Home » মতামত » গণতন্ত্রই রুখতে পারে জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদ

গণতন্ত্রই রুখতে পারে জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদ

আমীর খসরু ::

২০১৩ থেকে এ পর্যন্ত ৭ জন ব্লগার ও একজন প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে এবং আহতের সংখ্যাও অনেক। শুধু ব্লগার ও প্রকাশককে হত্যাই নয়, হত্যাকান্ড থেকে বাদ পড়েননি বিদেশী নাগরিকসহ এ দেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ। এসব ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বাংলাদেশে বর্তমানে মুক্তমত প্রকাশে নানামুখী বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যদি বিষয়টি এমন হতো যে, সরকার মুক্তমত প্রকাশের পক্ষে এবং এ লক্ষ্যে যাবতীয় সুরক্ষামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করতো, নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট থাকতো- তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো। যেহেতু ক্ষমতাসীন পক্ষই স্বাধীন মতপ্রকাশ ও বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে এবং এরই অনিবার্য সুযোগ নিচ্ছে অরাষ্ট্রীয় উগ্রবাদী অপশক্তি। আর এই অপশক্তিকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে জনগণকে সাথে নিয়ে মোকাবেলা করার ইচ্ছাও যেমন নেই, তেমনি তাদের পক্ষে এটা সম্ভবও নয়।

এ কথা স্পষ্ট করেই বলে নেয়া প্রয়োজন, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদ্বয়ের স্বল্পকাল পর থেকে এই পর্যন্ত কোনো সরকারই স্বাধীন মতামত প্রকাশ এবং নাগরিকের বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সংবিধান বর্ণিত মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দেয়নি। বরং এসব অধিকারগুলোকে হরণ করেছে নানাবিধ কালা-কানুন এবং বিভিন্ন পন্থায়। স্বাধীনতার স্বল্পকাল পরেই সংবাদপত্র বন্ধসহ বেশ কিছু ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়। জারি করা হয় বিশেষ ক্ষমতা আইন, সংবিধানে মৌলিক অধিকার স্থগিত করে জরুরি অবস্থার বিধানও চালু করা হয়। এরপরের সামরিক-বেসামরিক সরকারগুলোও কম-বেশি ওই একই পথে গেছে। তবে ওই সব সরকারগুলোকে অতিক্রম করে গেছে বর্তমান সময়। এখনো সংবাদ মাধ্যম বন্ধ হচ্ছে। এর উপরে স্বাধীন মতামত প্রকাশে বাধা সৃষ্টির জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন জারি রয়েছে। বিশেষ করে ওই আইনের ৫৭ ধারাটি স্বাধীন মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক এবং বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টিকারী। শুধু আইন-কানুন দিয়েই নয়, সামগ্রিকভাবে অলিখিত ও অদৃশ্যভাবে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে মানুষ এখন ভীত ও সন্ত্রস্ত।

এ কথাটি সবার জানা যে, স্বাধীন মতামত প্রকাশ ও বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতার সাথে গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর গণতন্ত্র চর্চাকে বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে এবং এখনো দেশী-বিদেশী সবাই বলে যাচ্ছেন, গণতন্ত্র সংকুচিত অথবা বিনাশ করা হলে যেকোনো ধরনের উগ্রবাদ-জঙ্গীবাদ কিংবা যেকোনো অরাষ্ট্রীয় অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। কারণ গণতন্ত্রহীনতার সুযোগটি ওই শক্তি বা শক্তিগুলো অতিমাত্রায় নিয়ে থাকে।

৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে গণতন্ত্রের উল্টো যাত্রার সাথে সাথে শুধু যে নির্বাচনী ব্যবস্থারই অর্ন্তধান ঘটেছে তা নয়, সব কিছুই বিপদাপন্ন হয়েছে। সংকটাপন্ন হয়েছে বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা। এ কথাটিও বলা প্রয়োজন যে, সরকার গণতান্ত্রিক না হলে ক্রমাগত জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ে। আর জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় উগ্রবাদ-জঙ্গীবাদ মোকাবেলাও অসম্ভব হয়ে পরে। কারণ জন-অংশগ্রহণমূলক প্রতিরোধ উগ্র ও জঙ্গীবাদী শক্তির বিরুদ্ধে গড়ে তোলা কার্যত অসম্ভব হয়ে যায়। স্মরণে রাখা প্রয়োজন, জনগণকে বাদ দিয়ে সরকারের পক্ষে এই শক্তিকে মোকাবেলা সম্ভব নয়। এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, গণতন্ত্রই হচ্ছে জঙ্গীবাদ, উগ্রবাদ কিংবা অরাষ্ট্রীয় অপশক্তিকে মোকাবেলার একমাত্র পূর্বশর্ত।

কিন্তু ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সব সময়ই বলা হচ্ছে, জবাবদিহীতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নানা প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে এবং এর সবই জনগণকে সহায়তা করবে। কিন্তু তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশন কিংবা দুদকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি দিলেই আমরা বুঝতে সক্ষম যে, এসব প্রতিষ্ঠান কতোটা কার্যকর এবং সক্ষমতার সাথে স্বাধীনভাবে কাজ করছে। এক্ষেত্রে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার দ্য আইডিয়া অফ জাস্টিস গ্রন্থে বলেছেন- ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কি কি প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়েই গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কণ্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কিনা তাও দেখতে হবে’।

সরকার জনঅধিকারগুলোকে উপেক্ষা করে উন্নয়নের কথা বলে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বহুবার বলা ও লেখা হয়েছে যে, গণতন্ত্রবিহীন অবস্থায় উন্নয়ন কার্যকর ও টেকসই হতে পারে না। সরকার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশের কথা ইতোপূর্বে বলেছে এবং এখনো বলছে। কিন্তু সেখানে আইনের শাসনহীনতা নেই, বিচারহীনতার সংস্কৃতিও বিদ্যমান নয়।

আগেই বলা হয়েছে যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে মানুষের সামগ্রিক অধিকারগুলোর ক্রমান্বয়ে বিলুপ্তি ঘটার সাথে সাথে অনিবার্যভাবে অরাষ্ট্রীয় শক্তিগুলো এর সুযোগ নিচ্ছে এবং জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদের উত্থান হচ্ছে।

২০১৫ এবং ২০১৬’র হিসাব যদি দেখা যায় তাহলে দেখা যাচ্ছে, অন্তত ৬ জন ব্লগার, অনলাইন সক্রিয়বাদী, প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে আরও অনেককে। শুধু তাদেরই নয়, বাদ জাননি ইতালীয় নাগরিক তাবেলা সিজার, জাপানী নাগরিক কোনিও হোশি এবং দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো হত্যারই বিচার তো হয়ইনি, সঠিকভাবে তদন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে এটাও বলা মুশকিল।

এ কারণে প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতাসীনদের স্বদিচ্ছা এবং আন্তরিকতা নিয়ে। এ প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে ভীতির সংস্কৃতির সৃষ্টির চেষ্টা চলছে, এসব হত্যাকান্ড ও হামলার ঘটনাগুলো অনাকাংখিত ও দুঃখজনক হলেও তা পরোক্ষভাবে ওই প্রচেষ্টায় সহায়কা ভূমিকা পালন করছে কি না- সে বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে।

একটি কথা মনে রাখতে হবে, জনগণ প্রত্যাশা করে, রাষ্ট্র সব সময়ই তাদের অর্থাৎ নাগরিকদের সুরক্ষা এবং অধিকারগুলো নিশ্চিত করবে। কিন্তু রাষ্ট্র এখন বিপরীতমুখী আচরণ করছে। এ কারণে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকদের যোজন যোজন দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছে অরাষ্ট্রীয় সহিংস উগ্রবাদী-জঙ্গীবাদী শক্তি। কাজেই স্বাধীন মতপ্রকাশ এখন সব দিক থেকেই সীমাহীন হুমকির মুখে। মানুষ এখন ঝুকি আর আতংকের মধ্যেই বসবাস করছে। এটা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। এর একমাত্র সমাধান- সচল, সজীব গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের চর্চা।