তুষ্ট -ঘোষণা দিয়ে চালানো এই অভিযান সফল বলে তারা দাবি করছেন এবং তাদের ভাষায়, স্বাভাবিকের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি গ্রেফতার হয়েছে।

পুলিশের এই স্বস্তিকর অভিযান জনগনের জন্য কতটা স্বস্তি বয়ে এনেছে তার প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে মিডিয়ায়, জঙ্গীবাদ গবেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের কাছ থেকে। তারা বলছেন, বিশেষ অভিযান বিশেষত্ব হারিয়েছে শুরুতেই। এই অভিযানের সাফল্য বিশ্বাসযোগ্যভাবে পুলিশ এখনও উপস্থাপন করতে পারেনি। উদাহরন হচ্ছে, অভিযানের প্রথম ৪ দিনে পুলিশ বগুড়ায় ৩৭২ জনকে গ্রেফতারের কথা জানালেও আদালতে সোপর্দ করেছে ১৭১ জনকে। অভিযোগ উঠেছে গ্রেফতার বাণিজ্যের। পুলিশের গ্রেফতার ও আদালতে সোপর্দের গরমিল পরিষ্কার করে দিচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছে সারাদেশে।

অভিযানের প্রাক্কালে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, হেড অব দ্য গভার্ণমেন্ট হিসেবে গুপ্তহত্যার সকল তথ্য তার কাছে আছে। সরকার প্রধান যখন সুনির্দিষ্ট করে বলেন, তার কাছে তথ্য আছে তখন সেটি সকল জনগন বিশ্বাস করে। তার কাছে তথ্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীকে যারা তথ্য দেন, রাষ্ট্রীয় যে সব সংস্থা তথ্যআহরণ ও সরবরাহের সাথে যুক্ত তাদের কাছে “সঠিক তথ্য” থাকে কিনা? তারা নিশ্চিতভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, নিরাবেগ ও সত্য তথ্য দিচ্ছেন কিনা?

উদাহরণঃ অভিজিৎ-দীপনের হত্যাকারীদের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, হত্যাকারীদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এরপর অনেকদিন চুপচাপ থেকে পুলিশ হঠাৎ বলল, খুনীরা দেশের বাইরে চলে গেছে। সকল তথ্য নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া হয়েছিল। হত্যাকারীকে নজরদারিতে রাখা গেল, গ্রেফতার করা হলো না। কি করে তারা দেশের বাইরে পালিয়ে গেল? আবার গত ১৬ জুন পুলিশ জানাল, প্রকাশক হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত পুরষ্কার ঘোষিত ৬ জঙ্গীর একজন সুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।  আবার অভিজিৎ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত পুরষ্কার ঘোষিত  ৬ জঙ্গীর আরও একজন  শরীফ শনিবার দিনগত রাতে কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহতও হলো।

দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এইসব হত্যাকান্ড নিয়ে পুলিশী তদন্ত কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন জনমানুষের। এরকম প্রশ্ন তো প্রধানমন্ত্রীরও হওয়ার কথা। তিনি জনমানুষের নেতা। ছোট-বড় সকল কাজই তিনি নিজে তদারকি করেন, নির্দেশ দেন। কিন্তু পুলিশী নজরদারিতে থাকা হত্যাকারীরা দেশের বাইরে পালিয়ে গেলে সেই তথ্যটি তাকে দেয়া হয়েছিল? একটি প্রশ্নের পিঠে আরেকটি প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীকে কি সাফল্য-ব্যর্থতা, সকল তথ্য সরবরাহ করা হয়?

আসলে এসব বিষয়গুলি ভাইস-ভার্সা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক আইজি এএসএম শাহজাহানের মতে, “রাষ্ট্রযন্ত্র কাউকে দিয়ে একটি অপরাধ করালে সে নিজের লাভের জন্য আরো দশটি অপরাধ করবে”। পুলিশ, সিভিল প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবেলা করার নীতি কি এজন্য দায়ী? সব সরকার এই নীতির প্রয়োগ করেছে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে একধরনের অপরাধপ্রবন কর্মকর্তা-কর্মচারী তৈরী করেছে।

সদ্য সমাপ্ত বিশেষ অভিযান চলাকালে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১০ জনের মধ্যে ৭ জনই সন্দেহভাজন জঙ্গী বলে পুলিশ দাবি করেছে। অভিজিৎ হত্যায় জড়িত শরীফুল ঢাকায় ডিবির সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় শনিবার দিনগত রাতের শেষ প্রহরে।  প্রথমে সে অজ্ঞাতনামা ছিল, পরে লাশ দেখে ডিবি সনাক্ত করে সে পুরষ্কার ঘোষিত ৬ জঙ্গীর একজন শরীফুল। পুলিশের দাবি, অভিজিৎ হত্যায় সিসিটিভির ফুটেজে তার ছবি সনাক্ত করা হয়েছিল।

মাদারীপুরে টার্গেট কিলিংয়ে জড়িত ও জনতার হাতে ধৃত ফয়জুল্লাহ ফাহিমের নিহত হওয়ার ঘটনায় জঙ্গী দমনে পুলিশের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ করছেন অনেকে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান একটি জাতীয় দৈনিককে বলেছেন, জঙ্গী বিরোধী অভিযানের সময় এরকম হত্যার অর্থ হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতর হয়তোবা জঙ্গীদের চর লুকিয়ে আছে বা জঙ্গীবাদের প্রশয়দাতারা রয়েছে।

