Home » প্রচ্ছদ কথা » জঙ্গীবাদ দমন : সরকারের আসল টার্গেট কে

জঙ্গীবাদ দমন : সরকারের আসল টার্গেট কে

হায়দার আকবর খান রনো ::

ধর্মীয় মৌলবাদের সশস্ত্র রূপ যাকে এখন জঙ্গীবাদ বলে আখ্যায়িত করা হয়, তা যে খুবই বিপজ্জনক রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জঙ্গীবাদ কথাটায় আমার বিশেষ আপত্তি আছে। কারণ জঙ্গী যা হচ্ছে ইংরেজী মিলিট্যান্ট শব্দের বঙ্গানুবাদ তা আমরা এতকাল ভালো অর্থে ব্যবহার করে এসেছি। যেমন জঙ্গী শ্রমিক আন্দোলন। জঙ্গী মানে কিন্তু সশস্ত্র নয়। জঙ্গী আন্দোলন বলতে শক্তিশালী বা স্প্রিটেট আন্দোলনকে বোঝানো হয়। দ্বিতীয়ত, জঙ্গীবাদ বললে কোন একটি মতবাদকে বোঝানো হয়। কি সেই মতবাদ যা ধর্মীয় মৌলবাদ থেকে স্বতন্ত্র। মতবাদকেই যদি চিহ্নিত করতে হয়, তবে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ বলা অধিক সঙ্গত। ফ্যাসিবাদের মধ্যেই সন্ত্রাসবাদী উপাদান সব সময় থাকে। সেই বিচারে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ বললেও চলে। যাহোক, এ প্রসঙ্গ আপাতত থাক। ইসলামী সন্ত্রাসবাদ শব্দটাই পরবর্তী অংশে ব্যবহার করা হবে।

যেকথা বলছিলাম, ইসলামের নামে মানুষ হত্যা ভয়াবহ রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। কয়েক বছর আগে জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদ অনেকগুলো হত্যাকান্ড করেছিল। বিচারক হত্যা, আদালতে বোমাবাজি, পহেলা বৈশাখের সঙ্গীতানুষ্ঠানে, উদীচীর অনুষ্ঠানে, সিপিবি’র সভায় বোমাবাজি ও মানুষ হত্যা, সিনেমা হলে বোমাবাজি ইত্যাদি হত্যাকান্ড তারা করেছিল। শায়খ আবদুর রহমান, বাংলাভাই ইত্যাদি কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে বিচারে তাদের ফাসি হয়। সেটা হয়েছিল বিএনপির শাসনামলে। তাহলে এটা প্রমাণিত যে, বিএনপি এই ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের সমর্থন করে না। কিন্তু দলটির এমনই পোড়া কপাল যে, ইদানীং যে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, তার অপবাদ খানিকটা হলেও বিএনপিকে নিতে হচ্ছে। বিএনপি যখন ‘জঙ্গীবাদে’র (অর্থাৎ ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের) বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়, তখন কেউই তাতে সাড়া দেয় না। শাসক দল বরং সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে তার ঘাড়েও দোষ চাপিয়ে দেয়। সেই সুযোগটা বিএনপি নিজেই করে দিয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে ঘর করার জন্য তাকে এই খেসারত দিতে হচ্ছে।

তাছাড়া বিএনপি দলটি চলনে-বলনে ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে যে অবস্থানে পৌছেছে তাতে বামপন্থী দল, এমনকি মধ্যপন্থী উদার বুর্জোয়া দলও বিশ্বাস তাকে করে না। ২০১৩ সালে যখন গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হলো, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তাকে নাস্তিক বলে গালি দিয়েছিলেন। একই সময় তিনি হেফাজত ইসলামকে দিয়ে ‘ইসলামী বিপ্লব’ ও সরকার পতনের আকাংখা পোষন করেছিলেন। হেফাজত চরমভাবে নারী বিদ্বেষী এবং হাড়ে হাড়ে প্রতিক্রিয়াশীল (যার প্রধান নেতা আহমদ শফি মেয়েদের ক্লাস ফোরের বেশি পড়ার বিরুদ্ধে)। এমন দলের সঙ্গে সক্ষতা বিএনপির একদা মধ্যপন্থী দলের পরিচিতি মুছে দিয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগও এখন হেফাজতকে নিয়ে খেলছে। কিন্তু সেটা সেভাবে চোখে পড়ে না। হেফাজতকে চাপের মধ্যে রেখে শাসক দল তাদেরকে বশ্যতা স্বীকার করাতে বাধ্য করেছে। কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জে হিন্দু শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কানধরে উঠবস করিয়েছিলেন শাসক দলের বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত ওসমান পরিবারের সদস্য ও বর্তমানের জনপ্রতিনিধিত্বহীন সংসদের সদস্য সেলিম ওসমান। আমরা দেখেছি, হেফাজতে ইসলাম সেলিম ওসমানের পক্ষে এবং হিন্দু শিক্ষকের বিরুদ্ধে জনসভা করেছিল।

