Home » বিশেষ নিবন্ধ » কিন্তু বন্দুকের নল যদি ঘুরে যায়!
A demonstrator protesting the shooting death of Alton Sterling is detained by law enforcement near the headquarters of the Baton Rouge Police Department in Baton Rouge, Louisiana, U.S. July 9, 2016. REUTERS/Jonathan Bachman TPX IMAGES OF THE DAY - RTSH3XR

কিন্তু বন্দুকের নল যদি ঘুরে যায়!

মীনাক্ষী দত্ত ::

আমেরিকায় পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা এবং এক কৃষ্ণাঙ্গ কর্তৃক পুলিশ হত্যার ঘটনাবর্ত থেকে দুটি নাম উঠে আসছে— ডায়মন্ড রেনল্ডস ও মাইকা জেভিয়ার জনসন। গাড়ির একটা ছোট টেইল লাইট কাজ করছিল বলে পুলিশ মাইকা জেভিয়ারের গাড়ি থামিয়েছিল। তার পাশে ছিল প্রেমিকা ডায়মন্ড ও পেছনের সিটে ডায়মন্ডের চার বছরের মেয়ে। পৃথিবীর অন্য কোথাও এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও গায়ের রঙ সাদা হলে গাড়ির একটা টেইল লাইট ভাঙা কোনও অপরাধ নয়। পুলিশ গাড়ি থামিয়ে বলবে, ‘সার, পেছনের আলোটা ভাঙা, সারিয়ে নেবেন।’ মাইকা গাড়ি থামানোর পর কী হল তা সারা পৃথিবী যে জানে তার কারণ ডায়মন্ডের দুঃসাহসিক ভিডিও।

যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব এক জিনিস আর চারশো বছরের দাসত্বের ভীতি অতিক্রম করা হচ্ছে অন্য জিনিস। মিনেসোটার রাস্তায় রক্তাক্ত প্রেমিককে পাশে নিয়ে একটি কালো মেয়ের পুলিসের সঙ্গে কথা বলার জন্য যে সাহস, যে স্নায়ু লাগে তা আধুনিককালের বীরত্ব। সে হাতের সেল ফোনের ক্যামেরা চালু রেখে পুলিশকে শীতল গলায় বলেছিল, ‘you have just shot him for  no reason, sir.’

১৬১৯ সালে প্রথম ওলান্দাজরা আফ্রিকা থেকে লোক তুলে এনে আমেরিকায় ক্রীতদাসরূপে বিক্রি শুরু করে। এটা দাসপ্রথার ৩৯৭তম বছর। ১৮৩১ থেকে ১৮৬৫ পর্যন্ত আমেরিকার গৃহযুদ্ধ চলাকালীন ১৮৬৩–তে অব্রাহাম লিঙ্কন দাসপ্রথা আইনত নিষিদ্ধ করেন। সারা দেশে দাসেদের মুক্তি হয় যুদ্ধ অবসানে ১৮৯৬৫ সালে। কিন্তু দেড়শো বছরেও সাদা–কালো দুই বর্ণের কারও মন থেকেই সেই যুদ্ধ শেষ হয়নি। মিনেসোটায় সেই রাত্রে ডায়মন্ডকে হতে হয়েছিল সেই মনের দানবের মুখোমুখি যে রক্তমাংসের মানুষ হয়ে পিস্তল উঁচিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে উঁকি মারছে। তার মধ্যেই সে সেল ফোনে পুরো ঘটনাটার ছবি তুলেছে, যা আন্তর্জালে ভাইরাল হয়ে গেছে। ইতিহাসের বই–এ লেখা থাকে যে প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের আমলে ১৮০৮ সালে আফ্রিকা থেকে দাস আমদানি আইনত বন্ধ হয়। কিন্তু কেনাবেচা তো চলতেই থাকে। জেফারসনের নিজেরই অনেক ক্রীতদাস ছিল। আমেরিকান সংবিধানে দাসপ্রথার পরোক্ষ স্বীকৃতি আছে। কংগ্রেসের জন্য আসন গণনায় তাদের আস্ত একটা মানুষ হিসেবে ধরা হয়নি। সংবিধানের চোখে পাঁচজন দাসকে তিনজন মুক্ত মানুষ মনে করা হয়।

এ সব তো আইনের শুকনো কথা। আমেরিকায় কাজ করতে করতে আমি নিজেও টের পেয়েছি চারশো বছরের ভয়ের পাহাড় কেমনভাবে কালোদের এখনও চেপে রেখেছে। হাইস্কুলের ছেলেরা রাস্তায় বিয়ার খায়, মারামারি করে। সাদা হলে পুলিশ বলে, ‘go home kid’. কালো হলে সঙ্গে সঙ্গে হাতে হাতকড়া লাগিয়ে ঠেলা মেরে পুলিশের গাড়িতে ঢুকিয়ে ধরে নিয়ে যায়। কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রদের অধিকাংশেরই বাড়ির কর্তা বলে কেউ নেই, বাবা–কাকা– দাদা সব জেলে, তাদেরও ওই গতি হবে হয়ত। মেয়েরাই সমস্ত বিশাল বোঝাটা বয়ে চলেন। আমরা উপমহাদেশিরাও কিছু কম নই। একটি কালো মেয়ে আমার কাছে এসে কাঁদত। তার মা কালো, বাবা বাংলাদেশি। বাবা ঘেন্না করে নিজের কালো সন্তানকে, বাবার আত্মীয়, বন্ধু দূরছাই করে। তার মাকে লোকটি আসলে বিয়ে করেছিলেন আমেরিকান ভিসার জন্য। আমাকে তার বাবার দেশের লোক মনে করেই হয়ত সে কাঁদতে কাঁদতে এ–সব কথা বলত। মেয়ের কাছে শুনে তার মা–ও এসেছিলেন দেখা করতে চারশো বছরের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে।

ডায়মন্ডের ভিডিওর শেষটায় আছে তার চার বছরের মেয়ের গলা, ‘মা ভয় পেয়ো না, আমি তো আছি।’ এই ভিডিওর ফলে শুধু তার মেয়ে নয়, সারা বিশ্ব তার পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কিছু করতে পারেনি। পুলিসের কিছু হয়নি, হয় না।

অশ্রুপাত যথেষ্ট হয়নি শুধু একজনের জন্য— মাইকা জেভিয়ার জনসন। সে ভেবেছিল হয় সুবিচার নয় প্রতিশোধ। বয়স পঁচিশ। ইউ এস সেনাবাহিনীতে সে ছিল পাঁচ বছর যার মধ্যে নয় মাস আফগানিস্তান রণাঙ্গনে। সাতবার সে সাহসিকতার জন্য মেডেল, শংসাপত্র, রিবন–সাইটেশন (বিশেষ উল্লেখ) পেয়েছে। ২০১৫–তে দেশে ফিরে পরপর পুলিসের নির্বিচার কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার ঘটনায় সে উত্তেজিত হয়ে পড়ল। কী অনায়াসে পুলিশ মানুষকে খুন করে, কোনও সাজা হয় না। ভিডিওতে দেখা যায় তুচ্ছতম অপরাধে তারা গুলি করে মারছে, প্রশাসন বলছে ভিডিও যথেষ্ট প্রমাণ নয়, এর বাইরেও অনেক অনুসন্ধান প্রয়োজন। আধুনিক টেকনোলজির দুটি স্রোত এই ঘটনাগুলিতে মিশেছে। এক হচ্ছে সেল ফোনের সর্বময়তা, অন্য হচ্ছে আমেরিকার অবাধ ‘গান কালচার’। মাইকা সুদক্ষ সৈনিক। অব্যর্থ লক্ষ্যে বারোজন পুলিশকে গুলি করেছিল। সবাই ভেবেছিল একাধিক লোক গুলি করছে একসঙ্গে। যখন আলোচনা চলছে তখন পেছন থেকে রোবট বোমা ফেলে পুলিশ তাকে হত্যা করে।

পুলিশের সঙ্গে আলোচনাকালে মাইকা বলে যে সে সাদাদের মারতে চেয়েছে, বিশেষত সাদা পুলিশকে।

ওবামার নির্বাচনের পর আমরা ভেবেছিলাম বুঝি বর্ণনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে, চার শতাব্দীর সংগ্রামের ওপর অবশেষে মিলনান্তক যবনিকা। পরিবর্তে গত আট বছরের ঘটনার পর ঘটনায় মনে হচ্ছে নাটকে আরও অনেক অঙ্ক আছে। পর্দা আরও অনেকবার উঠবে–পড়বে। আমেরিকায় এতদিন পর্যন্ত গণহত্যা ঘটিয়েছে শ্বেতাঙ্গরা, কেউ বিকৃত, কেউ আত্মপ্রচারকামী, কেউ শুধু বাহবা পাওয়ার জন্য। দুটি সাম্প্রতিক ঘটনা বিতর্কের ভূমি পাল্টে দিয়েছে। আমেরিকান সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর ছত্রছায়ায় এক ইসলামিক ‘চরমপন্থী’ দম্পতি বিপুল অস্ত্রাগার বানিয়ে ফেলেছিল— বোমা, বিস্ফোরক, অ্যাসল্ট রাইফেল, হ্যান্ডগান— সব। বলি হয়েছে একসঙ্গে পঞ্চাশ জন, আরও হতে পারত। আর ডালাসে শস্ত্রধারী ছিল এক কৃষ্ণাঙ্গ। যতদিন বন্দুকের অধিকার শুধু শ্বেতাঙ্গদের মনে করা হত, ততদিন রক্ষণশীলদের কাছে এই অধিকার ছিল জন্মগত ও পবিত্র। কিন্তু বন্দুকের নল যদি ঘুরে যায়!  (সৌজন্য : আজকাল, কলকাতা, ভারত)