নিহত ফয়জুল্লাহ গুপ্তহত্যা উদঘাটনে ছিল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। বড় কোন ঘটনা আড়াল করতে গিয়ে এই হত্যাকান্ড এরকম উদ্বেগ পুলিশের সাবেক আইজি, মানবাধিকার কর্মী ও জঙ্গীবাদ বিশ্লেষকদের। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উদ্বেগহীন। তার মতে, পালাতে গেলে পুলিশ কি করবে। পুলিশি ভাষ্যের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, সহযোগীদের গুলিতে ফয়জুল্লাহর মৃত্যু ঘটেছে। তবে  ড. মিজানুর রহমানের মতে, রাষ্ট্রের হেফাজতে যখন আসামী থাকে, তখন সকল দায় রাষ্ট্রের। টিআইবি প্রধান সুলতানা কামাল অভিযোগ করেছেন, রাষ্ট্র আইন হাতে তুলে নিয়েছে।

বিএফইউজে- এর ইফতার পার্টিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার কাছে তথ্য আছে-এটি জানিয়েছিলেন। এখন প্রমান হয়েছে। সন্ত্রাসী ফাহিম একজন শিবির কর্মী। এরপর কারো সন্দেহ থাকার কথা না। গুপ্তহত্যা বিএনপি-জামায়াতের জন্মগত স্বভাব এবং তারা জড়িত। শরিক দলের ইফতার পার্টিতে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, বিভিন্ন হত্যাকান্ডের ঘটনায় দু’একজন অপরাধী ধরা পড়লেও সরকারের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসার ভয়ে তাদের ক্রসফায়ারে দেয়া হচ্ছে।

হত্যাকান্ড ও গুপ্তহত্যা ঘটার পরে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলির কাছ থেকে দুটি সিদ্ধান্ত বা উত্তর পাওয়া যায়। এটা করেছে বিএনপি-জামায়াত। এটি করেছে আওয়ামী লীগ। মানুষ কোনটি বিশ্বাস করবে? হয় এই দুইটি অভিযোগই মিথ্যা, নতুবা একটি মিথ্যা না হলে দুটিই সত্য। আইনের শাসনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোন হত্যাকান্ড ঘটলে তদন্তে প্রমানিত না হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ মুখ খোলেন না। সংশ্লিষ্টরা মিডিয়ায় তদন্তের অগ্রগতি জানান। কিন্তু এখানে সরকার প্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রী, পুলিশ কর্তা, রাজনৈতিক নেতারা সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন, ব্লেইম গেমে নেমে পড়েন। ফলে তদন্ত প্রভাবিত হয় এবং আসল খুনীরা নিরাপদ থেকে যায়।

বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী লীগ বা জঙ্গী সংগঠন- এরমধ্যে কারা হত্যাকান্ড ও গুপ্তহত্যায় জড়িত তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সেই কাজটিই হচ্ছে না বা করতে পারছে না পুলিশ। যে কোন হত্যাকান্ডে মূল বিষয় হচ্ছে হত্যাকারী। গ্রেফতার-তদন্ত করে বিচার নিশ্চিত করলে জানা যাবে হত্যাকারী কারা। এজন্য তোতা পাখির মত মুখস্থ বুলির দরকার নেই-বিএনপি-জামায়াত করেছে, আওয়ামী লীগ করেছে, জঙ্গীরা করেছে। তদন্ত-প্রমান ও বিচার ছাড়া অভিযোগ করলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড হয়ে পড়ে সমাধানের উপায়। এর ফলে জনমনে সন্দেহ বাড়ে, বাড়ছেও। তৈরী হচ্ছে স্থায়ী পারসেপশন।

অনেককাল ধরে মিথ্যা ও অস্বীকারের একটি সংস্কৃতি বাংলাদেশে চলমান। সত্যি বললেও ধরে নেয়া হয় মিথ্যা বা অস্বীকার করা হচ্ছে। আরেকটি হচ্ছে, চিহ্নিত বা শনাক্ত করার আগে কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই। শুরুটাই হয়েছিল অনেককিছু চাপা দিয়ে একটি অস্বাভাবিক পথে। এডহকভিত্তিক পরিকল্পনা ও সমাধান এবং একটি সমস্যা চাপা দিয়ে আরেকটি সমস্যা সৃষ্টি করা-এটি নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া না থাকলে এমনটাই ঘটে, এর অজস্র  প্রমাণ রয়েছে।

বাঘ এসেছে, বাঘ এসেছে বলে রাখাল বালক সবসময় মিথ্যা বলতো। কিন্তু যেদিন সত্যিকারের বাঘ এলো এবং রাখাল বালক প্রথমবার সত্য বলল – কেউই বিশ্বাস করেনি। পারসেপশন বা জনভাবনা খুব সাংঘাতিক জিনিষ। জনমনে এখন যে ভাবনাটি বিবেচনাযোগ্য, ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার অহেতুক ইস্যু তৈরী করে। প্রকৃত ইস্যুগুলি চাপা দেয়। কিন্তু দেখে-শুনে মনে হচ্ছে সরকার জনভাবনার থোড়াই পরোয়া করে।