Home » প্রচ্ছদ কথা » দুদক : তর্জন-গর্জনই কি চলবে

দুদক : তর্জন-গর্জনই কি চলবে

এম. জাকির হোসেন খান ::

দুদকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ গ্রহণের পরপরই ইকবাল মাহমুদ গত ১৪ মার্চ একটি শপথের কথা জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন কমিশনের মূল কাজ। দুদককে পরিণত করা হবে জনগণের ‘ট্রাস্টি’ হিসেবে। দুর্নীতিগ্রস্তদের জন্য দুদক হবে আতংকের”। অথচ মাত্র ৫ মাসের ব্যবধানে দুদক চেয়ারম্যান নিজেই দুদক সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘‘এই প্রতিষ্ঠানও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত কারণেই আইন মেনে চলে না। প্রক্রিয়াগত কারণেই কমিশন দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণভাবে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারছে না। প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকায় কমিশনের প্রতি মানুষের কাংখিত মাত্রার আস্থা নেই”। প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি প্রক্রিয়াগত সমস্যার কারণে দুদক তার সমক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারছে না, না সমস্যা আরো গভীরে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৯.১% (যারা দুদক সম্পর্কে জানেন) বলেছেন,  দুদক দেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে ভালো কাজ করছে এবং ৮২.৯% উত্তরদাতাই দুদক বা এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানে না (গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার, ২০১৫, অপ্রকাশিত)। এর প্রমাণ বাস্তবেও পাওয়া যায়। উল্লেখ্য,  ২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠার পর গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হয়েছে- ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি  ৬০ লাখ ডলার বা ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা- যা ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেটের চেয়েও প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে, যার পরিমাণ ছিল ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। অর্থাৎ ২০০৪-২০১৩ সময়কালে গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫.৫৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপি’র প্রায় ৫.৫% এবং এই সময়ে প্রাপ্ত মোট বৈদেশিক সাহায্যের ৩৪০ শতাংশের সমান টাকা পাঁচার হয়েছে, যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। গত দশ বছরে পাচার হয়েছে তা থেকে বাজেটে ১ বছরের সমপরিমাণ বা কমপক্ষে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা কর রাজস্ব সংগ্রহ করা যেতো।

শুধু তাই নয়, সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৫’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায়, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় অর্থ গচ্ছিত রাখার পরিমাণ অন্যান্য দেশের কমলেও, গত দুই অর্থ বছরে বাংলাদেশী নাগরিকদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে। শুধুমাত্র গত এক বছরেই এই বৃদ্ধির পরিমাণ সাড়ে ১০ শতাংশ। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে রাখা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার সুইস ফ্রাঁ বা ৪ হাজার ৫০৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। এছাড়াও মালয়েশিয়ায় ‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতে গত ১৩ বছরে ৩ হাজার ৬১ জন বাংলাদেশী অর্থ বিভিন্ন মাধ্যমে পাঠিয়েছেন এবং সুবিধা গ্রহণকারী নাগরিকদের হিসাবে চীন এবং জাপানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। প্রতি বছর ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করে ব্যাপকভাবে নাগরিকত্ব নিচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশী। অর্থ পাচারে কারা জড়িত, কোন প্রক্রিয়ায় পাচার করা হচ্ছে এবং পাচারকৃত অর্থের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণে দুদক কোনো ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়নি।

শুধু তাই নয়, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরির মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজকোষ থেকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার লোপাট হলেও দায়ীদের চিহ্নিত করতে দুদকের কোনো সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না। দুদকের নিষ্ক্রিয়তায় দুর্নীতিই এখন কোটিপতি হওয়ার প্রধান মাধ্যম হিসেবে দাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন। গত ৭ বছরের হিসেবেই কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৫ হাজার। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ২ কোটি টাকার ওপর সম্পদ দেখিয়েছেন মাত্র ৫ হাজার ৩২৯ জন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, বাকি প্রায় ৭০ হাজার কোটিপতি কোথায় গেলেন? দুদক কি এসব কোটিপতির অর্থের উৎস খুঁজে দেখেছে? উল্টো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত রুই-কাতলাদের নির্বিচারে সততার সনদ দিয়েছে দুদক।

একের পর এক দুর্নীতির বিচার না হওয়ায় অপ্রতিরোধ্য গতিতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গিলে খাচ্ছে। ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীদের দুর্নীতির কারণে অর্থমন্ত্রী স্বয়ং স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ‘‘দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর দেশের জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশ ক্ষতি হয়ে থাকে”। এমনকি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন সূচকে লাল তালিকাভ‚ক্ত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রদত্ত মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ ফান্ড থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৫০ কোটি ডলারের অনুদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০ অক্টোবর, ২০১৫-র দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ২০০৭ থেকে ২০১৫ এর আগষ্ট পর্যন্ত দুদকে ৩ লাখের বেশি বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও, চূড়ান্তভাবে অনুসন্ধানের জন্য ২১ হাজার ৮৫৪টি অভিযোগের মধ্যে মাত্র ৩ হাজার ৯৯৮টি মামলা করা হয়। বাঁকি অভিযোগের কথিত ‘সত্যতা’ না পাওয়ায় নথিভুক্ত (মামলার জন্য উপযুক্ত নয়) করে দুদক।

