Home » আন্তর্জাতিক » ডোনাল্ড ট্রাম্প : পুঁজিবাদী রাজনীতির বিপজ্জনক প্রতিনিধি

ডোনাল্ড ট্রাম্প : পুঁজিবাদী রাজনীতির বিপজ্জনক প্রতিনিধি

প্যাট্রিক মার্টিন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বিলিয়নিয়ার ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবির্ভাব আসলে জলাশয়ের উপরিভাগে আবর্জনা ভাসতে থাকারই প্রমাণ। তবে অনেক ভাষ্যকার যেভাবে বলছেন, ট্রাম্প তেমন কোনো বিপথগামী বা উন্মাদ বা ‘লজ্জা’ নন; বরং আমেরিকার পুঁজিবাদী রাজনীতিই সার্বিকভাবে লজ্জার বস্তুতে পরিণত হয়েছে- এমনটা বলাই গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

এক সম্পাদকীয়তে দেস মইনেস রেজিস্টার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে ট্রাম্পকে সরে যাওয়ার জন্য জোরালোভাবে দাবি জানিয়ে তাকে অভিহিত করেছিল ‘ব্যর্থ বাচাল, অখ্যাত এবং ভোট সংগ্রাহক হিসেবে, তবে সেটা চিন্তাকে প্রভাবিত করে নয়, বরং ক্ষোভকে উস্কে দিয়ে।’ খুবই যথাযথ বিশ্লেষণ। তবে তা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্যদের ক্ষেত্রেও কমবেশি প্রযোজ্য। তাদের কেউই, ট্রাম্পসহ, কর্মজীবী মানুষের কাছে সত্যটা প্রকাশ করেননি বা তাদের সত্যিকারের কোনো গণসমর্থন আছে।

আমেরিকান রাজনৈতিক-ব্যবস্থা এবং আমেরিকান অর্থনৈতিক আভিজাত্যের পশ্চাৎপদ ও ক্ষয়িষ্ণুতার তীব্র প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন ব্যক্তি ট্রাম্প। ১৯৭৫ সালে নিউ ইয়র্কের প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার অবস্থার পর রিয়েল এস্টেটের ফুলে ফেঁপে ওঠার সময় তিনি প্রথম লাইমলাইটে আসেন। ওইসময় শ্রমিকদের পেনশন তহবিলসহ বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ হাতিয়ে সেটা পুঁজিপতিদের হাতে দেওয়া হয়েছিল চরম ধনী সম্প্রদারে জন্য, ম্যানহাটনের অংশবিশেষকে গড়ে তোলার জন্য।

বিপুল সম্পদের অধিকারী একটি রিয়েল এস্টেট পরিবারের সন্তান হিসেবে ট্রাম্প অতি ধনীদের জন্য বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে লাভবান হন। ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের কাছে জুলাই মাসে তিনি যে ৯১ পৃষ্ঠার আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন, তাতেও স্পষ্ট হয়েছে, স্বঘোষিত এই ‘সেরা নির্মাতা’ আসলে সর্বোচ্চ ধনীদের সেবার পুরস্কার। তিনি ব্যস্ত ছিলেন ক্যাসিনো, গলফ কোর্স এবং বিলাসবহুল সব রিসোর্ট নির্মাণে। তিনি আসলে পরজীবীদের ওপর থাকা আরেক পরজীবী। তিনি যে ৫১৫টি সংস্থার সাথে জড়িত, যেগুলোর ৩৯১টির সাথে তার নাম লেগে আছে, সেগুলোর কোনোটিই উৎপাদনশীল কার্যক্রমে নেই।

গত দুই দশকে ট্রাম্প বিভিন্ন মিডিয়া প্রকল্পের মাধ্যমে, যার শুরু হয়েছিল ’দি অ্যাপ্রেন্টিস’ দিয়ে, নিজেকে তুলে ধরতে থাকেন। তিনি যে দাবি করে থাকেন, তার ১০ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মধ্যে তার ব্র্যান্ডের মূল্যই ৩.২ বিলিয়ন ডলার, সেটা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে।

ট্রাম্পের ইগো-ম্যানিয়ার সাথে রয়েছে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান সংগ্রহে অনীহা। সম্প্রতি তিনি এক সাক্ষাতকারে তিনি বই পড়ার ব্যাপারে তার আগ্রহহীনতার ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অন্যতম সমস্যা হলো, এটা দৈনন্দিনভিত্তিতে পরিবর্তন হয়।’

বলা হয়ে থাকে, সুযোগের দিকেই থাকে তার চোখ এবং তিনি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় শিবিরে তার শত্রুদের প্রকৃতি নির্মমভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের সেলফোন নম্বর প্রকাশ্যে বলে দেওয়াটা তার কেবল প্রচারণা চমকই ছিল না, বরং এর মাধ্যমে তিনি ওই ব্যক্তি সম্পর্কেই সবাইকে জানিয়ে দিলেন। ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন গ্রাহাম। এর প্রতিফল কেমন হতে পারে, তা তিনি সাথে সাথেই টের পেলেন।

হিলারির সমালোচনা করতেও তিনি পিছপা হননি। অনেক সময় তা মাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে।

ট্রাম্পের জনসমর্থনের উৎস কোথায়? বিভিন্ন জরিপে যা দেখা গেছে তা হলো, তুলনামূলক যাদের বয়স কম, আদর্শগতভাবে রক্ষণশীল, তারাই তার পক্ষে। তিনি অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তাও পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

এটা মনে করার কোনো কারণ নেই, তিনি জীবনের নানা বাঁকে যা কিছু বলেছেন, সবকিছুই রাজনৈতিক বিষয়। নানা সময় তিনি নানা পথ অবলম্বন করেছেন। কখনো তিনি সার্বজনীন স্বাস্থ্যপরিচর্যা, গর্ভপাত, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা, কর বাড়ানো ইত্যাদি নিয়ে পক্ষে যেমন বলেছেন, বিপক্ষেও বলেছেন। এমনকি একবার তিনি হিলারি ক্লিনটনের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটও হতে চেয়েছিলেন। পরে তিনি রিপাবলিকান বনে যান।

অর্থাৎ আমেরিকান পুঁজিবাদী রাজনীতিবিদ বা সিইও থেকে ভিন্ন কিছু নন। কিন্তু তারপরও তাকে আমেরিকার সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিও বলা যায় না, যেখানে দেশের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে তার গুপ্তহত্যার কথা গর্বভরে বলেন, তৃপ্তির সাথে তার হত্যার শিকারদের তালিকা দেন, যার প্রতিদ্বন্দ্বিদের মধ্যে রয়েছেন আগে উল্লেখিত লিন্ডসে গ্রাহাম, যিনি সম্প্রতি হুমকি দিয়েছেন, কোনো আমেরিকান আইএসে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেই তার ওপর ড্রোন মিসাইল হামলা চালানো অনুমতি তিনি দেবেন।

আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে, আমেরিকান মিডিয়া ট্রাম্পের ওপর ক্ষিপ্ত। আসলে তা নয়। এই বিলিয়নিয়ারের নানা প্রকল্পের ফলে সংবাদপত্র ও নেটওয়ার্কগুলো লাভবান হয়েছে।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে মিডিয়া। প্রার্থিতা ঘোষণার আগে এই বিলিয়নিয়ার রিপাবলিকান প্রচারণায় উচ্চারিত হতেন মাত্র ৪ ভাগ, কিন্তু তিনি যেদিন দৌড় শুরু করলেন, সেটা হয়ে গেল ৩০ ভাগে। এর দৌড়েই তিনি এখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী।