Home » প্রচ্ছদ কথা » সুন্দরবন বিনাশে একগুঁয়ে সরকার

সুন্দরবন বিনাশে একগুঁয়ে সরকার

আনু মুহাম্মদ ::

গত ১২ জুলাই রাতে ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ এবং ঢাকায় আসা ভারতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজের চুক্তি সই হয়। এই চুক্তিতে সই করেন ‘বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল)’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজ্জ্বল কান্তি ভট্টাচার্য ও নির্মাণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ভারত হেভি ইলেকট্রিক লিমিটেডের (বিএইচইএল বা ভেল) মহাব্যবস্থাপক প্রেমপাল যাদব। এর মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের সরকার সুন্দরবন বিনাশে সরকার আরেক ধাপ এগিয়ে গেলো। লক্ষণীয় যে, সুন্দরবন বিনাশী বাংলাদেশের একটি প্রকল্পের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করলেন দুই প্রতিষ্ঠানের ভারতীয় কর্মকর্তা! সরকার একগুঁয়েমি অব্যাহত রাখলে সুন্দরবন ধ্বংসে সামনেও ভারতীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই আরও চুক্তি হতে দেখবো। ১২ জুলাই এর মতো পেছনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধি বলে কথিত ব্যক্তিরা হাস্যমুখে করতালি দিতে থাকবেন।

রামপাল (এবং সেই সাথে ওরিয়ন) বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সুন্দরবনের বিনাশ যে ঘটবেই তা দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হবার কারণেই এর বিরুদ্ধে শুধু দেশে নয় সারা বিশ্বেই প্রতিবাদ, ক্ষোভ বাড়ছে। ইউনেস্কো এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে সতর্কীকরণ জানাচ্ছে বেশকিছুদিন ধরেই। ভারতেও এর বিরুদ্ধে সভাসমাবেশ শুরু হয়েছে। কারণ সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়, ভারতের মানুষও এর ভাগীদার, এটি বিশ্বের ঐতিহ্য। বাস্তুসংস্থান হিসেবে যার তুলনা পাওয়া ভার। সুতরাং এর বিনাশ ঘটলে বাংলাদেশের মানুষ হারাবেন বিপদে দুর্যোগে অসম্ভব শক্তিশালী এক আশ্রয়, অরক্ষিত হয়ে পড়বে বাংলাদেশ! আর বিশ্ব হারাবে এক অমূল্য সম্পদ। কয়েকদিন আগে বন ও পরিবেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারত-বাংলাদেশ যৌথ এই প্রকল্প এখনও পরিবেশ ছাড়পত্র পায়নি। কোনো ন্যুনতম নিয়মকানুনের বালাই নেই, সরকার একগুয়ের মতো কাজ চালিয়েই যাচ্ছে।

প্রথম থেকেই অনিয়মে ভরা এই দেশধ্বংসী প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ সরকার আবার অনেকরকম ছাড়ও দিচ্ছে। ২০১৩ সালের ১ জুলাই ঘোষিত বাংলাদেশ সরকারের এসআরও অনুযায়ী কোম্পানি ১৫ বছরের জন্য নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আয়কর মওকুফ পাবে, এখানে কর্মরত বিদেশি ব্যক্তিবর্গের আয়কর দিতে হবে না কমপক্ষে তিন বছর, বৈদেশিক ঋণের সুদের ওপর কর প্রযোজ্য হবে না, প্রকল্প নির্মাণে নির্বাচিত ভারতীয় হেভি ইলেকট্রিক কোম্পানির যন্ত্রপাতি আমদানিতেও কোনো শুল্ক দিতে হবে না। বাঁশখালীতেও কোন নিয়মকানুন নেই, পরিবেশ সমীক্ষা নেই, খুন করেও শেষ হয়নি, মানুষের ওপর জোরজুলুম চলছে, গরীবের জন্য বরাদ্দ খাসজমি তুলে দেয়া হচ্ছে ব্যবসায়ী কোম্পানির হাতে। রূপপুরে ৯০ হাজার কোটি টাকার বিরাট ঋণের বোঝা নিয়ে এক ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে সরকার। নিরাপদ বিদ্যুতের জন্য বিশাল গ্যাসসম্পদের আধার আছে বঙ্গোপসাগরে। বিদেশি কোম্পানির কাছে সেই গ্যাসসম্পদ হারানোর চুক্তি করবার জন্য নানামুখি চেষ্টা চলছে। শতভাগ গ্যাস নিজেদের কাজে লাগানোর, পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানীর অসীম সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও জনবল তৈরির জন্য বর্তমান বাজেটেও কোনো বরাদ্দ নেই।

২০০৬ সালে একটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতের সাথে চুক্তি হয়েছিলো শ্রীলঙ্কার। গত জুন মাসে মানুষ ও প্রকৃতির উপর এর ফলাফল বিবেচনা করে এবং মানুষের দাবির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে শ্রীলঙ্কার সরকার এই প্রকল্প বাতিল করেছে। শ্রীলঙ্কা পারলে বাংলাদেশ পারবে না কেনো? বাংলাদেশের সুন্দরবন তো আরও বড় কারণ এরকম প্রকল্প বাতিল করায়। শুধু তাই নয় গত সপ্তাহে ভারতের জ্বালানী মন্ত্রণালয় ছত্তিশগড়, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র এবং উড়িষ্যায় চারটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প একই ধরনের কারণে বাতিল করেছে। পাশাপাশি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সৌরবিদ্যুৎসহ ১৬ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানীভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। (http://reneweconomy.com.au/2016/india-cancels-four-major-new-coal-plants-in-move-to-end-imports-27494)

ভারত পারলে বাংলাদেশ পারবে না কেন?

আমরা বারবার বলি: ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু বিকল্প আছে, কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নেই’, ‘যা দেশকে বিপন্ন করে তা উন্নয়ন নয়’, ‘দেশধ্বংসী রামপাল, রূপপুর, বাঁশখালী প্রকল্প নয়, বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়ন করতে হবে’। কিন্তু না, বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছা অতুলনীয় সম্পদ, চার কোটি মানুষের রক্ষাবাঁধ সুন্দরবন ধ্বংস করে ‘উন্নয়নের’ এক অভূতপূর্ব বিষাক্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেই হবে। বাজেটে এসব সাগরচুরি আর বনবিনাশী তৎপরতার সমর্থনে বরাদ্দ আছে, ছাড় আছে। নীতি নেই বরাদ্দ নেই টেকসই বিদ্যুৎ সমাধানে জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের। ভুলনীতি আর দুর্নীতি তাই তৈরি করছে সাগরচুরি, নদী আর বনবিনাশের ‘উন্নয়ন’পথ।