Home » বিশেষ নিবন্ধ » করপোরেটদের স্বার্থরক্ষা, বিপাকে সাধারণ মানুষ : বিশ্বায়নের সমাপ্তি!

করপোরেটদের স্বার্থরক্ষা, বিপাকে সাধারণ মানুষ : বিশ্বায়নের সমাপ্তি!

জয়তী ঘোষ

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় নেতৃত্বে সূচিত বিশ্বায়নের যুগটি নিশ্চিত পরিসমাপ্তির দিকে যেতে থাকা নিয়ে উত্তর গোলার্ধের অর্থবিষয়ক মিডিয়ার মধ্যে মারাত্মক ভয় ঢুকে গেছে। বলা হচ্ছে, বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র এবং ল্যাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ১১টি দেশের স্বাক্ষর করা (তবে অনুস্বাক্ষর করা হয়নি)  ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (টিপিপি), যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যকার আলোচনায় থাকা ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টে (টিটিআইপি)।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উভয় চুক্তির আন্তরিক সমর্থক। তার ঘোষিত লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সম্প্রসারণ ও সুরক্ষিত রাখা। ২০১৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনে নাইকির এক কারখানায় শ্রমিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক বিখ্যাত বক্তৃতায় ওবামা বলেছিলেন : ‘আমেরিকা যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির বিধি-বিধান লেখে,  আমাদেরকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আজ আমাদের অর্থনীতি যখন বৈশ্বিক শক্তিধর অবস্থানে আছে, তখনই এটা করতে হবে। … আমাদেরকে আমাদের শর্তাবলী এর ওপর চাপিয়ে দিতে হবে। আমরা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যের বিধিবিধান না লিখতে পারলে কী হবে অনুমান করুন তো? চীন করবে!’

তার সময় ঘনিয়ে আসছে। তিনি কি পারবেন কংগ্রেসে টিপিপি পাস করাতে? সম্ভবত পারবেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন (ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হিলারি ক্লিনটন) উভয়েই প্রকাশ্যে টিপিপির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। হিলারি একসময় ‘টিপিপিকে বাণিজ্যচুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে এর প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন। এখন তিনি ওই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। এই পরিবর্তন এসেছে বার্নি স্যান্ডার্সের নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে বামপন্থীদের আকস্মিক আবির্ভাবের প্রেক্ষাপটে।

টিপিপির ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য দেওয়া রয়েছে ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ-এর ওয়েবসাইটে : ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিধিবিধান রচনা- যে বিধিব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পণ্যের রফতানি বাড়াতে সহায়ক হবে, আমেরিকান অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে, উচ্চ বেতনের আমেরিকান চাকরি সমর্থন করবে, এবং আমেকিরান মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে শক্তিশালী করবে।’ এমনটা ঘটার ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করার কারণ হলো, চুক্তিতে থাকা ১৮ হাজার আইটেমের ওপর কর কমানোর ফলে বাণিজ্যের আকার ও মূল্য ব্যাপকভাবে বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টা দিন দিন আরো কম মানুষ এটা গ্রহণ করছে। দেশজুড়ে শ্রমিকেরা চুক্তিটিকে সন্দেহের চোখে দেখছে। তাদের মতে, এর ফলে কম বেতনের চাকরিগুলো চলে যাবে দক্ষিণ গোলার্ধে। ফলে তাদের অবস্থা হবে আরো করুণ। এমনকি টিপিপির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একমাত্র সমীক্ষাটিতে, যেটা চালিয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশন, দেখা গেছে চুক্তিটি হলে ২০৩২ সাল পর্যন্ত বড়জোর এক শতাংশ রফতানি বাড়বে। অন্য একটি সমীক্ষায় আরো কম আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই চুক্তিটি হলে অংশগ্রহণকারী সব দেশেরই রফতানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার হবে তুলনামূলকভাবে খুবই কম এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর কারণ হলো, চুক্তিটির কারণে এই দেশ দুটিতে চাকরি কমবে, বৈষম্য বাড়বে। জাতীয় অর্থনীতিতে মজুরির হার সব সদস্য দেশেই কমে যাবে।