গত বছর নতুন করে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ তৎপর হয়ে উঠেছিল। গত বছর অভিজিৎ, আশিকুর বাবু, অনন্ত, নিলাদ্রী, দীপন- লেখক, ব্লগার, প্রকাশক এক এক করে হত্যা হচ্ছিলেন, তখন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কোনো গুরুত্ব দেননি। বলেছিলেন, ওসব নাকি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। শাসক দলের নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ বরং নিহত দীপনের পিতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, অধ্যাপক পিতা নাকি পুত্রের হত্যাকারীদের মতাদর্শের লোক।

শাসক দলের লোকদের কথাবার্তার কোনো লাগাম নেই। আর ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা না করে তারা এই সুযোগে বিরোধী পক্ষ বিশেষ করে বিএনপিকে ঘায়েল করতেই উৎসাহী। সে জন্য গত বছর অধ্যাপক ও লেখক অনুপম সেন, জাফর ইকবাল, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যাদের অনেকে বরং আওয়ামী শিবিরের প্রতি তুলনামূলক দুর্বল বলে পরিচিত, তারাই ‘ব্লেম গেম’-এর অভিযোগ তুলেছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে। অধ্যাপক জাফর ইকবাল একথাও বলেছিলেন, ‘শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, সরকার কোন এক ধরনের দুর্বোধ্য রাজনৈতিক সমীকরণ সমাধান করার জন্য নিজেরাই এ ঘটনাগুলো ঘটিয়ে যাচ্ছে কিংবা ঘটতে দিচ্ছে।’

সম্প্রতি নতুন করে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে। বিদেশী নাগরিক, শিয়া সম্প্রদায়, হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান যাজক, বাউল সঙ্গীত প্রেমিক, সমাজ সেবক ও চিকিৎসক, সঙ্গীত প্রেমিক অধ্যাপক খুন হয়েছেন ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের হাতে। তখনো আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বিকার ছিলেন। তাদের একই কথা ভাঙা রেকর্ডের মতো উচ্চারিত হতো। ওসব বিএনপি-জামায়াতের কাজ।

বিএনপি যতোদিন জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, ততোদিন এই অপবাদ তাকে সহ্য করতেই হবে। এর মাঝে হঠাৎ করে বিএনপির থিংক ট্যাংক  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ  জানালেন যে, বিএনপি শিগগিরই জামায়াতকে পরিত্যাগ করবে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ দলের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ এলো। এতোটা জামায়াতপ্রীতি থাকলে কে সাড়া দেবে বিএনপির ডাকে?

অন্যদিকে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকারকেও আন্তরিক মনে হয় না। তারা এই সুযোগে বিএনপিকে ঘায়েল করতে যতোটা আগ্রহী, ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করতে ততোটা তৎপর নন। বিএনপি না হয় জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ। কিন্তু সরকার কেন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করছে না?

ধর্মীয় মৌলবাদকে দমন করার জন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ, গোয়েন্দা তৎপরতা, পুলিশি এ্যকশন যেমন দরকার, তেমনি দরকার মতাদর্শগত সংগ্রাম। মতাদর্শের ক্ষেত্রে সরকার ইতোমধ্যেই অনেক আপোষ করে বসে আছে। সংবিধানে ‘ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম’ রেখে এবং গোপনে হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতা করে মৌলবাদকে মোকাবেলা করা যায় না।

সরকার ‘জঙ্গীবাদ’ বিরোধী পুলিশি এ্যকশনে নেমেছে; দরকারও আছে। হয়তো কিছু সাফল্যও আছে। কিন্তু এই সুযোগে যে গ্রেফতার বাণিজ্য শুরু হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে অস্বাভাবিক রকম।

দুর্ভাগ্য দেশবাসীর, জাতীয় দুর্যোগের সময়ও বড় বড় দলগুলো ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করে দাড়াতে পারে না। ভারতে এই রকম ক্ষেত্রে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সকল দল এক সঙ্গে বৈঠক করে, কখনো কখনো একসঙ্গে দাড়ায়ও। আমাদের দেশে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিটাও গড়ে ওঠেনি। কপালে হয়তো আরও দুঃখ আছে।