Home » আন্তর্জাতিক » কোনোই স্বপ্ন নেই সিরিয়ার উদ্বাস্তু শিশুদের

কোনোই স্বপ্ন নেই সিরিয়ার উদ্বাস্তু শিশুদের

উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে আত্মহত্যা চেষ্টা ব্যাপকভাবে বেড়েছে  ::

সুলোমে এ্যন্ডারসন, ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ,

লেবাননের উত্তরাঞ্চলীয় নগরী ত্রিপলীর ঠিক দক্ষিণে একটি অস্থায়ী উদ্বাস্তু ক্যাম্পে খাওলা নামের ১২ বছরের সিরিয়ান মেয়েটা তার তাঁবুতে একটা নোংরা মাদুরে বসে আছে। মাথার ওপর নীল প্লাস্টিকের চালাটি প্রচন্ড রোদ থেকে তাকে সামান্যই রক্ষা করছে। কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে না, কিন্তু তবুও কংক্রিটের মেঝটা স্যাতস্যাতে, শেওলায় ঢাকা।

খাওলা কিন্তু দুর্দান্ত সুন্দর। আকর্ষণীয় মুখায়ব, বাদামি ত্বক আর পটলচেরা কালো চোখের মেয়েটির দিকে এক নজর তাকালেই মায়া ধরে যায়। ‘যখন আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম, তখন শয়তান ভর করেছিল,’ কোলে হাত দুটি নাড়াচাড়া করতে করতে বলল সে। তার কথায় কোনো আবেগ নেই, আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। ‘আমি এ নিয়ে কিছু ভাবি না। আমার সবসময় যা মনে হয়, আমাদের কিছুই নেই, আমাদের জীবনের কখনো উন্নতি হবে না। আমি যা পারি তা হলো, আমার মাকে আরেকটা বোঝা থেকে মুক্তি দেওয়া।’

গত ফেব্রুয়ারিতে খাওলার মা সানা তাদের তাঁবুতে ফিরে দেখলেন, সে মেঝেতে শুয়ে আছে। মুখে ফেনা, আর বমি করছে। সে ক্যাম্পে থাকা ইঁদুর-মারা বিষয় খেয়েছিল। ১৮ দিন খাওলা ইনটেনসিভ কেয়ারে ছিল।

মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সানা জানান, “ও জীবন আর মৃত্যুর মাঝে ছিল। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘মা তুমি কেন বিষ খেয়েছিল?”

“ওর জবাব ছিল, ‘মা, আমরা সাত ভাইবোন, আর তুমি কাজ করে যাচ্ছ, আমাদের খাওয়ানোর জন্য কাজ করছ, কিন্তু পেরে উঠছো না। আমি না থাকলে তোমার অন্তত একজনকে কম খাওয়াতে হবে।’ কথাগুলো যখন ও বলছিল, আমি কান্না থামাতে পারিনি।”

এনজিও কর্মীরা জানান, সিরিয়ান উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে ভয়াবহ অবস্থার কারণে আত্মহত্যা চেষ্টা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। জাতিসংঘের নিবন্ধিত উদ্বাস্তের সংখ্যাই ১০ লাখ। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয়ের চেষ্টায় আছে এর চেয়ে আরো অনেক বেশি লোক। লেবানন স্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণ নিষিদ্ধ করেছে। ফলে ব্যক্তিগত জমিতে অস্থায়ী ক্যাম্প বানাতে হয়েছে উদ্বাস্তুদের। এর জন্যও অনেক সময় মোটা অঙ্কের কর দিতে হয়। এখানেই শেষ নয়। যেকোনো সময় চলে উচ্ছেদ এবং নানা ধরনের নির্যাতন। লেবানন সরকার ওয়ার্ক পারমিটও সহজে দেয় না।

এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে সিরিয়ান শিশু ও কিশোররা নানা ধরনের অন্যায় ও অপব্যবহারের শিকার হচ্ছে। জবরদস্তিমূলক পতিতাবৃত্তি ও ধর্ষণ একেবারে সাধারণ ঘটনা হয়ে পড়েছে। লেবাননের এক পতিতালয়ে যৌন ক্রীতদাস হিসেবে থাকা ৭৫ সিরিয়ান নারীকে গত এপ্রিলে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদেরকে দিনে ১০ বারের বেশিও যৌনকাজে নামতে বাধ্য করা হতো। রাজি না হলে পেটানো, বিদ্যুতিক শক দেওয়া হতো। কিশোরী সিরিয়ান মেয়েরা অল্প বয়সেই তাদের আর্থিক ও শারীরিক সুরক্ষার জন্য বয়স্ক স্বামীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে।

জীবন ধারণ এমন গ্লানিকর হওয়ায় জীবনের ওপর থেকেই তাদের শ্রদ্ধা শেষ হয়ে গেছে, অনেকে আত্মহত্যাকেই মুক্তির পথ হিসেবে দেখছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে লেবাননে ৪১ ভাগ তরুণ আত্মহত্যার তাগিদ অনুভব করেছে।

এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় তাদের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করা, জানিয়েছেন, মনরোগ বিশেষজ্ঞ হালা কারবেজ।

উদ্বাস্তু শিবিরগুলোর আশপাশে স্কুলও আছে। তবে সেগুলো তাদের জীবনের মতোই বিধ্বস্ত, যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে।

জাতিসংঘ গত মে মাসে জানিয়েছিল, লেবাননের উদ্বাস্তুদের সহায়তার জন্য ৪৭৯ মিলিয়ন ডলার দরকার। তারা এ পর্যন্ত পেয়েছে ৩৯ ভাগ।

খাওলা স্কুলে যায় না, মানসিক কষ্ট দূর করার কোনো ব্যবস্থাও নেই। আবার এমন পরিস্থিতিতেই সারা জীবন কাটানোর কথাও সে মানতে পারছে না। আবারো আত্মহত্যা করবে কি না, এই প্রশ্নের জবাব নেই তার কাছে।

তার কথা, ‘সিরিয়ায় আমরা জঘন্য জীবনযাপন করছি, অবশ্য, এটা অন্তত একটা জীবন।’ তার বাদামি চোখ ফাঁকা, ঘোলাটে। এই চোখ ১২ বছর বয়সী কোনো মেয়ের নয়, বরং জীবন-রস হারিয়ে ফেলা কোনো বৃদ্ধা নারীর।

‘আমরা এখানে এসেছি, আমাদের কিছুই নেই। পরিস্থিতি যদি না পাল্টায়, আমাদের যদি এমনভাবেই থাকতে হয়, তবে আমরা সবাই জীবন শেষ করে ফেলব।’