Home » প্রচ্ছদ কথা » বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ মোকাবেলার পথ ও পন্থা

বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ মোকাবেলার পথ ও পন্থা

তাজ হাশমী ::

বাংলাদেশে রাজনীতিবিদ আর আইনপ্রয়োগকারীরা সময়ে সময়ে যেসব কথা বলে আতংক আর আত্মতুষ্টি উভয়টাই ছড়িয়ে দেন তা হচ্ছে : দেশ ‘সন্ত্রাসীতে ভরে গেছে’ কিংবা ‘একটা সন্ত্রাসীও নেই।’ এই বৈপরীত্য সন্ত্রাস-প্রতিরোধ কার্যক্রমের কাংখিত ফলাফলের বিপরীত। সন্ত্রাস-প্রতিরোধের জন্য প্রথম ও সর্বপ্রধান দরকার সন্ত্রাসবাদকে উপলব্ধি করতে পারা, তথা সন্ত্রাসীরা হৃদয়হীন কোনো রোবট নয় এবং যারা কেবল হত্যার জন্যই নিরীহ লোকজনকে হত্যা করার মিশনে নিয়োজিত। সন্ত্রাসবাদ হলো, মতাদর্শ-চালিত সহিংসতা। এটা সহিংস অপরাধ ও যুদ্ধ থেকে  অবশ্যই ভিন্ন। বৈশ্বিকভাবে বেশিরভাগ সন্ত্রাসী দারিদ্র্য-পীড়িত মাদরাসায় শিক্ষিত কেউ নন, তারা বরং মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনোক্র্যাট।

সন্ত্রাসবাদ হলো গতানুগতিকতা থেকে সৃষ্ট এক ধরনের বিচ্যুতি; অপরাধ, মহামারী, বন্যা বা ভূমিকম্পের মতো এতে কোনো স্বাভাবিকত্ব নেই। এটা নিজে কোনো রোগ নয়, বরং রোগের সিমটম বা লক্ষন। সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, সমাজ বা জাতি নানা মূর্খতাপূর্ণ সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এটা সৃষ্টি করে। ঠিক কলেরা বা ম্যালেরিয়ার মতো সন্ত্রাসবাদও নির্দিষ্ট জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ছড়ায়; এটা স্রেফ স্বর্গ থেকে নেমে আসে- এমন নয়। এটাও উল্লেখ করা দরকার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে, যেমন আইআরএ ও এলটিটিই- অকার্যকর করা সম্ভব হলেও, গভীরভাবে প্রবেশ করে থাকারা যুগের পর যুগ না হলেও অন্তত বছরের পর বছর দুর্দমনীয় প্রতিপক্ষ হিসেবে টিকে থাকতে পারে।

যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই সন্ত্রাসবাদের বিস্তৃতির মূল দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের ওপরই বর্তায়, অন্য কাউকে দায়ী করার অবকাশ এখানে নেই। আমি ১০ বছরের একটি আমেরিকান বালকের উদাহরণ দিচ্ছি। ৯/১১-এ টুইন টাওয়ারে দ্বিতীয় বিমানটি আঘাত হানার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চিৎকার করে বলেছিল : ’তারা কেন আমাদের হত্যা করে? আমরা অবশ্যই কোথাও কিছু লোকের ওপর খারাপ কিছু করেছি।’ এই ছোট্ট ছেলেটি যা বুঝতে পেরেছে তা হলো, সন্ত্রাসীরা কেবল আক্রমণ চালানোর জন্যই আক্রমণ করেনি। তবে আমেরিকান প্রশাসন স্বীকার করেনি যে, সন্ত্রাসী হামলা আসলে প্রকৃতিগতভাবে প্রতিশোধমূলক কিংবা প্রতিরোধমূলক। বাংলাদেশে কেন সন্ত্রাসবাদ উপস্থিত তা এই দেশের মানুষকে অবশ্যই অনুসন্ধান করতে হবে। তা করা না হলে বিপুল মূল্য দিতে হবে এবং তা সন্ত্রাস-প্রতিরোধ কার্যক্রমে বিপরীত ফল বয়ে আনবে।