অবশ্য টিপিপি ও টিটিআইপি সত্যিকার অর্থে বাণিজ্য উদারিকরণ চুক্তি নয়। ফলে বাণিজ্যে এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সীমিত। বরং বাণিজ্য চুক্তিটি ঘিরে এমন কিছু রয়েছে, সেগুলোই আসল ব্যাপার। সেগুলোই সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক ও বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলবে।

তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক : মেধা সত্ত্বের ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা সীমিতকরণ এবং বিনিয়োগকারী-সংশ্লিষ্ট বিতর্কের মীমাংসার ব্যবস্থা। এগুলো করপোরেশনের পাশাপাশি শ্রমিক ও নাগরিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে, কিন্তু কমিয়ে দেবে সরকারি নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা। এমনকি এ ধরনের করপোরেশনের মুনাফা কমিয়ে আনার শক্তিও সরকারের হ্রাস পাবে।

বুদ্ধিবৃত্তিক মেধা সত্ত্বের ব্যবস্থাটিই সবচেয়ে মারাত্মক। ওষুধের ক্ষেত্রে এর যে বিরূপ প্রভাব কী হবে তা বলা যাক। এর ফলে নতুন ওষুধ কোম্পানির আবির্ভাবের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। কেবল জরুরি ক্ষেত্রেই নতুন কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়ার অবকাশ থাকবে। এমনকি সব ওষুধ আমদানিও করা যাবে না। আবার বিদ্যমান ওষুধগুলোর সামান্য কিছু পরিবর্তন করে বাজারজাত করার সুযোগও থাকবে না। বিশেষ করে ক্যান্সার, হৃদরোগ, এইডসের মতো রোগের ক্ষেত্রে একচেটিয়া বাজারের সৃষ্টি হবে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে, সব দেশে এসব ওষুধ পাওয়ায় যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, দাম আকাশচুম্বি হওয়ায় ওষুধ চলে যাবে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আসবে কড়াকড়ি। কেবল প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোই টিকে থাকতে পারবে।

এসব ব্যবস্থা উদ্বেগের বিষয়। কারণ এর ফলে সরকারের ওপর পর্যন্ত খবরদারির সুযোগ পেয়ে যাবে করপোরেশনগুলো। কোনো দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় পর্যন্ত বাতিল করে দিতে পারবে দূরের কোনো দেশের ট্রাইব্যুনাল। করপোরেশনগুলোর প্রতিষ্ঠিত আদালত গোপন প্রমাণ নিয়ে গোপন ও রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে শুনানির আয়োজন করতে পারবে। করপোরেশনগুলোর মুনাফার অধিকারের কাছে নাগরিকদের অধিকার কোনোই মূল্য পাবে না।

টিপিপি ও টিটিআইপি’র এসব বৈশিষ্ট্য জনসাধারণের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়লে সেগুলো প্রতিরোধের কর্মসূচি ঘোষিত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশে। তবে তারা যতটুকু জেনেছে, তাতেই বাণিজ্য উদারিকরণের নামে একটি বিরূপ ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে বাণিজ্য উদারিকরণ আসলে করপোরেশনের স্বার্থে, শ্রমিকদের জন্য নয়, বিশেষ করে ইতিহাসের যে যুগে চাকরি নিশ্চিতকরণই সবার জন্য সবচেয়ে বেশি দামি বিষয় হয়ে পড়েছে। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিশ্বায়নের এসব বৈশিষ্ট্য যদি হুমকির মুখে পড়ে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণ এবং এই চুক্তিতে সই করতে ইচ্ছুক তার বাণিজ্য অংশীদারদের জনসাধারণের জন্য হবে সম্ভবত কল্যাণকরই।