Home » বিশেষ নিবন্ধ » চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৪৫ : তিয়েন আন মেন স্কোয়ারের প্রতিবাদ

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৪৫ : তিয়েন আন মেন স্কোয়ারের প্রতিবাদ

আনু মুহাম্মদ ::

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগেই চীন বড়ধরনের ধাক্কা খায় ১৯৮৯ সালের মে মাসে তিয়ান আন মেন স্কোয়ারের ঘটনায়। মিখাইল গর্বাচেভ চীন সফরে আসেন এই বছরের এই মে মাসেই। তাঁর সফর সেকারণে খুব গুরুত্ব পায়নি, পেলেও কিছু হতো না কেননা এর কিছুদিনের মধ্যেই এই গর্বাচেভের নেতৃত্বেই সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান ঘটে।

তিয়ান আন মেন ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিলো চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক এবং পরে পলিটব্যুরো সদস্য হু ইয়াও ব্যাং-এর আকস্মিক মৃত্যুর পর। হু পার্টির মধ্যে প্রবল চাপে ছিলেন এবং পলিটব্যুরো সভাতেই ১৫ এপ্রিল তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর কয়দিন পর তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে প্রয়াত এই নেতার স্মরণে আয়োজিত বিশাল জমায়েত থেকেই সরকারের নানা কার্যক্রম ও নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গুঞ্জন শুরু হয়, পরে সেটাই সরব প্রতিবাদে পরিণত হয়। পুরো মে মাস জুড়েই জমায়েত বাড়তে থাকে এবং অবস্থান কর্মসূচি সম্প্রসারিত হতে থাকে। এই বিশাল জমায়েত, এই প্রতিবাদকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে তা নিয়ে পার্টির মধ্যে বিভিন্ন মত ছিলো। নেতৃত্বের জন্য অভাবনীয় মাস ধরে অব্যাহত থাকা এই প্রতিবাদ জোয়ার কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের পার্টি সংগঠন, সেনাবাহিনী ও সমাজের মধ্যে বড়ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয় এইসময়ে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক রদবদলও ঘটে। গণমুক্তি ফৌজকে একবার আমন্ত্রণ জানালেও তাঁরা এবিষয়ে কোন ভূমিকা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। বেইজিং থেকে এই প্রতিবাদ ৩৪১টি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বেইজিং শহরে প্রবেশের সড়ক ও রেলপথ শিক্ষার্থীরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। একপর্যায়ে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের অনশন ধর্মঘট। অনেক বিতর্ক দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলবার পর ৪ জুন পার্টি ও সরকার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি দমন করবার কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হয়। গণমুক্তিফৌজ মোতায়েন করা হয়।

সেসময় অনেকের মতো আমিও মাসাধিককাল ধরে চলা বেইজিং-এর কেন্দ্রে বাড়তে থাকা সেই প্রতিবাদী বিশাল তরুণ জমায়েত, পার্টির সাথে তাদের সংঘাতের এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছি দূর থেকে। কিছুদিন পর আমি এর একটি পর্যালোচনা লিখেছিলাম, তার কিছু অংশ এখানে খুব প্রাসঙ্গিক। সেই লেখায় বলা হয়েছিলো, ‘‘চীনের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের বিকাশ ধারা লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, বেশ কিছুদিন ধরে এই আন্দোলন ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। ক্রমান্বয়ে এখানে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর সমাবেশ হয়েছে। এসব সমাবেশে উপস্থিত হয়েছেন কিছু কিছু শ্রমিক কৃষকও। সমাবেশে উপস্থিত মানুষের দাবীদাওয়া অভিন্ন ছিল না। ‘গণতন্ত্রের দাবীতে বিক্ষোভ চলছে’ এভাবেই বাইরে বিশেষত পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন দাবীর মর্মবস্তু অনুসন্ধান করলে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। উপস্থিত একটি অংশের দাবীর মর্মার্থ ছিল পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র অর্থাৎ ব্যক্তি মালিকানার প্রসার। আর একটি অংশের দাবীর মূল কথা ছিল আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ খর্ব করা- যে আমলাতন্ত্র গত কয়েক বছরে বেশ শক্তি লাভ করেছে। আরেকটি বড় অংশের দাবীর মূল কথা ছিল সংস্কারের ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, ছাঁটাই, দুর্নীতি ইত্যাদির অবসান ঘটা। পার্টি নেতৃত্বের সমালোচনার অধিকার, যা আগে থাকলেও হরণ করা হয়েছিলো, তার দাবীও ছিলো অন্যতম।’’ আন্দোলনের ধরন, গঠন, সরকারের ভূমিকা সবকিছুই চীনের জন্য ছিলো নতুন অভিজ্ঞতা।

বিভিন্ন টিভি ও সংবাদপত্র থেকে তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি যে চিত্র পেয়েছিলাম তা নিম্নরূপ, প্রথমদিকে ‘‘লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী একস্থানে জমায়েত হয়েছে কিন্তু কোথাও কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে সামরিক আইন জারী হয়েছে, কিন্তু কোন গুলিবর্ষণ, নির্যাতন গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেনি।….এটা সম্ভব হয়েছিল দীর্ঘদিন সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার ছাপ, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের কারণে।..’’ তাহলে সহিংসতা, রক্তপাত ও হতাহতের ঘটনা কবে কীভাবে ঘটলো? পরিস্থিতির নিয়মিত পর্যবেক্ষণ থেকে যা খেয়াল করেছিলাম তখন তা এরকম, ‘‘একপর্যায়ে ছাত্রছাত্রীরা তাদের অবস্থান প্রত্যাহার করতে যাচ্ছেন এবং স্কোয়ার প্রায় খালি হয়ে আসতে থাকে। এই সময়েই ঘটে বিপ্লব-পরবর্তী চীনের ইতিহাসের সবচাইতে কলঙ্কজনক ঘটনা। আকস্মিকভাবে সেখানে শুরু হয় হাঙ্গামা, উস্কানিমূলক হামলা, গুলিবর্ষণ। সেসময়ই প্রথম ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।’’ (পূর্ণাশা, ১২ মার্চ, ১৯৯০) কত হতাহত হয়েছিলেন তার সঠিক খবরাখবর এখনও পাওয়া যায় না। বিভিন্ন তথ্য থেকে বলা যায় যে, শেষ পর্যায়ে এই রক্তাক্ত সংঘাতের ঘটনাবলী স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদ থেকে তৈরি হয় নি, এখানে উস্কানিও ছিলো। পার্টি নেতৃত্বে দমনমুখি লোকজনের ক্ষমতাবৃদ্ধির প্রকাশও এটি।

তিয়েন মেন স্কোয়ারের এই প্রতিবাদী গণজোয়ারে এবং তাকে ঘিরে ক্ষমতার লড়াইয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে দেং এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পায়। এই বছরই দেং সেন্ট্রাল মিলিটারী কমিশনের চেয়ারম্যান পদ থেকে নেমে যান। ১৯৯২ থেকে তিনি রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিক তৎপরতা থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেন। অবশ্য তাতে শেষ পর্যন্ত দেংপন্থীদের উন্নয়ন ধারাবাহিকতায় কোন ছেদ পড়েনি।