Home » বিশেষ নিবন্ধ » ফারাক্কা : এবার ভারতেই তীব্র প্রতিবাদ

ফারাক্কা : এবার ভারতেই তীব্র প্রতিবাদ

ম. ইনামুল হক ::

গঙ্গা নদী রাজমহল পাহাড় ভেদ করে বাংলার সমতলে প্রবেশের পরেই ফারাক্কার কাছে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করা হয়েছে। গঙ্গা নদীর প্রবাহ রোধক মোট ১০৯টি গেটসম্পন্ন এই ব্যারেজের মুখে দক্ষিণপ্রান্তে একটি ডাইভারশন রেগুলেটর আছে যা দিয়ে ৪০ হাজার কিউসেক পানি একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে ভাগিরথীতে পাঠানো যায়। গঙ্গা নদী দিয়ে আগে যেখানে ন্যুনতম ৬০ থেকে ৭০ হাজার কিউসেক পানি বাংলাদেশের দিকে আসতো, এখন এই ব্যারেজের ফলে তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ও ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী ২৭ হাজার কিউসেক পানি আসার কথা। কারণ জানা যায় চুক্তিতে ঐ পরিমাণের কথা থাকলেও অনেক সময় তা ২০ হাজার কিউসেকের কম হয়ে যাচ্ছে। বলার কিছু নেই, কারণ ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ২৭,৬৩৩ কিউসেক পানি দেবার কথা থাকলেও তা দেবার গ্যারান্টি চুক্তিতে দেয়া হয়নি। বরং চুক্তিতে বলা হয়েছে, মূল গঙ্গায় পানি ৫০ হাজার কিউসেকের কম আসলে সমান সমান ভাগাভাগি হবে।

গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা ব্যারেজ চালু হবার সময় থেকে এর পানি ভাগাভাগি নিয়ে হতাশ করার মত ইতিহাস আছে। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৮ এপ্রিল ১৯৭৫ এর চুক্তি অনুযায়ী ভারত ১১ থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি সরিয়ে নেবার অধিকারী হয় ও বাংলাদেশকে ন্যুনতম ৪৪ হাজার কিউসেক পানি দেবার গ্যারান্টি দেয়া হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে পালাবদলের পরে ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে ভারত ইচ্ছামত পানি সরিয়ে নিতে থাকে। এর প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী ১৬ মে ১৯৭৭ ফারাক্কা অভিমুখে লং মার্চ করেন। এরপর ওই বছর ৫ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাই ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ন্যুনতম ৩৪,৫০০ কিউসেক পানি দেয়ার অঙ্গীকার ছিলো। পাঁচ বছর মেয়াদের ওই চুক্তি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আর বহাল থাকেনি। এরশাদ আমলে দু’বার সমঝোতা হলেও ১৯৮৮ সালের পর ১৯৯৬ পর্যন্ত কোন কিছুই ছিলো না এবং ভারত গঙ্গা নদীর পানি প্রায় সবটাই প্রত্যাহার করে নিয়ে যায়।

গঙ্গা নদী তার উৎপত্তি স্থল থেকে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া পর্যন্ত প্রায় ২৫৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। ভারত, চীন, নেপাল ও বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর অববাহিকা প্রায় ১০,৮৭,৩০০ বর্গ কিালোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মাধ্যমে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৪০০ মিলিয়ন টন পলি এসে পড়ে। তবে গাঙ্গেয় বদ্বীপের মাটিতে চাষকৃত জমির ধুয়ে আসা কাদার পরিমাণ বেশী। গঙ্গা নদীর বন্যায় যে পানি আসে তা আমাদের খাল বিল পুকুর জলাশয় পূর্ণ করে, সাগরতট অঞ্চলের মিষ্টি পানির পরিবেশ রক্ষা করে এবং মহীসোপানে ইলিশ ও চিংড়ি মাছসহ অজস্র মূল্যবান প্রজাতির মাছের প্রজননে সাহায্য করে। তাই গঙ্গা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী। এই নদীর অববাহিকায় সুদূর অতীত থেকে মানব সভ্যতা ও চাষবাস গড়ে ওঠায় চাষের জমি থেকে জৈব পদার্থ ধুয়ে এসে নদীর মাধ্যমে বাংলার বদ্বীপে জমা হয়েছে। এই পলি আমাদের ভূমির উর্বরতা বাড়ায়, সাগরে জমে নতুন ভূমি পরিবৃদ্ধি করে। জৈব পদার্থ মাটিকে উর্বর করেছে ও সাগরের মোহনায় জমে জৈব গ্যাসের আধার সৃষ্টিসহ মাছের খাবার তৈরীতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলছে।

সম্প্রতি ২০১৬ সালের বন্যায় বিহার, উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার গত ২৩ আগস্ট দিল্লীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে দেখা করেন ও বলেন, বিহারের ফি বছর বন্যার মূল কারণ ফারাক্কা ব্যারেজ। এই ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকে এর উজানে পলি জমে জমে নদীর তলা উঁচু হয়ে গেছে, ফলে বিহারের বিস্তীর্ণ এলাকার পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে না পেরে বন্যা বাড়ছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফারাক্কা ব্যারেজ তুলে দেবার দাবী জানান। ব্যাপারটি আসলেই সত্যি। এই ব্যারেজ নির্মাণের ফলে ভাগিরথীর মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি পেয়ে হুগলী নদী ও কলকাতা বন্দরের উপকার হচ্ছে বটে, কিন্তু এর উজানে বিহার বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা জাতিসংঘের পানি প্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী নদীর ঐতিহাসিক প্রবাহে বাধা দেবার ঘোর বিরোধী। এই কনভেনশন আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানি নায্যতার সাথে ব্যবহার করার ও ভাটির দেশের কোন ক্ষতি হোক এই রকম ব্যবহার করার ব্যাপারে নিষেধ করা আছে। ভারত অবশ্য সবসময় বলে আসছে সে এমন কাজ কোন কাজ করবে না যা বাংলাদেশের ক্ষতি করে। কিন্তু ভারত ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গার পানি ও গজলডোবা ব্যারেজের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানি বিনা দ্বিধায় সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের জনজীবন ও অর্থনীতির অপূরনীয় ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাদেশ নদী নালার দেশ, বন্যার দেশ। গঙ্গা নদীর উপর নির্মিত ফারাক্কা ব্যারেজ তুলে দেবার দাবী আসার পর এক ধরনের প্রচারণা চলছে যে, এর ফলে বাংলাদেশে বন্যা বাড়বে। বন্যা বাংলাদেশে অভিশাপ নয় বরং আশীর্বাদ। বাংলার মানুষ বন্যার সাথে বসবাস করতে জানে। পাকিস্তান ও ভারতের বন্যায় শত শত মানুষ মরে, বাংলায় তেমন প্রাণহানি হয় না। তাছাড়া গঙ্গা নদীর বামতীরে গোদাগাড়ী থেকে রাজশাহী, পাকশী, পাবনা হয়ে যমুনার তীর পর্যন্ত বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ আছে। গঙ্গা নদীর বামতীরে বড়াল নদের উৎসমুখে একটি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণকারী রেগুলেটর ও বাদাই নদীর ভাটিতে একটি নিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণকারী রেগুলেটর আছে। গঙ্গা নদীর ডানতীরে মহিশকুন্ডি থেকে রায়টা, ভেড়ামারা, তালবাড়িয়া, কুষ্টিয়ার হয়ে গড়াই নদীর তীর ধরে বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ আছে। গড়াই নদীর পূর্বপার থেকে শিলাইদহ, হাবাসপুর, পাংশা, রাজবাড়ী গোয়লন্দ হয়ে গঙ্গা নদীর ডানতীরে বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ আছে। এভাবে নদীর ভেতরের চরাঞ্চল বাদে সবটাই বন্যামুক্ত থাকে। তাই বন্যাজনিত অকারণ ভয়ের আশংকা নয়, বরং ফারাক্কা ব্যারেজের উপকারিতা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মধ্যে উঠে আসা দ্বন্দ্বের সুযোগে গঙ্গা নদীর ঐতিহাসিক প্রবাহ অক্ষুন্ন রাখার জন্যে আমাদের সরকারের দাবী তোলা উচিত।

ভারত একটি বড় দেশ, বরং বলা যায় অনেকগুলি দেশের সমষ্টি। গঙ্গা নদীর অববাহিকায় চীন, নেপাল, বাংলাদেশসহ ভারতের যেসব রাজ্য আছে তাহলো, উত্তরখন্ড, হরিয়ানা, রাজস্থান, দিল্লী, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গ। এদের কোন কোনটি জনসংখ্যায় বাংলাদেশের চাইতেও বড়। এরা প্রায় সবাই গৃহস্থালী বা সেচের কাজে বা শহরাঞ্চলে পানি সরবরাহের কাজে গঙ্গার পানি ব্যবহার করে। তবে ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গার পানি বাংলাদেশকে না দিয়ে কলকাতা বন্দর ও হুগলী নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করা গেলেও পশ্চিমবঙ্গে ভাগিরথী নদী তীরে ভাঙ্গণ বেড়েছে। ভাগিরথী নদী প্রাকৃতিক ভাবে গঙ্গার পানি না পেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছিলো, এখন কৃত্রিমভাবে পানি প্রবেশ করানোয় এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বিহারে গঙ্গার উপনদী গন্ডক, কোশী ও ফুলহার নদীর অববাহিকায় বিশাল নিম্নাঞ্চল আছে ও সেখানে প্রতিবছর বন্যা হয়। এখন ধারনা করা হচ্ছে, ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে গঙ্গা নদীতে পলি পড়ে নদীর তলা উঁচু হয়েছে ও নদীর নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গেছে। এই কারণে বন্যার পানি দ্রুত সরতে পারছে না। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী এই কথা বলেই ফারাক্কা ব্যারেজ তুলে দেবার কথা বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গ এই ব্যারেজে রেখে গঙ্গার পানি বাংলাদেশকে না দিয়ে নিজেরা নিতে চায়।

ফারাক্কা ব্যারেজ ভারতের তৈরী; কাজেই এব্যাপারে যা করণীয় ভারতই করবে। তবে আমরা গঙ্গা নদীর প্রবাহ সারা বছর বিনা বাধায় চলতে দেবার দাবী জানাই। শুধুমাত্র গঙ্গা নদী নয়, ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদীসহ পৃথিবীর সকল আন্তর্জাতিক নদীগুলির প্রবাহ সারাবছরব্যাপী বিনা বাধায় চলতে দেয়া উচিত। নদী তীরবর্তী দেশগুলির মানুষরা ওই নদীর পানি ব্যবহার করবে নায্যতার সাথে। জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের পানি প্রবাহ কনভেনশনের ৭.১ ধারা অনুযায়ী- আন্তর্জাতিক নদীর পানি নায্যতার সাথে ব্যবহার বলতে বোঝায় এমনভাবে ব্যবহার, যাতে ভাটির দেশের মানুষের কোন ক্ষতি না হয়। ওই কনভেশনের ৭.২ ধারায় বরং একথাও বলা আছে যে, উজানের দেশের পানি ব্যবহারের ফলে ভাটির দেশের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দেবার ব্যবস্থা নিতে হবে। আসলে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহে বাধা দিলে সাময়িকভাবে কেউ কেউ উপকার হলেও সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয় অনেক বেশী।