Home » বিশেষ নিবন্ধ » বিশ্বায়নের অর্থনীতি : অনাকাংখিত এবং আতংক সৃষ্টিকারী ঘটনার উত্থান

বিশ্বায়নের অর্থনীতি : অনাকাংখিত এবং আতংক সৃষ্টিকারী ঘটনার উত্থান

জয়তী ঘোষ ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

উন্নত দেশগুলোর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ যে দৃষ্টিতে দেখছে, তাতে রয়েছে বিস্ময় আর বিহ্বলতার মিশ্রণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন লাভ থেকে শুরু করে ইউরোপে প্রকট বর্ণবাদী অভিবাসন বিরোধী রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনগুলোর উত্থান ও বিস্তৃতিতে পরিষ্কার যে, এসব দেশের রাজনৈতিক ধারা ও ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বদলে যাচ্ছে। একসময় যা ছিল অচিন্তনীয়, সেটা এখন বিষন্ন শঙ্কাযুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তারা কেন এমন পথে ছুটছে, তা বোঝার বেপরোয়া প্রয়াসও ক্রমাগত বাড়ছে। এটা বিশেষ বিষয়। কারণ উন্নত দেশগুলোতে যা ঘটছে, তা এখনো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বাকি বিশ্বের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত বিষয়, যদিও বৈশ্বিক শক্তির পরিবর্তনের সব আলোচনাই কয়েকটি বৃহৎ ‘উদীয়মান জাতির’ মধ্যে সীমিত।

এখন সুস্পষ্ট, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, কর্মজীবী মানুষের স্থবির প্রকৃত আয় এবং দৈনন্দিন জীবনের অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকা বস্তুগত ভঙ্গুরতা- সব মিলে ধনী দেশগুলোর সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষের প্রবল অনুভূতি সৃষ্টি করছে। এসব দেশের গরিবরা যদিও উন্নয়নশীল বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চেয়ে অনেক ভালো আছে, কিন্তু তবুও তারা ক্রমাগত নিজেদের বিশ্বায়নের শিকার বিবেচনা করছে।

এই বিষয়টা বেশি বেশি স্বীকৃতি পেলেও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবণতার পূর্ণ মাত্রাটি সম্ভবত অনেক কম পরিচিত। ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের একটি নতুন প্রতিবেদনে (‘পুওরার দ্যান দেয়ার প্যারেন্টস? ফ্ল্যাট অর ফলিং ইনকামস ইন অ্যাডভান্স ইকোনমিক্স’, জুলাই ২০১৬) বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে, গত দশকে বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের অনেক মানুষ বেশ খারাপ অবস্থায় ছিল।

প্রতিবেদনটিতে ২৫টি উন্নত দেশের আয় বণ্টন তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। ফ্রান্স, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাড়ে তিন লাখ মানুষের কাছ থেকে অধিকতর তথ্য এবং ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষজনের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে তাদের আয়ের মূল্যায়ন সম্পর্কে উপলব্ধি যাচাই করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছিল।

মূল প্রবতণতা শনাক্তকরণের পরিভাষায় ফলাফলটি সম্ভবত বিস্ময়কর না হলেও ব্যাপক পরিবর্তন এবং আয়ে অবনতি সত্যিই ছিল হতবাক করা বিষয়। ২৫টি উন্নত দেশে ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ পরিবার (সংখ্যাটা প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ থেকে ৫ কোটি ৮৯ লাখ মানুষ) ২০০৫ থেকে ২০১৪ সময়কালে কোনো রকম বা পড়তি আয়ের মুখে পড়েছে। বিপরীতে এর আগে, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সময়কালে দুই ভাগেরও কম মানুষ (সংখ্যাটা এক কোটিরও কম) এমন অবস্থায় পড়েছিল।