দুর্নীতির সাথে ক্ষমতাসীনদের সংযোগের বিষয়ে টিআইবি’র গবেষণা (২০১৬) মতে জানা যায়, ২০১৫ সালে দুদকের তদন্তাধীন ৩৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে ১৬ জনই ছিলো বিরোধী রাজনৈতিক দলের, মাত্র ৩ জন ছিলো ক্ষমতাসীন দলের। এ সংখ্যাই বলে দেয় দুদক প্রকৃতপক্ষে কি করছে? উল্লেখ্য, অভিযোগের ‘সত্যতা’ না পাওয়ার অজুহাতে মামলা না করেই দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্তি পায় ১৮ হাজার ৩৯ জন, যাদের মধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তি ১৫ হাজার ১১ জন, বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের নেতা, কর্মী ও ব্যবসায়ী ৬৯৭ জন এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলো ৩ হাজার ২৮ জন।

এছাড়াও টিআইবি গবেষণায় (২০১৬) জানা যায়, গবেষণাকালীন সময়ে দুদকের মামলায় সাজা হওয়ার গড় হার ৪০ শতাংশের কম। দুদকের দায়েরকৃত মামলায় অপরাধ ‘প্রমাণিত’ না হওয়ায় ২ হাজার ৮৬৭টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে সততার সনদ প্রাপ্ত ৩ হাজার ২২টি মামলার আসামি’র মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ১ হাজার ৭৬৮ জন এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ী রয়েছেন ৮৬১ জন। উল্লেখ্য, দুদকের নথিভুক্ত অর্থাৎ মামলার জন্য উপযুক্ত নয় এবং মামলা করার পর চূড়ান্ত  প্রতিবেদনের মাধ্যমেও তাদের অব্যাহতিপত্র দেওয়া হয়, যা সবার কাছে ‘দায়মুক্তি সনদ’ হিসেবে পরিচিত। কোন অভিযোগ কি কারণে আমলে নেয়নি দুদক এবং সত্যতার কি ঘাটতি ছিলো- সে বিষয়ে কোনো তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে দুদক চেয়ারম্যান যখন বলেন, ‘‘বড় বড় রুই কাতলাদের ধরা হচ্ছে না বলা হয়। আসলে এ বিষয়ে দেশে প্রচলিত আইন ও পদ্ধতি সকলের বিবেচনায় রাখতে হবে।’’

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান ক্ষমতাসীন মন্ত্রী, এমপিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করার কথা বললেও এখন পর্যন্ত কোনো হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি ২০১৪ এর গত ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে বিগত সরকারের প্রায় একশ’র বেশি মন্ত্রী, এমপিদের প্রকাশিত হলফনামার মাধ্যমে সামান্য সম্পদ মাত্র ৫ বছরে শত শত গুণ বা ক্ষেত্রবিশেষে প্রায় ৩৬ হাজার শতাংশ বৃদ্ধির অলৌকিক তথ্য প্রকাশ পেলেও, দুদক অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে কি করেছে?

এভাবে রাষ্ট্রায়ত্ব বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনি, শেয়ারবাজারসহ অসংখ্য আর্থিক কেলেংকারির কোনো সুস্পষ্ট কূল-কিনারা করেনি দুর্নীতি দমন কমিশন। অথচ বিভিন্ন সময়ে অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ব্যবস্থা গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ১৯৯২ সাল থেকে (দুর্নীতি দমন ব্যুরোর সময়সহ) ২০১৩ পর্যন্ত দুদক ৩৪০টি মামলা দায়ের করলেও মাত্র ৬০টি মামলায় অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়। সম্প্রতি দুদকের তালিকাভুক্ত মামলায় পলাতক প্রায় দেড়শ’ ব্যক্তির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। অথচ রাঘব বোয়ালদের কেউই সে তালিকায় নেই। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘যা কাজের গতি আনে, আমি মনে করি সেটা অবৈধ নয়। উন্নত দেশগুলোতে এটাকে বৈধ করে দেওয়া হয়েছে, তবে ভিন্ন নামে, স্পিড মানি নামে’’। অপ্রতিরোধ্য এ দুর্নীতি বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করছে। এছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান কয়েকদিন আগে এমনটা বলেছিলেন যে, দুর্নীতির অর্থ থেকেই জঙ্গিবাদের উত্থান বেশি হয়।

সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ (“রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না এবং যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিমূলক ও কায়িক-সকল প্রকার শ্রম সৃষ্টিধর্মী প্রয়াসের ও মানবিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণতর অভিব্যক্তিতে পরিণত হইবে”) অনুযায়ী দুদককে সচল এবং নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দায়িত্ব ক্ষমতাসীনদের। বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা-১৬ অনুসারে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দুদকের সফলতার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভবিষ্যত।