বাংলাদেশের সন্ত্রাস-প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞদের অবশ্যই বুঝতে হবে, সন্ত্রাসবাদ সমস্যাটির শেকড় অনেক গভীরে, তা কেবল কিছু ধনীর দুলালের সাথে সম্পর্কিত বিষয় নয়। সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্র থেকে জনসাধারণের মধ্যে কি গণ-বিচ্ছিন্নতার কোনো সমস্যা আছে- যেটাকে তারা স্খলন, নির্দয় এবং বৈধতার ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করে? সমস্যাটি রাজনৈতিক হতে পারে এবং ‘রাজনৈতিক’ শব্দটির বিস্তৃত সংজ্ঞা রয়েছে। এর পুরোটাই ক্ষমতার প্রেক্ষাপট বিষয়ক মানুষের সম্পর্কের বিষয়; এটা স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জনসাধারণের আকাংখা, মর্যাদা, সম্মান, জীবিকা, পরিবার-সম্পর্কিত বিষয়। আর যেটা স্থানীয় সেটা বৈশ্বিক, আবার যেটা বৈশ্বিক সেটা স্থানীয়ও।

গুলশান ও শোলাকিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের নেতা ও আইনপ্রয়োগকারীরা কি এখনো প্রত্যাখ্যান করার মনোভাবে থাকবেন? বাংলাদেশে কোনো আইএস নেই এবং সন্ত্রাসীদের সবাই দেশে জন্মানো স্থানীয় লোক- এমন দাবিতে অটল থাকাটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। সত্যি বলতে কী, বিদেশী চক্রের চেয়ে দেশীয়দের নিয়েই বেশি চিন্তা থাকা উচিত। কারণ দেশীয়দের চেয়ে বিদেশীদের শনাক্ত করা অনেক সহজ। তাদের বোঝা উচিত, সন্ত্রাসবাদও ম্যাকডোনাল্ডের ফ্রাঞ্জাইজির মতো বৈশ্বায়িত বস্তু, সুদূরের বাংলাদেশে তাদের বার্গার তৈরির জন্য আমেরিকান শেফের দরকার পড়ে না।

সন্ত্রাস-প্রতিরোধ করার জন্য বেশি বেশি সৈন্য বা পুলিশ সদস্যের দরকার পড়ে না, এর জন্য প্রয়োজন : ক) রাজনীতিবিদ ও পুলিশের স্বীকার করা যে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের অস্তিত্ব রয়েছে, খ) সন্ত্রাস-প্রতিরোধ নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ বা কাল্পনিক সাফল্য নিয়ে দম্ভ না করা, গ) একে অন্যের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দোষারোপের খেলা না খেলা, এবং ৪) সবার জন্য সুশাসন এবং সমৃদ্ধি ও সুযোগের বণ্টন। দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা যায়, মূলধারার সব ধর্ম ও রাজনৈতিক দলগুলো কখনো সন্ত্রাসবাদকে লালন করে না। গুপ্ত ধর্মবিশ্বাস বা গোপন ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালে নানা ঘটনা ও মতাদর্শের কৌশলী ব্যবহারের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে লোকজনের মগজধোলাই করে সন্ত্রাসবাদের জন্য সমর্থন যোগাড় করে। এর পরিণতিতে একটি ছোট ক্ষুব্ধ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আপাত দৃষ্টিতে সত্যকে ভুল কিংবা বিপরীতটা বিশ্বাস করতে শুরু করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, সন্ত্রাসীরা যেহেতু হাতেগোণা কয়েকজন, তা-ই তাদের পরাজিত করতে সরকারের কোনোই সময় লাগবে না। পুলিশপ্রধান তো আছেন আরো বেশি আত্মতুষ্টিতে : “আইনপ্রয়োগকারীদের প্রয়াসের কারণে দেশে জঙ্গিবাদ কমে গেছে… অনেকে ’ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছে।” মজার ব্যাপার হলো, ৯/১১-এ মাত্র ১৯ জন সন্ত্রাসী টুইন টাওয়ার ধ্বংস করেছিল, প্রায় ৩,০০০ মানুষকে হত্যা করেছিল, আমেরিকান অর্থনীতিতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি করেছিল; আর আল কায়েদা হামলাটির জন্য ব্যয় করেছিল মাত্র ৫ লাখ ডলারেরও কম। মূল কথা হলো, ২০ সন্ত্রাসী হত্যা করতে পারে ২০ হাজার মানুষকে।

বৈশ্বিক সন্ত্রাস-প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা জেনেছেন, তিন ধরনের রাজনৈতিক-উদ্দীপনাপ্রসূত সহিংসতা রয়েছে : ক) সন্ত্রাসবাদ, খ) বিদ্রোহ এবং গ) বিদ্রোহমূলক সন্ত্রাসবাদ। সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহের মধ্যকার সূক্ষ্ম রেখাটি প্রায়ই অস্পষ্ট থাকে। আল কায়েদা মূলত সন্ত্রাসবাদী হলেও আইএস সারা দুনিয়ায় সব সরকারের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক বিদ্রোহের উদগাতা। এ কারণেই এটা বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী শক্তি।

সন্ত্রাসবাদ প্রায়ই হয়ে পড়ে বৃহত্তর বিদ্রোহের অংশবিশেষ। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী জেএমবি হলো আইএস নামের বৈশ্বিক বিদ্রোহের একটি পরজীবী। সন্ত্রাস-প্রতিরোধকদের অবশ্যই একইসাথে বিদ্রোহদমনের পদ্ধতিগুলোও ব্যবহার করতে হবে। বিশ্বে বিদ্রোহদমন (সিওআইএন) কাজে নিয়োজিতদের গুরু ডেভিড গালুলা (যদিও এই ফরাসি বিশেষজ্ঞ আলজেরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত পক্ষ থেকে উদ্ভূত হয়েছেন) বিশ্বাস করেন, সন্ত্রাস-প্রতিরোধ এবং বিদ্রোহ-দমন হলো ’৮০ ভাগ রাজনৈতিক এবং ২০ ভাগ সামরিক’ বিষয়। সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের জন্য বাংলাদেশের সন্ত্রাস-প্রতিরোধ এবং বিদ্রোহ-দমনে নিয়োজিতদেরকে অবশ্যই একইসাথে নাগরিক, সামরিক, আধা-সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মনোস্তাত্তি¡ক শক্তি সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহীদের মধ্যকার রেখাটি খুবই দ্রুততার সাথে অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে। যেসব দেশে সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহীরা মূলধারার জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে এসেছে, সেইসব স্থানে কোনো ধরনের সন্ত্রাস-প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ-প্রতিরোধ অভিযান ফলপ্রসূ হবে তার নিশ্চয়তা নেই। এসব দেশে সন্ত্রাস-বিদ্রোহের সমস্যা সমাধানের জন্য সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোর নিরসন করার কোনো বিকল্প নেই। আমরা জানি, সন্ত্রাসবাদ কোনো আইন-শৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট সমস্যা নয়। এ কারণে এ ধরনের সমস্যায় দ্রুত বা পুলিশী ও সামরিক সমাধানও নেই। অবশ্য বাংলাদেশ এবং অন্যান্য স্থানে বেশির ভাগ সরকারের জন্য এই তথ্য তিক্ত বড়ি গেলার মতো।

সন্ত্রাস-প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ-প্রতিরোধ কার্যক্রম সফলতার পথে আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হলো, সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহীদের সাথে সংযোগ থাকার সন্দেহের বশে কিছু রাজনীতিবিদ ও আইনপ্রয়োগকারীর সাধারণভাবে মানবাধিকার, মানবীয় মর্যাদা ও প্রাইভেসির লঙ্ঘন করেন। তারা কিছুতেই বুঝতে পারেন না, সন্দেহভাজন ও অপরাধীদের বহুল প্রচলিত ‌‌‌’বন্দুকযুদ্ধের’ মাধ্যমে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডে সন্ত্রাস-বিদ্রোহমূলক সমস্যাটি আরো বাড়িয়ে তোলে। ‌

সিএসআরটি ও এএসসি উভয় পদ্ধতিই সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহের প্রতিষেধক হিসেবে সুশাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতিই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের সন্ত্রাস ও বিদ্রোহ দমনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জানা উচিত, সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। এটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক, এবং তা গণতন্ত্র, মত-প্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। সংক্ষেপে বলা যায়, সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহমূলক সমস্যার কোনো পুলিশী বা সামরিক সমাধান নেই।

* লেখক যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন পে স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা সমীক্ষার শিক্ষক। তিনি অনেক বইয়ের লেখক। তার সর্বশেষ বই :

Global Jihad and America: The Hundred-Year War Beyond Iraq and Afghanistan (Sage, 2014).

  • অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