Home » বিশেষ নিবন্ধ » চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৪৮ : এককেন্দ্রিক বিশ্বে চীনের যাত্রা

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৪৮ : এককেন্দ্রিক বিশ্বে চীনের যাত্রা

আনু মুহাম্মদ ::

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র সাম্রাজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো, পুঁজিবাদের একক বৈশ্বিক ব্যবস্থার পথ নিশ্চিত হলো। একে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও বস্তুত এর মধ্য দিয়ে সারাবিশ্বের অগণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক, বর্ণবাদী, নিপীড়ক, যুদ্ধবাজ শক্তিসমূহেরই মতাদর্শিক বিজয় সূচিত হলো, তাদের জন্য এতোদিনকার হুমকি দূর হলো। এর মধ্য দিয়ে শুধু যে পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের পুনরুজ্জীবন ঘটলো তাই নয়, বৈষম্য নিপীড়নেরও আরও নানারূপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। নতুন উদ্যমে বিশ্বব্যাপী ঝাঁপিয়ে পড়লো যুদ্ধবাজ ও গণবিরোধী সব ধরনের শক্তি।

অন্যদিকে এর মাধ্যমে দেশে দেশে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ও বিপ্লবী শক্তিগুলোও দিশেহারা অবস্থায় পতিত হলো। পিকিংপন্থীরা আগেই ছিন্নভিন্ন হয়েছিলো। এবারই প্রথমবারের মতো মস্কোপন্থীদের বিপর্যয় ঘটলো ব্যাপকভাবে। এই ধারার অনেকেরই নতুন উপলব্ধি হলো, মার্কসবাদ ভুল, লেনিনবাদ ভুল, বিপ্লব একটা ভুল চিন্তা এবং সমাজতন্ত্র একটি অসম্ভব অবাস্তব প্রকল্প। ছিন্নভিন্ন সমাজতন্ত্রী ও বিপ্লবীদের অনেকেই বসে পড়লেন, অনেকে যোগ দিলেন শত্রু  শিবিরে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে একটা সমস্যার মুখোমুখি হলো যুদ্ধ অর্থনীতির সাথে অবিচ্ছেদ্য পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা এবং এর কেন্দ্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিপক্ষ বা শত্রু  না থাকলে  এই যুদ্ধ অর্থনীতির যৌক্তিকতা দাঁড় করানোর কোনো উপায় থাকে না। আর যুদ্ধ আর দখলের ব্যবস্থা ছাড়া পুঁজিবাদেরও টিকে থাকার পথ নেই। এই সংকট থেকে উদ্ধারের পথ সৃষ্টি হলো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন যুদ্ধ ফ্রন্ট বানানোর মধ্য দিয়ে। ১৯৯১ সালে ইরাক আক্রমণ দিয়ে এর শুরু, ২০০১ সালে ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ মন্ত্র দিয়ে পুরো পৃথিবীকেই যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করা হয়েছে। যুদ্ধ অর্থনীতিরও বিস্তার ঘটেছে আগের তুলনায় বেশি।

বিশ্ব ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনে চীন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে তার যাত্রাপথে কোনো পরিবর্তন আনেনি। এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে কোনো অবস্থানও গ্রহণ করেনি। বরং নানাভাবে এর সাথে সমন্বয় করতে চেষ্টা করেছে, পরিবর্তিত ব্যবস্থার সাথে মানানসই হিসেবেই নিজেকে সজ্জিত করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই এককেন্দ্রিক শক্তির সাথে দরকষাকষির ক্ষমতা যে কমে গেছে তা চীন টের পেয়েছে প্রথম থেকেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করবার জন্য চীনের আগ্রহ ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাববলয় থেকে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য। আর চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করবার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রভাববলয় শক্তিশালী করবার জন্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে এই সমীকরণ অকার্যকর হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় অপ্রতিরোধ্য একক কেন্দ্র। এতে চীনের উদ্বিগ্ন হবার যথেষ্ট কারণ ছিলো। তিয়েন আন মেনের পর অবরোধ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে কর্তৃত্ব বিস্তারের পথ বেছে নিয়েছিলো তা এরপর আরও শক্তিশালী হয়। চীনের তখন কূটনৈতিকভাবে এর ফয়সালা করাও দুরূহ ছিলো। সামরিক বা রাজনৈতিকভাবে নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য চীনা নেতৃত্ব কোনোভাবেই প্রস্তুত বা ইচ্ছুক ছিলো না। তখন একমাত্র পথ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে তার ওপর নির্ভরশীল করে তোলার মতো অবস্থায় পৌঁছানো। সেভাবেই অগ্রসর হয়েছে চীন।

চীন যে অবরোধ তোলার জন্য ১৯৯০সাল থেকে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করে তার কিছু প্রামাণ্য বিবরণ দিয়েছেন হেনরী কিসিঞ্জার তাঁর পূর্বোক্ত গ্রন্থে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তখন সিনিয়র বুশ, তাঁর কাছে পাঠানো এক মৌখিক বার্তায় চীনা নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চীনা জনগণ বিদেশি শক্তির আধিপত্য এবং হয়রানির মধ্যে কাটিয়েছে। আমরা চাই না সেই জখম আবার উন্মুক্ত হোক। পুরনো বন্ধু হিসেবে আশা করি আপনি চীনা জনগণের অনুভূতি বুঝতে পারবেন। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক, যা প্রতিষ্ঠা করা খুব সহজ ছিলো না, তাকে চীন সবসময়ই গুরুত্ব দেয়, একই সঙ্গে আরও বেশি গুরুত্ব দেয় এর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মর্যাদাকে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আর বিলম্ব না করে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আরও জরুরী।..’

এর পর মার্কিন প্রশাসন অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও,বিশেষত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে,অবরোধ শিথিল করে। ১৯৯২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীন একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। ক্লিনটন তাঁর প্রচারাভিযানের সময় বুশ প্রশাসনের সমালোচনায় চীনের প্রতি নমনীয়তাকেও উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একদিন চীনও পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পথেই যাবে। সেই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে যা করা উচিৎ যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাই করতে হবে।’[1]

প্রকৃতপক্ষে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে চীনপন্থী এবং চীনবৈরী দুটো প্রবণতাই আছে। এর সাথে চীনে মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ।


[1]Henry Kissinger: On China, Penguin, 2011, pp 459-461