কয়েকটি দেশে সমস্যাটি আরো প্রকট। ইতালিতে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৯৭ ভাগ মানুষই স্থবির বা আগের চেয়ে কম প্রকৃত আয়ের কষাঘাতে জর্জরিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই অনুপাত ৮১ ভাগ, যুক্তরাজ্যে ৭০ ভাগ। এতে বাজার আয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এটাও সত্য, সরকারি কর এবং হস্তান্তর নীতির ফলে অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক আয় চূড়ান্ত বিবেচনায় বেড়েছে। সত্যিকার অর্থে, ২৫টি দেশে মাত্র ২০ থেকে ২৫ ভাগ মানুষ মোটামুটি বা পড়তি আয়ের মুখে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি কর ও হস্তান্তর প্রায় ৮১ ভাগ পরিবারের বাজার আয়ের পতন ঠেকিয়ে তাদের আয় বরং বাড়িয়ে দিয়েছে।

একইসাথে শ্রমবাজারে হস্তক্ষেপ করার সরকারি নীতিও পরিস্থিতি ভিন্ন করেছে। সুইডেনে সরকার চাকরি সুরক্ষিত রাখার জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তার ফলে আয়ের পতন ঘটেছে মাত্র ২০ ভাগ। তবে বেশির ভাগ দেশে সরকারি ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের আয় তেমন বাড়াতে পারেনি। বেশির ভাগ দেশে শ্রমবাজারের ধারাটা শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে।

তরুণ ও নিরাপত্তাহীনতা : এসব পরিবর্তন বিস্তৃত পরিসরে হলেও এগুলোর সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত শ্রমজীবীরা, এবং তাদের মধ্যে যারা তরুণ এবং নারী, বিশেষ করে সিঙ্গেল মায়েরা। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম তাদের মা-বাবার চেয়ে গরিব হওয়ার সত্যিকারের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা আগের প্রজন্মের চেয়ে ইতোমধ্যেই অনেক বেশি নিরাপত্তাহীনতায় বাস করতে শুরু করেছে।

বস্তুগত বাস্তবতায় আরো ভালোভাবে মানুষজনের উপলব্ধি তুলে ধরে। ২০১৫ সালে ব্রিটিশ, ফরাসি ও মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে চালানো এক জরিপে দেখা যায়, এদের প্রায় ৪০ ভাগ মনে করে, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই প্রজন্ম মনে করে, পরবর্তী প্রজন্মেও এই অবস্থার উন্নতি হবে না। তারা বাণিজ্য ও অভিবাসন- উভয়টাকেই মারাত্মক নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকে। এই গ্রুপের অর্ধেকের বেশি এই মন্তব্যের সাথে একমত : ‘বিদেশী পণ্য ও পরিসেবার ঢল দেশের চাকরির সুযোগ শেষ করে দেয়।’ আরেকটা বড় অংশ মনে করে, বৈধ অভিবাসন তাদের সমাজের সংস্কৃতি ও বন্ধন নষ্ট করে দেয়। জরিপে আরেকটা বিষয়ও জানা গেছে, যারা মনে করে তাদের আয় বাড়েনি এবং ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী নয়, তারাই ফ্রান্সের ফ্রন্ট ন্যাশনাল এবং ব্রিটেনের বেক্সিট ধরনের আন্দোলনের প্রতি বেশি সমর্থন দিয়ে থাকে।

শ্রমিকদের আয় কেন কমছে? সাধারণভাবে মনে করা হয়ে থাকে, বিশ্বায়ন এবং পযুক্তিগত পরিবর্তন। নতুন নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাবের ফলে স্বল্প দক্ষতার এবং মাঝারি মানের কর্মীরাই কাজ তুলে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার যদি নীতি না বদলায়, তবে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো কোনো সমীক্ষায় আগামী দশকে পারিবারিক আয় ৩০ থেকে ৪০ ভাগ কমে যাওয়ার পূর্বাবাস দেওয়া হয়েছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে অনাকাংখিত এবং এমনকি আতংক সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ঘটনা এখন বেশ ভালোভাবেই দেখা যেতে শুরু করেছে। চলমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমূল পরিবর্তন আনার ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে উপলব্ধি সৃষ্টি হতে আর কত সময় লাগবে?

(লেখক : ভারতের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ এবং জওহরলাল  নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক)